কোর্টহাউজ থেকে আইস’র গ্রেপ্তার বেড়েছে ১৭শ’ গুণ

17

ঠিকানা রিপোর্ট: আমেরিকাকে বিশ্ব অভিবাসীর দেশ বলা হলেও বিগত ২ বছরে ক্ষমতাসীন সরকার অভিবাসী বিদ্বেষী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার বর্ণনানুসারে ২০১৬ সালের তুলনায় অভিবাসী বিরোধী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কার্যকালে শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক সিটিতেই কোর্টহাউজের অভ্যন্তরে এবং কোর্টহাউজ থেকে আইস’র গ্রেপ্তার বেড়েছে ১৭শ’ গুণ কোর্টহাউজ সংলগ্ন এলাকায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট এজেন্টদের গ্রেপ্তার ১,৭০০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অপর একটি তথ্যানুসারে ২০১৭ সালের মত ২০১৮ সালেও নিউ ইয়র্ক সিটিতে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট এজেন্টদের হাতে কোর্টহাউজে গ্রেপ্তারের সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। দ্য ইমিগ্র্যান্ট ডিফেন্স প্রজেক্টের পক্ষ থেকে ২ ফেব্রুয়ারি জানানো হয় যে ২০১৭ সালে সিটির ৫টি বরোতে কোর্টহাউজে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১০৮ থাকলেও ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১২৭ হয়েছে।
প্রজেক্ট কর্মকর্তাগণ আরও জানান যে কিডন্যাপিং বা অপহরণের কায়দায় সাধারণ পোশাকধারী আইস এজেন্টগণ অনেককে এমনভাবে গ্রেপ্তার করেছেন যা গ্রেপ্তারকৃতদের স্বজনদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টির পাশাপাশি সন্দেহও জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে কোর্টহাউজে গ্রেপ্তারের সংখ্যা মাত্র ১৬ থাকলেও অভিবাসন বিরোধী সরকারের রোষাণলে পড়ে গত ২ বছরে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট এজেন্টদের হাতে গ্রেপ্তারের হার মাত্র ৬৯৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। আইস এজেন্টদের কোর্টহাউজে গ্রেপ্তারের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করেছেন ডিস্ট্রিক্ট এটর্নীগণ, মেয়র বিল ডি ব্লাসিয়ো এবং বিভিন্ন এডভোকেট গ্রুপ। তারা বলেন, অকারণ গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনের প্রতি অনুগত অভিবাসীদের মনে যে ভয়Ñভীতি ও সন্দেহ সৃষ্টি করা হচ্ছে তার ফলে অভিবাসীরা আদালতে হাজির হতে কিংবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করার উৎসাহ এবং মনোবৃত্তি হারিয়ে ফেলবেন। এতদসত্ত্বেও আইসিএ কর্তৃক নজিরবিহীনভাবে গ্রেপ্তারের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
ইমিগ্র্যান্ট ডিফেন্স প্রজেক্ট জানায়, তাদের কাছে গ্রেপ্তারকৃতদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন যে আইস এজেন্টগণ গ্রেপ্তারকৃতদের জোর করে মাটিতে ফেলে দিয়ে হাতকড়া পরিয়েছেন, স্বজনদের দেয়ালের সাথে আঘাত করেছেন এবং গ্রেপ্তারকৃতদের ছেলেমেয়ের সামনেই তাদের টেনেহিঁচড়ে কারে উঠিয়েছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয় আদালত ত্যাগের পর অনেককে বন্দুক তাক করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রুপটি বর্ণনানুসারে, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট এজেন্টগণ সর্বোচ্চ সংখ্যক ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন ব্রুকলীন থেকে এবং ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন কুইন্স থেকে। গ্রুপটির পক্ষ থেকে বলা হয় এটর্নীদের দপ্তর, লিগ্যাল সার্ভিস গ্রুপস এবং হটলাইন প্রতিবেদন কমপাইল করে গ্রেপ্তারকৃতদের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করেছে বলে জানায়।
গ্রুপটি আরও জানায় সিটির ২৪টি এলাকার কোর্ট হাউজ বা আশপাশ থেকে আইস এজেন্টগণ কাউকে গ্রেপ্তার করেন নি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে আইস এজেন্টদের কেউ এককভাবে গ্রেপ্তার অভিযান চালান নি। সাধারণত ৩ থেকে ৪ জন এজেন্ট একত্রিতভাবেই গ্রেপ্তার ক্রিয়া সম্পাদন করেছেন। তারা প্রায়শ অকস্মাৎ সোঁ করে আদালত কক্ষে ঢুকে পড়েছেন এবং নিজদেরকে আইস এজেন্ট পরিচয় না দিয়েই অভীষ্ট ব্যক্তিকে কোন ধরনের চিহ্নবিহীন যানবাহনে তুলে নিয়েছেন। গ্রেপ্তারকালে এজেন্টগণ কাউকে ব্যাজ দেখানোর কিংবা গ্রেপ্তারের কারণ ব্যাখ্যারও ধার ধারেন নি।
