পথ ও প্রবাসের গল্প: হায় আদর্শ, যায় আদর্শ

11

আবু রায়হান

উত্তরাধিকার সূত্রে কোনকিছু পাবার মজাই আলাদা। এজন্য আলাদা কোন মেধার প্রয়োজন নেই। বাড়তি টেন্শনের বালাই নেই। শরীর ও মাথাকে না খাটিয়েও স্বচ্ছন্দে জীবন পার করে দেয়া যায়। যেমন-একজন দারোগা বা চেয়ারম্যানের সন্তানের কথাই ধরা যাক। জন্মলগ্ন থেকেই তারা বিশেষ সুবিধা পেতে শুরু করে। সারাজীবন ধরে সেই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। সমাজ সংসারে তাদেরকে সর্বদা স্নেহশীল ও ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হয়। তারা বড় ধরনের কোনো বাধাবিঘœ ছাড়াই মোটামুটি নির্বিঘেœ জীবন কাটিয়ে দেয়। কিন্তু একজন কৃষক বা দিনমজুরের সন্তানেরা ততটা ভাগ্যবান হয় না। তাদেরকে সারা জীবন সংগ্রাম করতে হয় মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জৌলুসহীন পরিচয়ের বিরুদ্ধে। এদের কেউ কেউ মেধা বা পরিশ্রমের কারণে সমাজের বেঁধে দেয়া গন্ডী পেরিয়ে এলেও বড় একটা রেহাই মেলে না। সমাজের সমালোচনার চোখ তার দিকে সব সময় তীক্ষè নজর রাখে। আমাদের বিদ্যান পন্ডিতরাও যুগে যুগে সমাজের এই ব্যবস্থাকে সমর্থন যুগিয়ে এসেছেন। ফলে সমাজের নিম্নশ্রেণিকে কাবু করার অস্ত্র আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় জায়গা করে নিয়েছে। আমরা ছোটবেলা থেকে বিদ্যালয়ে সেগুলো শিখি এবং স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ব্যবহার করে পরিতৃপ্তি লাভ করি। বাংলা ব্যাকরণের বাগধারা ও বাগবিধি পরিচ্ছেদে ব্যবহƒত গোবরে পদ্মফুল, কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন-ইত্যাদি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
সমাজের অন্যান্য অংশের ন্যায় চিকিৎসা বিজ্ঞানও উত্তরাধিকারের এই আধিপত্য স্বীকার করে নিয়েছে। মানুষের আয়ুষ্কাল, মেধা, সুস্থ থাকার বিষয়াদি ইত্যাদি বেশির ভাগই নির্ভর করে বংশগত বৈশিষ্ট্যের উপর।
এই প্রভাবকে অ¯¦ীকার করার খুব একটা সুযোগ নেই। তাই এখন রোগব্যাধি নিয়ে হাসপাতালে গেলে ডাক্তাররা হাজার ধরনের প্রশ্ন করে। চৌদ্দ পুরুষের কুষ্টি বিচার করে বুঝতে চায় অসুখটা বংশানুক্রমিকভাবে শরীরে বাসা বেঁধেছে, নাকি অন্যান্য উপসর্গ থেকে এসেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে ইদানিং খোস-পাঁচড়া জাতীয় অসুখের প্রকোপ কমেছে। পথে-ঘাটে, যেখানে-সেখানে মানুষকে আজকাল খস্ খস্ করে শরীর চুলকাতে দেখা যায় না। সেই খোস-পাঁচড়ার জায়গা দখল করে নিয়েছে ডায়াবেটিস, প্রেশার, কোলেস্টেরল ইত্যাদি সমস্যা। এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা স্বীকার করে নিয়েছেন, এই অসুখগুলোর কারণ যতটা না অন্যান্য সমস্যা থেকে সৃষ্ট তার চেয়েও বেশি বর্তায় উত্তরাধিকারের দায় থেকে। মানুষের জীবনে ধর্মের প্রভাবও অনেকটা সেরকম। আমাদের ধর্মেরও বেশিরভাগই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। জন্মের পর থেকে মানুষকে ধার্মিক বানানোর জন্য সমাজ ও পূর্বপুরুষের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি থাকে না ।
আমার পূর্বপুরুষও চেষ্টার ত্রুটি করে নি। মা নিয়মিত নামাজ পড়তেন। প্রত্যহ ঘুমের আগে ও ঘুম থেকে জেগে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। ইয়াসিন ও আর রাহমান তার প্রিয় সূরা ছিল। সারাটা শৈশব-কৈশোর, সকাল-রাত শুনতে শুনতে সূরা আর রাহমানের অংশ বিশেষ প্রায় মুখস্থ হয়ে গেল। ঠিক ঠিক বুঝতে পারতাম কখন “ফাবি আইয়্যি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্ যেবান” লাইনটা ফিরে আসবে। ঐ বিশেষ লাইনটা আবার, বারবার শোনার জন্য শরীরের সকল ইন্দ্রিয় টান টান হয়ে অপেক্ষা করত।
খুব ছোট্টবেলায় আব্বাকে হারিয়েছি। তার বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে নেই। আমার জগত থেকে তিনি যেন পুরোপুরি বিস্মৃত না হোন, সেজন্য মা’র চেষ্টার অন্ত ছিল না। সময়ে অসময়ে আব্বার স্মৃতিচারণ করতেন। সূরা আর রাহমান পড়া শুরুর আগে বিশেষভাবে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করতেন। তারপর, অনেকবার শোনা গল্পটা আরো একবার বলতেন।
“তুই যখন পেটে এলি, তোর আব্বার সেকি উৎসাহ। সন্তান ছেলে হলে কি নাম রাখা হবে এই নিয়ে চিন্তার অন্ত নাই। শেষমেষ কোরান শরীফ ঘাঁটাঘাঁটি করে সূরা রাহমান থেকে তোর নাম পছন্দ করলেন। এই নামের অছিলায় ছেলে যেন দ্বীনদার হয়।”
তারপর সূরা আর রাহমানের সেই বিশেষ অংশটা যখন চলে আসত-তখন যেন মনোযোগে কমতি না থাকে, সেজন্য মা হাত বাড়িয়ে আমাকে স্পর্শ করতেন। “ওয়াল হাব্বু যুল্ আছফি ওয়ার রাইহান। ফাবি আইয়্যি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্ যেবান।” (পৃথিবীতে সৃষ্টজীবের জন্য রয়েছে) খোসা ও দানাবিশিষ্ট শস্য। তবে তোমরা তোমাদের রবের কোন অনুগ্রহ অস্বীকার করিবে?
আমার মায়ের সব চেষ্টা কি বিফল হয়েছে? মনে হয় না। নইলে আব্বা নামের সেই অজানা মানুষটির অস্পষ্ট অবয়ব এখনও মস্তিষ্কের নিওরোণে জমা হয়ে আছে কেন। সেই ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি, কিস্তি টুপি, চোখের সুরমা, দাড়িতে আতরের সুগন্ধ এখনও মনকে আনমনা করে তোলে। মায়ের নামাজ পড়ার লম্বা কাঠের পিঁড়িটা একটু ছোঁয়ার জন্য সময়ে অসময়ে মন আনচান করে ওঠে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ছেড়ে খ্রিস্টান প্রধান নিউ ইয়র্কে আসার পর যখন