দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৩ সালের আগে নয়

19

নিজস্ব প্রতিনিধি : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই ও নতুন সরকার গঠন করার আগ থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দ্বাদশ নির্বাচনের দাবি উঠেছে। ইতোমধ্যে ঐক্যফ্রন্ট নতুন নির্বাচনের দাবিতে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। তবে সরকার অনড়। তাদের কোনো দাবিদাওয়া আমলে নেবে না। সরকারের তরফ থেকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই দাবি পূরণের কোনো সম্ভাবনা নেই। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি আন্দোলনের মাঠে থাকলেও তাদেরকে সরকার হটানোর লক্ষ্যে গৃহীত কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেওয়া হবে না। সরকার পতনের কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেবে না। এ ব্যাপারে সরকার জিরো টলারেন্স দেখাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। আন্দোলন ও কর্মসূচি ঠেকানোর জন্য নতুন কৌশলও নেবে সরকার ও আওয়ামী লীগ। পাশাপাশি কাজের মাধ্যমে সাফল্য দিয়ে নতুন দায়িত্ব নেওয়া সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে আগামী ২০২৩ সালে সময়মতো দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন দেবে। সেই হিসেবে এরই মধ্যে দুই প্রধান দলেই নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বিভিন্নভাবে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি দ্বাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আন্দোলন, কর্মসূচি ও কথা বলা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য কাজ করে যাবে। বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, কোনো মহলের চাপের কাছে সরকার ও সরকারপ্রধান হার মানবেন না। আগেও মানেননি। এবারের নির্বাচনে জোট ২৮৮ আসন, আওয়ামী লীগ ২৫৭ আসন লাভ করেছে। এই ফলাফলকে কোনোভাবেই ঐক্যফ্রন্ট ও আন্তর্জাতিক মহলের কাউকে বিতর্কিত করার সুযোগ দেবেন না। ঐক্যফ্রন্ট বিদেশিদের কাছে বিভিন্ন নালিশ দিলেও সরকারের সঙ্গে কেউ সে ব্যাপারে এখনই কথা বলতে চাইছে না। করলে সরকারও তাদের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী অবস্থান তুলে ধরেছেন। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশের স্বার্থ সবার আগে। বিদেশি আধিপত্য আর নয়, এ কারণে তিনি দশম নির্বাচনের আগে অনমনীয় ছিলেন। কোনো দেশ ও দেশের প্রতিনিধিরা আগামীতেও আগাম নির্বাচনের বিষয়ে কথা বললে আরো কঠোর অনমনীয় মনোভাব পোষণ করে এগিয়ে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দেশের জনগণকে পাশে রেখে সফলভাবে পাঁচ বছর সরকার পরিচালনা করতে চান। কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই সফল হতে চান। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফলাফল তাদের মনঃপূত না হওয়ায় এখন তারা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে যে দাবি তুলেছে, তা মানা সম্ভব নয়। জাতিসংঘ যদি ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির কথায় সরকারকে কোনো ধরনের চাপ দেয়, তাহলে জাতিসংঘকে বাস্তবতা ও পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য সরকার ব্যবস্থা নেবে। নতুন যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত করেছেন, তিনি এ ব্যাপারে কাজ করবেন। তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাবেন।
সূত্র অবশ্য জানায়, যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার দাবি না মেনে আরও একটি নির্বাচন না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি সরকারের ওপর ফের নির্বাচনের জন্য চাপ তৈরি করতেই থাকবে। তারা আশাবাদী, সেই চাপে সরকার আগাম নির্বাচন দেবে। প্রয়োজনীয় লবিং করবে। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গেও দেখা করবে ঐক্যফ্রন্টের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানেও পুরো পরিস্থিতি তুলে ধরবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিরঙ্কুশ আসনে জয়লাভ করা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আগামী পাঁচ বছর সরকারকে আরও সফল করা ও দলকে সুসংগঠিত করার জন্য কাজ করবে। আগাম নির্বাচন দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে আগামী ২০২৩ সালের শেষ অংশে। তা হতে পারে ওই বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই। সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর ৯০ দিনের মধ্যে একটি নির্বাচন হবে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায়, এ রকম সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু পরে আর নির্বাচন হয়নি। ওই সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্তি করে ফের নির্বাচন দিয়েছে। ওই সময়ে যদিও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শেখ হাসিনা জাপানের প্রধানমন্ত্রী অ্যাবের আদলে একটি আগাম নির্বাচন দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের কয়েকজন এর বিরোধিতা করেছিলেন। মত দিয়েছিলেন সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্তি করার জন্য। সেই হিসাবে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্র্ণ করে।
