ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের

27

নিজস্ব প্রতিনিধি : ভারত ও চীন উভয়েই বাংলাদেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র। উভয়েরই গভীর স্বার্থ রয়েছে বাংলাদেশকে ঘিরে। স্বার্থ অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক, সামরিক, ভূ-রাজনৈতিক। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই প্রধানত বাংলাদেশের এতটা গুরুত্ব। সুবিধাভোগীদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বও বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের কূটনৈতিক-রাজনৈতিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা অপরিহার্য।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও কূটনৈতিক মহল চীনের এক অঞ্চল এক সড়ক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচন-পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ভারত চীনের এই মহাপরিকল্পনার বিপক্ষে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষেই তার অবস্থান ঘোষণা করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তিত অবস্থান ভারত কীভাবে নিয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্কে তা কীভাবে কতটা প্রভাব ফেলে, তা পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ। নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কয়েকটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। একজনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও উদ্বেগের বিষয়। এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন না নতুন কোনো ইঙ্গিতবাহী, তাও পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ।
আগামী এক শতাব্দীর আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ সামনে নিয়ে চীন এক অঞ্চল এক সড়ক পরিকল্পনা নিয়েছে। চীন থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান হয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ ঘটাবে এই মহাপরিকল্পনা। বিশ্বজুড়ে চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তৃত করার পরিকল্পনার চেয়েও ভারত উদ্বিগ্ন এই মহাসড়ক দিয়ে চীনের সামরিক সরঞ্জাম পাকিস্তানে পাঠানোর সুযোগ করে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে। এই মহাসড়ক কোনো দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির স্বার্থে ব্যবহার হবে না এবং অসুস্থ আঞ্চলিক ও সামরিক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে না, শুধু অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহৃত হবে-বাংলাদেশ নিশ্চয় এমন নিশ্চয়তা চীনের কাছ থেকে পেয়েছে। কূটনৈতিক মহল আরও মনে করে, চীন-মিয়ানমার-ভারত-পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে কানেকটিভিটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছয় বছর আগে। যদিও চুক্তি বাস্তবায়নে কেউ উদ্যোগী ভূমিকা এখনো নেয়নি। এই চুক্তি সম্পাদনের পর প্রস্তাবিত এক অঞ্চল এক সড়ক পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। চীন ইউরোপ-আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বে একচেটিয়া বাজার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। উল্লিখিত মহাপরিকল্পনাসহ চীনের সব কার্যক্রমের উদ্দেশ্যই অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ভারত দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হলেও প্রতিযোগিতায় তারা অনেক ক্ষেত্রেই চীনের চেয়ে পিছিয়ে। এক অঞ্চল এক সড়ক পরিকল্পনা চীনের আগামীর অগ্রগামী ধারা সুনিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে চীনের কাছ থেকে অনেক বেশি পরিমাণ সহযোগিতা পাচ্ছে। ভারত বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে তাদের যথেষ্ট বিনিয়োগও আছে। তবে চীনের তুলনায় ঢের কম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও পরবর্তী ধাপে উন্নত দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে চীন অনেক বেশি অর্থবহ, কার্যকর ভূমিকা আশা করছে। পদ্মা সেতু, দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রেল সংযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সেতু অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে চীন এক লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছে এরই মধ্যে। গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পে তারা লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। ঢাকা-লাকসাম কড লাইন নির্মাণে করতে যাচ্ছে চীন। এতে ঢাকা-চট্টগ্রামে রেলে যোগাযোগ দুই ঘণ্টারও বেশি সময় কমে যাবে। পদ্মার নিচ দিয়ে ট্যানেল নির্মাণ এবং মানিকগঞ্জে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তারা বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করবে। পায়রা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় স্বল্প সময়ে ও কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুবিধা নেবে চীন।
বাংলাদেশ থেকে ভারত তার দীর্ঘ প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশকে যা দিয়েছে তুলনামূলকভাবে তা অনেক কম। অনেক অঙ্গীকারবদ্ধ ন্যায্য পাওনা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত রেখেছে ভারত। তবে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে সমস্যার সমাধানে আন্তরিক প্রয়াসও অনেক ক্ষেত্রে ভারতের রয়েছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে আস্থাশীল সম্পর্ক বজায় রেখে দীর্ঘ মেয়াদে ভারসাম্য রক্ষা করার কঠিন কাজটি করছেন শেখ হাসিনা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনই বাংলাদেশের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত বড় রকমের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে না সরকার। বাংলাদেশকে এ পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে হয়তো আগামীতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here