সংখ্যালঘু অনুভূতি পেলাম, তখন প্রথমদিকে খুব অসহায় বোধ করতাম। একসময় শিক্ষা-সংস্কৃতি সবই ছিল ধর্ম-কে›ি˜্রক, তাই ইসলামের জন্য রয়েছে নাড়ির টান। আশৈশব লালিত প্রাণের ধর্ম। পরপারে পাড়ি জমানো বাবা-মায়ের পুণ্য স্মৃতি। সেই দিনগুলোতে প্রতিদিনই ধর্মের জন্য কিছু করতে ইচ্ছা হতো। আমার দুজন রুমমেট তখন মুসলিম উম্মাহ নামে একটা সংগঠনের সাথে জড়িত। ধর্মের প্রতি আমার কোমল অনুভূতি টের পেয়ে তারা সেই সংগঠনের সদস্য হবার প্রস্তাব দিল। সদস্য হিসেবে কাজ খুব বেশি কিছু নয়Ñনিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়ের চেষ্টা। প্রতিমাসে সংগঠনের তহবিলে দশ ডলার চাঁদা প্রদান। নিজের অসহায় মানসিক অবস্থা কাটিয়ে তোলার জন্য ইসলাম প্রতিষ্ঠার সেই লড়াইয়ে শরিক হয়ে গেলাম।
প্রথম খটকা লাগল মাস ছয়েক পর। আমার চেয়ে ভালো খবর রাখে, এই ধরনের একজন জানাল, বাংলাদেশের জামাতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের পাশ্চাত্য ভার্সনের নামই হচ্ছে মুসলিম উম্মাহ অফ নর্থ আমেরিকা। কথা শুনে চমকে উঠলাম। সর্বনাশ! বলে কি! আমার জানামতে, এরা তো ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা একটা দল।
আমার ছাত্রজীবনে একাধিকবার সেই পরিচয় পেয়েছি। পঁচাশি সালে যখন কলেজে উঠলাম তখন শিক্ষাঙ্গনে যে নতুন সন্ত্রাসের আর্বিভাব হলো, তার নাম রগকাটা রাজনীতি। ছাত্র শিবিরের পাষন্ড ক্যাডাররা বিপক্ষ ছাত্রগ্রুপের নেতাদের ধরে ধরে পায়ের রগ কেটে দেয়। কোমলমতি ছাত্রদের এমনতরো নির্মম কাজ প্রথমদিকে বিশ্বাস করতে মন চায়নি। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে রংপুর কারমাইকেল কলেজ ও রাজশাহী ইউনির্ভাসিটিতে পড়–য়া আমার কয়েকজন বন্ধু ছাত্র শিবিরের হাতে রক্তাক্ত হলো। তাদের একজনের মুখের ক্ষতের সেবা-যতœ করতে করতে বুঝলাম এদের ইসলাম প্রতিষ্ঠার লড়াই কত নির্মম হতে পারে।
মুসলিম উম্মাহ অফ নর্থ আমেরিকার সদস্য হবার কিছুদিন পরে ব্রুকলিন এলাকায় মুসলিম উম্মাহর সদস্যদের মাঝে নতুন উৎসাহ দেখা দিল। কোরআন শরীফের তাফসীর মাহফিলে বক্তৃতা দিতে তাদের দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিউ ইয়র্কে আসবেন। বাংলাদেশে তিনি একজন মওলানা হিসেবেই বেশি পরিচিত। এর আগে এই মওলানা সাহেবের কোন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার সুযোগ পাইনি, তবে তার খুব নামডাক শুনেছি। আন্তর্জাতিক ইসলামি বক্তা হিসেবে দেশে-বিদেশে তার নাকি বেশ সুখ্যাতি রয়েছে। তাই কিছুটা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে রইলাম।