সূত্র জানায়, এবার ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে একাদশ নির্বাচন করে এরপর পাঁচ বছর মেয়াদপূর্তির আগে আগাম নির্বাচন দিতে হবে, এমন কোনো আলোচনা হয়নি এবং এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। ফলে নতুন করে আগাম নির্বাচন হবে না। তা ছাড়া এবারের ফলাফল নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির দাবি অযৌক্তিক।
সূত্র জানায়, বিএনপি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার পর এখন তিনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় সংলাপ করা। নির্বাচনী এলাকা সফর করা ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে দেশের নির্বাচন নিয়ে যে অনিয়ম হয়েছে, এর বিরুদ্ধে মামলা করা। এ ছাড়া আরও নতুন কর্মসূচি আসবে। নতুন কর্মসূচি কী আসে, সে জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচন নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। নির্বাচন-পরবর্তীতে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করার পর সাংবাদিকরা তার কাছে নির্বাচন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তারেক রহমান কোনো বক্তৃতা করেননি। নির্বাচনের আগে তিনি বক্তৃতা করলেও এখন পরিস্থিতি দেখছেন ও পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই অবস্থান জানাবেন। ঐক্যফ্রন্ট থেকে ড. কামাল হোসেন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যানের কথা বলেছেন। এরপর তার দলের অবস্থানও স্পষ্ট করা হয়েছে যে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুই সংসদ সদস্য শপথ নিচ্ছেন না। ফলে ঐক্যফ্রন্টের পথচলা আরও দীর্ঘ হবে, সেটা স্পষ্ট।
ঐক্যফ্রন্ট বৈঠক করে তিনটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি মির্জা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের নিকট তাদের জোর দাবি হচ্ছে, অনতিবিলম্বে নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের সঠিক অনুলিপি তাদের প্রদানের ব্যবস্থা করা হোক। জনগণ যেন কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের অনুলিপি পাওয়ার পর তা আদালতে উপস্থাপন করতে পারে ও এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারে যে ৩০ ডিসেম্বর সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্দলীয় সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে পুনরায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জোর দাবি করা হবে। তিনি বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সরকারি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। ফলে জনগণ সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের মানবাধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অপব্যবহার করে এবং সেনাবাহিনীর কার্যকর ভূমিকাকে নিষ্ক্রিয় করে নির্বাচন কমিশন পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মৌখিক নির্দেশ দিয়ে সরকারি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী বাহিনীকে ব্যালট পেপারে নৌকা ও লাঙ্গল মার্কায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখতে সাহায্য করেছে। তিনি আরো বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এসব বেআইনি কর্মকাণ্ড গুরুতর অপরাধ।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, জনগণের রায়ের প্রতি তাদের সম্মান থাকা উচিত। মানুষ তাদের রায় যতটা দিয়েছে, সেটাকে সম্মান করা উচিত।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন জনগণের ললাটে এক বিষাক্ত কাঁটা। অথচ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, এবারের নির্বাচনের শৃঙ্খলা আগামীবারও থাকবে। আরও বলেছেন, বিবেক বিক্রি করা এইচ টি ইমাম সাহেবরা মানুষের ভোট কেড়ে নিতে কত দ্বিধাহীন, কত নির্লজ্জ। ভোগ-লালসায় অস্থির থাকায় এদের কাছে মানবিক বিবেচনাগুলো হারিয়ে গেছে। এরা ক্ষমতা ধরে রাখতে পুলিশের বুটের তলায় মানুষের ভোটাধিকার চেপে দেওয়ার যে কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সেটারই পুনরাবৃত্তি করার অঙ্গীকার করলেন আগামী নির্বাচনের জন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here