ঐক্যফ্রন্টে বিভক্তির সুর

5

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চেয়ারম্যান ড. কামাল হোসেন বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে প্রবলভাবে সমালোচিত হচ্ছেন। তার বক্তব্য, ভূমিকা ও দুর্বল নেতৃত্বই ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবির অন্যতম কারণ বলে তারা চিহ্নিত করছেন। ড. কামাল আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছেন, তিনি শেখ হাসিনাকে অবিসংবাদী নেত্রী হিসেবে দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিয়ে হঠাৎ করেই নির্বাচনী মাঠে অবতীর্ণ হয়েছেন কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা। তারা বেশ কিছু যুক্তি উপস্থাপন করছেন। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের দিন থেকে নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত তার বক্তব্য বিএনপির রাজনীতির পরিপূরক ছিল না বলে তারা উল্লেখ করেন। ঘোষিত ফলাফল মেনে নেওয়া এবং নির্বাচিতদের শপথ নেওয়ার ব্যাপারে বিএনপি, ঐক্যফ্রন্টে মতভিন্নতা রয়েছে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন বারবার বঙ্গবন্ধুর কথা বলেছেন। পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় ভূমিকা, জাতীয় চার নেতার অবদানের কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করেন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে তা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নির্বাচনের আগের দিন ভারতীয় এক পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে ড. কামাল বলেন, বিএনপি জামায়াতকে ২২টি আসন দিয়ে তাদের সঙ্গী করবে জানলে তিনি বিএনপির সঙ্গে জোট করতেন না। তার এ বক্তব্য কেবল বিএনপি, জামায়াত এবং ২০ দলীয় জোটেই নয়, ভোটার সাধারণের মধ্যেও মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জামায়াতের উগ্র সাম্প্রদায়িক, ধ্বংসাত্মক, সম্পদ ও প্রাণহরণকারী কর্মকা-ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে জামায়াতবিরোধী মনোভাব প্রবল আকারে বিদ্যমান। বিএনপি কর্তৃক জামায়াতকে বিশাল ছাড় দেওয়ার ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ড. কামালের সাক্ষাৎকার তা আরও শাণিত করে। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে তার সঙ্গে সংলাপে বসার ব্যাপারে বিএনপির নেতাদের চেয়ে ড. কামালের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। সংলাপে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি বিএনপির নেতাদের উৎসাহিত করেন। খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে ড. কামাল কোনো কথাই বৈঠকে বলেননি। নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি নিয়েও তিনি ছিলেন নিশ্চুপ। নির্বাচনকালে বিএনপিসহ বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মী, প্রার্থীদের গ্রেফতার, হয়রানি না করা, বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের গ্রেফতারকৃত নেতা-কর্মীদের মুক্তির ব্যাপারেও জোরালো কোনো ভূমিকা নেননি ড. কামাল। এ বিষয়গুলো বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। নির্বাচনী ফলাফলের পর তারা মুখ খুলছেন।
ড. কামালের দুজন প্রার্থীর জয়লাভের ঘটনা ২০ দল ও বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিস্মিত করেছে। বিএনপিকে যেখানে মাত্র পাঁচটি আসনে বিজয়ী দেখানো হয়েছে, সেখানে ড. কামালের দুজন প্রার্থীর জয়লাভের ঘটনার হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। গভীর সন্দেহের চোখে দেখছেন। বিষয়টি অধিকতর খোলাসা হচ্ছে গণফোরামের দুই বিজয়ীর শপথ গ্রহণের প্রত্যয় দেখে। বিজয়ী দুজনই শপথ গ্রহণের ব্যাপারে গভীরভাবে আগ্রহী। ড. কামালের এর বিপক্ষে জোরালো অবস্থানও দৃশ্যমান নয়। বিএনপি তার পাঁচ বিজয়ী সদস্যের শপথ গ্রহণের প্রবল বিরোধী। তারা শপথ নিয়ে সংসদে গেলে তা বিএনপির জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে এবং ঐক্যফ্রন্টে বিভক্তি ঘটাবে বলে দলটির নেতারা মনে করেন। এতে নির্বাচন ও সরকারকে বৈধতা দেওয়া হবে বলে বিএনপির নেতারা শপথ নেওয়া থেকে বিজীয়দের বিরত রাখার ব্যাপারে কঠোর নন। কিন্তু ড. কামাল নীতিগতভাবে বিএনপির সঙ্গে একমত হলেও দুই সদস্যকে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত রাখছেন না। তবে কৌশলগতভাবে এখনই শপথ না নিয়ে পরবর্তীতে নেওয়ার কথা বলছেন। ড. কামালের এই মনোভাব বিএনপির নেতাদের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম দিয়েছে।
আন্দোলনের প্রশ্নেও ড. কামালের মনোভাব বিএনপি শিবিরে প্রশ্ন জাগিয়েছে। বিএনপি হরতাল কর্মসূচি দেওয়ার কথা বলেছে। ড. কামাল এর বিরোধিতা করেছেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। বিজয়ী সাতজনসহ সকল প্রার্থী ও শীর্ষস্থানীয় নেতাদেরসহ সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের স্বেচ্ছায় কারাবরণের প্রস্তাব দেওয়া হয় বিএনপি থেকে। ড. কামাল হোসেন আরো অপেক্ষা করতে বলেন। আইনগত প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়ার ওপর তিনি অধিকতর গুরুত্ব দেন।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ঐক্যজোটের নির্বাচিতদের শপথ না নেওয়ার দাবি করেছেন। এ নিয়ে তিনি ড. কামালের সঙ্গে কথা বলে সদুত্তর পাননি বলে জানা যায়। এলডিপির প্রধান ড. কর্নেল (অব.) অলিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারাও ড. কামালের প্রতি অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ। তারা নেতৃত্ব পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে রদবদল করা হলে বা বিরোধ সামনে আনলে সরকার ও নির্বাচনবিরোধী কোনো কার্যকর ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হবে না বলে নেতারা মনে করেন। কিন্তু বিরোধ জিইয়ে রেখে তারা কী করতে পারবেন এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না তা নিয়ে সন্দিগ্ধ ঐক্যজোট ও বিএনপির নেতারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here