বিরানব্বই সালের এক শীতের সন্ধ্যায় ব্রুকলিনের কোন এক স্কুলের মিলনায়তনে বন্ধুদের সাথে তাফসীর মাহফিল শুনতে গেলাম। ¯¦ীকার করতেই হয় ভদ্রলোকের তাফসির বর্ণনার দক্ষতা খুব ভাল। মানুষজনকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন। আমিও গভীর মনোযোগ দিয়ে ধর্ম সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা শুনছি। তিনি শবেবরাত নিয়ে কথা বলছেন- “এই দিন আল্লাহপাক মানুষের রিজিকের বরাদ্দ দেন। সারাবছর কোন ব্যক্তি কি খাবেন, কি খাবেন না তার সবকিছুই আল্লাহ পাকের কঠিন অনুশাসনে বাঁধা। কোনো বান্দার সাধ্য নেই তার একবিন্দু এপাশ ওপাশ করে।” উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ বাড়িয়ে তোলার জন্য তিনি নাটকীয়ভাবে গলার স্বর পরিবর্তন করেন। তারপর ধর্মীয় ব্যাখার সাথে সুক্ষ্মভাবে রাজনীতিক এজেন্ডা মিশিয়ে ধর্মভীরু মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেন, “আমরা মানুষেরা কতটা শক্তিশালী ভাইসব, যে আমরা গলা উচিয়ে বলি, আমরা ওদেরকে ভাতে মারব, আমরা ওদেরকে পানিতে মারব! আপনারা বলেন, মানুষ কি এতটা শক্তিশালী? এটা কি খোদার উপর খোদকারী না! সবাই বলেন এটা খোদার উপর খোদকারী কিনা? নাউজুবিল¬াহ, নাউজুবিল¬াহ।” আমরা হাতে গোনা দুয়েকজন থম মেরে বসে থাকি। পবিত্র শবেবরাত সম্পর্কিত তাফসিরের সারমর্ম তাহলে এই! কিসের মধ্যে কি, পান্তাভাতে ঘি। এরপর মওলানা সাহেবের ব্যাখাবিশ্লেষণের দিকে আর মনোযোগ দিতে পারিনা।মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে নানাবিধ চিন্তাভাবনা। শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণের সাথে কার না পরিচয় আছে! সময় কালের গন্ডী পেরিয়ে ৭ই মার্চের সেই ভাষণ এখন ঐতিহাসিকভাবে সমাদৃত। এই ভাষণ কানে এলে আজও স্ব^াধীনতাপ্রেমী প্রতিটি মানুষের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ভাতে-পানিতে মারতে চেয়ে শেখ মুজিব ইসলাম লংঘন করেছিলেন! ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী এভাবেই ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এ দেশি দোসরদের সকল অপকর্মকে জায়েজ বলে প্রচারের চেষ্টা করেছিল!
ছোটবেলা থেকে দেখছি, অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদেরকে শাস্তি দেবার জন্য ভাত বন্ধ করার হুমকি দেন। উন্নত দেশগুলোতেও শিশুদেরকে সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত করার হুমকি দেওয়া হয়। মওলানা সাহেবের তাফসির ঠিক বলে মেনে নেওয়া হলে, আমাদের দেশের অর্ধেক মানুষ শেখ মুজিবের মতো একই অপরাধে অপরাধী হয়Ñ নাউজুবিল¬াহ! আমাদের ধর্মভীরু সহজ সরল মানুষের মনে খুব সুচতুরভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ তৈরি করার কি অ-ধার্মিক অপচেষ্টা! Ñ নাউজুবিল¬াহ! নাউজুবিল¬াহ!