১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল: এটর্নীসহ ব্রুকলীন সুপ্রিম কোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় সাধারণ কাপড় পরিহিত ৪ জন এজেন্ট একব্যক্তিকে ঘিরে ফেলেছিল এবং হাতকড়া পরিয়ে লোকটিকে এটর্নীর থেকে আলাদা করে নিয়ে গিয়েছিল। এটর্নী জানতে চাইলে তারা আত্মপরিচয় না দিয়ে বলেছিল যে তারা নির্ধারিত দায়িত্বই পালন করছে। তারা লোকটিকে লাইসেন্স প্লেটবিহীন একটি গাড়িতে তুলে নিয়েছিল এবং এক মহিলা কিডন্যাপের আশঙ্কায় ৯১১ নম্বরেও কল করেছিলেন। অপর এক প্রতিবেদন অনুসারে, ৫ সেপ্টেম্বর মাতাসহ এক কমবয়সী ব্যক্তি ব্রুকলীন ক্রিমিনাল কোর্ট ত্যাগকালে সাদাকাপড়ের আইস এজেন্টগণ লোকটিকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং লোকটির মাতা পরিচয় জানতে চাইলে তারা পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আর লোকটির জননী সাহায্যের জন্য আর্তচিতকার শুরু করলে আইস এজেন্টগণ তাকে ধাক্কা মেরে দেয়ালের উপর ফেলে দিয়েছিলেন এবং বাক রুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর মার্কবিহীন একটি কারে চাপিয়ে লোকটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পুত্র অপহৃত হয়েছে আশঙ্কায় জননী বুক চাপড়ে ক্রন্দন জুড়ে দিয়েছিলেন। পরদিন পুত্র তাকে কল করার আগ পর্যন্ত মহিলা নিশ্চিত হতে পারেন নি যে তার পুত্র আইস কাস্টডীতে রয়েছে।
ইমিগ্র্যান্ট ডিফেন্স প্রজেক্টের এটর্নী লী ওয়াং বলেন, উক্ত ২ ব্যক্তির ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস সম্পর্কে তিনি জানতেন না। ওয়াং বলেন, রিপোর্ট পাওয়ার সময় ব্যক্তিদ্বয়ের বিশদ তথ্য আমাদের দেয়া হয়নি। আমার ধারণা উভয় ব্যক্তিরই কোন কাগজপত্র ছিলনা। তবে অনেক আইনানুগ গ্রীনকার্ডধারী কিংবা আইনসম্মত স্ট্যাটাসধারীকেও টার্গেট করা হয়ে থাকে।
যাহোক, দুঃস্থরাও আইসিএর টানা-জাল থেকে নিষ্কৃতি পায়না। প্রতিবেদন অনুসারে পারিবারিক সহিংসতার শিকারদেরসহ কুইন্স হিউম্যান ট্রাফিকিং কোর্টের এক মহিলাকে টার্গেট করা হয়েছিল। পিতামাতার দ্বারা নিগৃহিত অল্প বয়স্ক কিশোরদের স্পেশাল ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন ২০ বছর বয়স্ক ব্যক্তি। উক্ত ব্যক্তির কাছ থেকেও আইস এজেন্টগণ কিশোরদের ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্টেট কোর্ট অপারেশনসের দেখভালকারী কোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোর্ট হাউজের অভ্যন্তরে আইস অ্যারেস্ট হ্রাস পেয়েছে। অফিস অব কোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বর্ণনানুসারে ২০১৭ সালে সিটি কোর্টহাউজগুলোর অভ্যন্তরে আইস ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল। আর ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মাত্র ১৩ জনকে। তবে অফিস অব কোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কোর্টহাউজের বাইরের অ্যারেস্টের সাথে টালী করে দেখেনি।
ম্যানহাটনের ডেমক্র্যাটিক দলীয় স্টেট সিনেটর ব্রাড হোইলম্যান জানুয়ারির গোড়ার দিকে একটি বিল উত্থাপন করেছেন। উক্ত বিলে ওয়ারেন্ট ছাড়া কোট শুনানীর জন্য আগত কিংবা শুনানী শেষে যাওয়ার পথে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট এজেন্টদের কাউকে গ্রেপ্তার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হোইলম্যান বলেন, ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাসের প্রশ্ন না উঠিয়ে আদালতের কোন কর্মকান্ডে অংশ নেয়ার জন্য কেউ আগমনের পর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে তবেই আমরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারি। তিনি আরও বলেন, এ বছর কোর্টহাউজগুলোতে আইসিএ এজেন্টদের কর্মকান্ড আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাই আলবেনীতে এ আইনটির জন্য লড়াই করতে আমি বদ্ধপরিকর। এদিকে ইমিগ্র্যান্ট ডিফেন্স প্রজেক্টের প্রতিবেদনের ব্যাপারে আইস মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here