শাটডাউন নিয়ে অচলাবস্থা চলছে ॥ ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি

মেক্সিকো দেয়াল নির্মাণের অর্থ না পেলে ডেমোক্র্যাটদের কঠিন পরিণতি ঘটবে

108


ঠিকানা রিপোর্ট : মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পেলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কোটিরও বেশি অভিবাসীকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ২০ জানুয়ারি, রোববার, এক টুইটার বার্তায় ডেমক্র্যাট নেতাদের প্রতি এ হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, যদি দেয়াল নির্মাণে তার প্রস্তাবিত ৫৭০ কোটি ডলার তহবিল না পান, তাহলে অনথিভুক্ত প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ অভিবাসীকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে পারেন তিনি। গত ১৯ জানুয়ারি, শনিবার. সরকারের আংশিক শাটডাউন নিরসনে তার দেয়া ‘আপসরফা প্রস্তাব’ ডেমক্র্যাট শীর্ষ নেতারা নাকচ করে দেয়ার পর পরই এ হুমকী দেন ট্রাম্প।
মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ প্রশ্নে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমক্র্যাটদের সঙ্গে ঐকমত্য না হওয়ায় মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম শাটডাউন এক মাস পেরিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৮ লাখ সরকারি কর্মচারি বেতন ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, বাা ছুটি কাটাচ্ছেন। এছাড়া মাত্র ৫৬০ কোটি ডলারের তহবিলের জন্য সরকার অচল করে দিলেও প্রতি সপ্তাহেই মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে প্রায় দেড়শ’ কোটি ডলার। কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই ট্রাম্পের। কীভাবে দেয়াল নির্মাণের তহবিল পাস করা যায়Ñ তার সব চেষ্টাই করে যাচ্ছেন তিনি।
গত ১৯ জানুয়ারি, শনিবার, এক টিভি ভাষণে অচলাবস্থা অবসানে একটি ‘আপসরফা প্রস্তাব’ দেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর গর্বিত ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু ওই ব্যবস্থা ‘অনেক আগেই ভেঙে’ পড়েছে।
তিনি বলেন, আমি এ অচলাবস্থা ভাঙতে এবং সরকারকে এগিয়ে নিতে কংগ্রেসের জন্য পথ তৈরি করতে চাই।
ট্রাম্প ‘ছাড়’ দেয়ার জন্য যে দুটি পরিকল্পনার কথা বলেন সেগুলোর ড্রিমার্স ও টেমপোরারি প্রোটেকশন স্ট্যাটাস (টিপিসি) সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ড্রিমার্স হলেন তারা, যারা তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে ছোট বয়সে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। এসব ব্যক্তি, বিশেষ এক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছে। যার ফলে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না বটে, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও পাবেন না। তবে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু ট্রাম্পের এ প্রস্তাব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উড়িয়ে দেন ডেমক্র্যাট নেতা ন্যান্সি পেলোসি ও চাক শুমার।
রোববার (২০ জানুয়ারি) এই দুই নেতাকে ফের সমালোচনায় বিদ্ধ করেন ট্রাম্প। বলেন, তারা আমার ‘আপস’ প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তারা যেন ভবিষ্যৎ কঠিন পরিস্থিতির জন্য সাবধান থাকেন।
ট্রাম্পের প্রস্তাব ডেমোক্রেটদের নাকচ : ফেডারেল সরকার শাটডাউন ৫ম সপ্তাহের মধ্যে পড়েছে। ফলে আগামী ২৫ জানুয়ারি, শুক্রবার, ৮ লাখ ফেডারেল কর্মকর্তা-কর্মচারি তাদের দ্বিতীয় পে-চেক বঞ্চিত হতে চলেছেন। আমেরিকার রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সর্বশেষ যে প্রস্তাব দিয়েছেন, দেয়ালের অর্থায়নের পরিবর্তে ‘ডেকা’ বা ড্রিমারদের ওয়ার্ক পারমিট তিন বছরের জন্য নবায়ন করার ব্যবস্থা করবেনÑ তা ডেমোক্রেট নেতৃবৃন্দ ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ডেমোক্রেটরা বলেছেন, ট্রাম্প ‘ডেকা’র কোনো স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাবণা দেয়নি।
এদিকে ডেমোক্রেটরা, রিপাবলিকান সিনেটর যারা ২০২০ সালে নির্বাচনে নামবে, তাদের শাটডাউনের জন্য টার্গেট করে ৬ লাখ ডলারের ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন। সিনেটে বিরোধী দলীয় নেতা চাকশুমার এই ক্যাম্পেইন উদ্বোধন করেছেন।
ট্রাম্প পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার জরুরি মানবিক সাহায্য ও ৮০৫ মিলিয়ন ডলার পোর্ট অব এন্ট্রি নিরাপদ করার জন্য ড্রাগ উদ্ধার টেকনোলজির জন্য বরাদ্দ। এরপর অতিরিক্ত বর্ডার এজেন্ট, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা এবং নতুন ইমিগ্রেশন বিচারক টিম। কিন্তু এসব কিছু ট্রাম্প করতে চান ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার সীমান্ত দেয়াল নির্মাণের অর্থায়নের বিনিময়ে। সরকারের শাটডাউন বন্ধের জন্য এই বরাদ্দ হচ্ছে মূল পয়েন্ট।
স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেন, তার প্রস্তাব নতুন কিছু নয়। এ প্রস্তাব আগের বাতিলকৃত প্রস্তাবের নকল। প্রত্যেক প্রস্তাবই অগ্রহণযোগ্য। ট্রাম্পের বক্তব্যের পর পেলোসি বলেছেন, ‘ট্রাম্পের প্রস্তাবে যা অরিজিনাল রয়েছে, তা ভালো নয়। আর প্রস্তাবে যা ভালো রয়েছে, তা অরিজিনাল নয়।’
