রম্য: এরশাদের স্বাদে মাহবুবের পল্টি

5

মোস্তফা কামাল

আজ-কাল বা সকাল-সন্ধ্যা শুধু এরশাদই কথা পাল্টান না। এই সিনড্রমে আক্রান্ত আরও বহুজন। এর স্বাদে সুফল ভোগও করেন অনেকে। এবার এরশাদের দল জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গে থাকবে, না আগের মতো দুধেভাতে বিরোধী দল হবে, সেটা সরকার ঠিক করে দিয়েছে। সেই অনুযায়ী অঙ্গীকার করেছেন এরশাদ। বলেছেন, সাচ্চা বিরোধী দল হবে তার দল। তিনি হবেন সহি বিরোধীদলীয় নেতা। মানুষ বিনোদিত হয়েছে।
এবার ভোটের মাঠে সাইড ক্যারেক্টার হিসেবে আলোচিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। বিভিন্ন সময়ে তিনি নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পক্ষপাতিত্ব করছে-তার এ ধরনের কথায় কখনো নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত হয়েছে। সরকার বিব্রত হয়েছে। বিরোধী দল বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট খুশি হয়েছে। নির্বাচনের পর পল্টি দিয়ে বলেছেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, সুন্দর ও সুষ্ঠু হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে তালুকদার ধন্যবাদও জানিয়েছেন।
গত ৩ জানুয়ারি তিনি বলেছিলেন, এই প্রথম একটা অংশীদারি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আমরা জাতিকে উপহার দিতে পেরেছি। আমি মনে করি, এই নির্বাচন বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে একটা ঐতিহ্য সৃষ্টি করবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যে এত বিশাল কর্মযজ্ঞ, এ বিষয়ে সত্যি আমার ধারণা ছিল না। কারণ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কাজ করার কোনো সুযোগ কিংবা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কাজ করার কোনো সুযোগ আমার আমলা জীবনে কখনো হয়নি। আমি বিশেষ করে লক্ষ করেছি, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের যিনি কেন্দ্রবিন্দু, আমাদের নির্বাচন কমিশনের সচিব মহোদয় এবং তার সঙ্গে এখানে যারা ছিলেন, তারা কী নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই নির্বাচনকে সফল করেছেন। সে জন্য আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। যোদ্ধার মতোই তিনি এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সবাইকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।’
প্রশ্ন ছিল মাহবুব তালুকদার কি এসব কথা নিজ থেকে বলেন? নাকি তাকে দিয়ে কেউ বলায়? এ প্রশ্নের কূল-কিনারার আগে মঙ্গলবার আবার নতুন কথা শোনান তিনি। মুখে না বলে একেবারে লিখিত। নির্বাচন অংশীদারমূলক হয়েছে-এমন বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
গণমাধ্যমে পাঠানো লিখিত এই বক্তব্যে ইসি মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘আমি বলেছি, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দিয়েছি। ইতিপূর্বে ১৭ ডিসেম্বর আমি বলেছিলাম, সব দল অংশগ্রহণ করলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা হয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া একটি প্রাথমিক প্রাপ্তি। আসল কথা হচ্ছে, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হচ্ছে কি না এবং বিশ্বাসযোগ্য কি না? নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য না হলে অংশগ্রহণমূলক হলেও কোনো লাভ নেই।’
মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে আমি কোনো কথা বলিনি। কেমন নির্বাচন হয়েছে, সাংবাদিকদের এহেন প্রশ্নের জবাবে আমি আগেও বলেছি, নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন, তাহলে এ প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন। এখনো আমি সেই কথা বলি। আমার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমার ধন্যবাদ জ্ঞাপন বক্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে না।’
বলার আর বাকি থাকে না, এরশাদের ছিলছিলা, অনুসারী, ফলোয়ার্সের খাতায় পৌঁছে গেছেন মাহবুব তালুকদার। অথবা তাকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই অবস্থানে। এ আলোচনা ক্ষ্যান্ত দিয়ে এখন চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জয়ী হওয়ার বিষয়ে সংসদের মাননীয় সহি-শুদ্ধ বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিক্রিয়াটিতে চোখ বুলালে বাড়তি কিছু খোরাক মিলতে পারে। একাদশ জাতীয় সংসদের নেতা নির্বাচিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে এরশাদ বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার এ কৃতিত্ব শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, গণতান্ত্রিক বিশ্বেও বিরল। এটা গণতন্ত্রের জন্যও সম্মানের বিষয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে উন্নয়নের ধারা আরও বেগবান হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সব সময় সরকারকে সহযোগিতা করবে।
এদিকে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী একাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় এরশাদ তাকেও আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শনিবার এক অভিনন্দনবার্তায় তিনি আশা প্রকাশ করেন, ড. শিরীন বিগত আমলে যে অসাধারণ দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন তার ধারাবাহিকতা এবারও বহাল থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here