এই মওলানা সাহেব কি জানেন না যে, আরবি রিজিক শব্দটির অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। শরীর ও মনের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উপাদানের সমষ্টির নাম রিজিক। শরীরের বেঁচে থাকার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন বাতাস তথা অক্সিজেন। মনের সুস্থতার জন্য দরকার ¯েœহ-মমতা-ভালোবাসা। একমাত্র সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারও পক্ষেই এইসব উপাদানের যোগান বন্ধ করা সম্ভব নয়। শেখ মুজিবও সেটা করতে চাননি, তিনি পাকিস্তানী সেনাদের জন্য একটা প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা বলেছিলেন মাত্র।
এইসব চিন্তার মাঝখানে হাস্যরস সৃষ্টিকারী ভাবনারও উদ্রেক ঘটে। যেমন, ‘আন্তর্জাতিক’ খেতাবধারী এই মাওলানার আন্তর্জাতিক জানাশুনার পরিধি আর একটু বেশি হলে জানতেন যে, পাকিস্তানীরা তার মতো তিন বেলা ভাত খায় না। তাদের প্রধান খাদ্য রুটি। মাঝে মাঝে রুটির সাথে শখ করে এক-আধ বাটি ভাত খাওয়া হয়। তারা পছন্দ করে কড়া পাকের বিরিয়ানী। তাতে মিশেল দেওয়া থাকে প্রচুর পরিমাণে গরম মশলা। সাথে রোস্ট করা চাপ চাপ খাসির মাংস। শেখ মুজিবের বক্তৃতায় উল্লেখিত ভাতের সাথে যার কোনো মিলই নেই।
মাওলানা সাহেব যদি স্বাধীনতা তথা শেখ মুজিবের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ না হতেন, তাহলে তাফসির মাহফিলের মতো একটা ধর্মীয় পরিবেশে এসব কথা মুখেও আনতে পারতেন না। সেদিন বাসায় ফিরে এসেই মুসলিম উম্মাহর সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলি। ঐ তাফসির মাহফিলের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলোÑসেদিন ব্রুকলিনের ঐ স্কুলেই মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য মাওলানা সাহেবকে “আল্লামা” খেতাব দেবার প্রস্তাব করে। তাদের দলের বাকী সদস্যরা সেই প্রস্তাবে সমর্থনও জানায়। বর্তমানে এই মাওলানার নামের আগে যেসব টাইটেল শোভা পায়, জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা এভাবেই বিভিন্ন আসরে সু-কৌশলে সে সব নিজেরাই যোগাড় করে নিয়েছে।
নিউইয়র্কের এস্টোরিয়া এলাকায় এক ল্যান্ডলর্ডের বাসায় একটানা বারো বছর ভাড়া ছিলাম। তিনি জাতিতে গ্রিক। নামÑ পল পাপাস। তাঁর বলা অনেক ঘটনার মধ্যে ধর্ম বিষয়ক ঘটনাটা এখানে তুলে ধরছি- “১৩ বছর বয়সে বিধবা মায়ের সাথে নিউইয়র্কে এলাম। মা একটা রেস্টুরেন্টে কাজ নিলেন, আমি সেখানেই ডেলিভারির কাজ শুরু করলাম। খদ্দেররা টেলিফোনে খাবারের অর্ডার দেয়। আমি পায়ে হেঁটে সেই খাবার বিভিন্ন বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। এক বরফগলা ঠান্ডা রাতে ডেলিভারী নিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটছি। একটা দামি গাড়ি খুব দ্রুতবেগে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেল। এমনিতেই ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছিলাম। কাদা পানিতে ভিজে রাগে দুঃখে চোখে পানি চলে এল। সামনে ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলছে, গাড়িটি সেখানে গিয়ে থেমে আছে। আর একটু আস্তে চললে আমার এই ভোগান্তি হতো না। আমি মাথায় রাগ নিয়ে গাড়িটির কাছে গিয়ে উঁকি দিলাম। চালকের আসনে এক পাদ্রী বসে আছে। পাদ্রী সাহেবকে দেখে মনের ভিতরে বড় ধাক্কা খেলাম। একজন ধর্মীয় নেতা এত অমার্জিতভাবে গাড়ি চালায়! সেই থেকে ধর্মের প্রতি একটা অনীহাভাব এসে গেল। সে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা, এখন এই শহরে আমি পাঁচটা বাড়ির মালিক। অসংখ্য সৎ কাজে টাকা পয়সা খরচ করি, কিন্তু কোনোদিন ভুলেও কোনো চার্চে একটা পেনি পর্যন্ত দান করিনি।”
সাদা কাপড়ে দাগ পড়লে সেটা চোখে খুব লাগে। তাই সাধুদের সাবধানে থাকতে হয়। অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, যারা ধর্ম নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করেছেন, ধর্মের স্ব-ঘোষিত কান্ডারি সেজেছেনÑতারাই ধর্মকে সবচেয়ে বেশি বিকৃত করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here