সিনেট মেজরিটি লিডার রিপাবলিকান মিটস ম্যাককনেল বলেন, তিনি ট্রাম্পের প্রস্তাব ফ্লোরে আনতে চান। অথচ ইতিপূর্বে পেলোসির পাস করা প্রস্তাব তিনি ফ্লোরে তুলেননি।
তিনি বলেন, বর্ডার খোলার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব সাহসিকতাপূর্ণ। আর তা বাস্তবায়নে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ দরকার। তিনি প্রস্তাবকে ফেয়ার আপোসকামিতা বলে উল্লেখ করেন।
সিনেট মাইনরিটি লিডার চাকশুমার বলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব অনেকটা ফেডারেল কর্মকর্তা-কর্মচারিদের হোস্টেজ টেকিংয়ের মতো।
রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিও ট্রাম্পের প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন।
স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তার বিবৃতিতে বলেন, ডেমোক্রেটরা চান কার্যকর সীমান্ত নিরাপত্তা সমাধান। পোর্ট অব এন্ট্রিতে কাঠামো নির্মাণ, অতিরিক্ত বন্দর ও সড়ক নির্মাণ। আরও কাস্টমস পেট্রোল বাহিনী নিয়োগ এবং বর্তমানে ৩ হাজার শূন্য পদ পূরণ করা এবং আরো ইমিগ্রেশন বিচারক নিয়োগ।
চ্যারিটিতে ক্ষুধার্থ মানুষের ভিড় : বেকার এবং অর্ধ-বেকার প্রায় ৮ লক্ষাধিক ফেডারেল কর্মচারির ভোগান্তি বর্তমানে চরমে উঠেছে। বহু কষ্টে সঞ্চিত অর্থকড়ি ফুরিয়ে যাওয়ার পর অনেকেই বর্তমানে চ্যারিটি বা দান-দক্ষিণার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটন ডিসির খ্যাতনামা শেফ যোসে আনড্রেসের বিশ্ববিখ্যাত ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার বেকার কর্মচারি বিনা পয়সায় খাদ্য সংগ্রহ করছেন বলে সর্বশেষ খবরে জানা যায়। মূলত ভূমিকম্প, খরা, আকস্মিক বন্যা, যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ও বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত বিশ্ববাসীকে বিনা পয়সায় জরুরি খাবার সরবরাহের উদ্দেশ্যে যোসে আনড্রেস তার এই ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন নামক দাতব্য খাদ্য সরবরাহ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। অথচ মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের কবলে পড়ে বর্তমানে খোদ ওয়াশিংটন ডিসির হাজার হাজার ফেডারেল বেকার কর্মচারি এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিনা পয়সায় খাবার সংগ্রহের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। দিন যতই যাচ্ছে লাইন ততোই লম্বা হচ্ছে বলে মিডিয়াসূত্রে জানা যায়। হোয়াইট হাউজ এবং ক্যাপিটলের মধ্যবর্তী পেনসিলভেনিয়া এভিনিউর কোথাও এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই, সর্বত্রই বিনা পয়সার খাবার সংগ্রহকারীদের উপস্থিতিতে সারাক্ষণ গিজ গিজ করছে।
লাইনে দাঁড়ানো জনৈক বেকার শ্রমিক বলেন, অন্যের কাছে হাতপাতা আমার স্বভাব পরিপন্থী। তাই বিনা পয়সার খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়াতে লজ্জাবোধ করছি। অথচ প্রয়োজন আইন মানে না। ক্ষুধার তাড়নায় বিকল্প খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অন্যদের সাথে আমাকেও লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের নির্বাহী পরিচালক নাটে মুক বলেন, এটি কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। বরং মনুষ্যসৃষ্ট কৃত্রিম সঙ্কট, রাজনৈতিক ফায়দা লাভের অসৎ অভিসন্ধি।
উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের পক্ষ থেকে লাইনে দাঁড়ানোদের মাঝে কুইনোয়া বাউলস, টোস্টেড স্যান্ডউইচ এবং স্যুপ বিতরণ করা হচ্ছে।
ধারদেনা করে চলছেন সরকারি কর্মচারিরা : আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের শাটডাউন চলছে। সরকার যারা চালান, তারাই বন্ধ করে দিয়েছেন দেশের চাকা। সব সম্ভবের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সবই সম্ভব!
কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ হয়ে যায়; রাজ্য সরকার নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। সরকারি ও বিরোধী দলের দ্বন্দে¦ সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণের পেটে ‘লাথি পড়ছে।’
এক মাস ধরে বন্ধ কর্মকর্তাদের বেতন। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করেই চলছেন তারা। কেউ কেউ ফুডব্যাংক থেকে খাদ্য নিচ্ছেন। ঘরের দামি জিনিসপত্র বিক্রি করে দিচ্ছেন। অনেকে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
আবার অনেকে খ-কালীন চাকরি করছেন। তাই রাগে-ক্ষোভে রাস্তায় নেমে পড়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। কাজের দাবিতে বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন। কারণ কাজে ফিরতে পারলেই জুটবে অর্থ, মিলবে খাবার।
মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ডেমক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের দ্বন্দে¦ অচল হয়ে পড়েছে সরকারের চাকা। বেতনহীন রয়েছেন বিভিন্ন বিভাগের ৮ লক্ষাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। গেলো বছরের ২২ ডিসেম্বর থেকে চলছে এ অচলাবস্থা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here