সরকারকে ঐক্যফ্রন্টের স্বীকৃতি

18


বিশেষ প্রতিনিধি : ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবি করেছে তারা। এর ফল ও প্রতিবাদস্বরূপ তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেননি। নির্বাচনের ফল ও নবগঠিত সরকারের কোনো কিছু তারা না মানলেও স্বীকৃতি না দিলেও ৩১ জানুয়ারি লিখিত ও ১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঐক্যফ্রন্ট থেকে পাঠানো চিঠি পৌঁছে দিয়ে কার্যত ও পরোক্ষভাবে তারা নির্বাচনের ফলাফল ও প্রধানমন্ত্রীকে মেনে নিয়েছে। চিঠিতে সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্যও ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগ এবার নিয়ে পরপর তিন মেয়াদে সরকার গঠন করল। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হলেও এ নিয়ে বেশি আপত্তি ছিল না বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের। ওই সংসদে বিএনপির জোট বিরোধী দলে ছিল। কিন্তু তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীকে ও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় মেনে নিতে পারছে না। দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে তারা সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করানোর জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তাতে সফল হতে না পেরে সমঝোতার চেষ্টা করে সংলাপের মাধ্যমে। কিন্তু সংলাপ হলেও সমঝোতা না হওয়ায় বিএনপি এখন আর শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তারা মনে করছে, দশম সংসদের প্রধানমন্ত্রীকে মেনে নিয়েই তারা তার সঙ্গে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য সংলাপে বসেছেন, আলোচনা করেছেন। কিন্তু সমঝোতা হয়নি। এর পরও সুষ্ঠু নির্বাচনের আশায় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। এখন তারা একাদশের ফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ কারণে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন না। কারণ তারা মনে করছেন, শপথ নিলেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়া হবে। যদিও ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য শপথ নেওয়ার কথা বলেছেন। এ জন্য তারা গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে তার সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। যদিও এখনো অনুমতি মেলেনি সংসদে শপথ নেওয়ার। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। শেষ পর্যন্ত ড. কামালকে রাজি করাতে পারলে সংসদে যাবেন। বিএনপির এখনো পর্যন্ত সিদ্ধান্ত তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন না। বিএনপি এরই প্রতিবাদ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতে যায়নি এবং প্রধানমন্ত্রীকে কোনো চিঠিও আলাদা করে দেয়নি। এর আগে তারা সরকারের প্রতি বিভিন্ন দাবিদাওয়া জানালেও এবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তারা মনে করছে, এই সরকারকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না।
সূূত্র জানায়, বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গেলে একদিকে এই সরকারকে ও প্রধানমন্ত্রীকে মেনে নেওয়া হবে, সেই সঙ্গে এই নির্বাচনকেও মেনে নেওয়া হবে। সেই অবস্থানে তারা অনড় রয়েছে। তারা মনে করছে, আমন্ত্রণে সাড়া দিলেও তা মেনে নেওয়া হবে যদি চিঠি দেয়। তাই কোনোভাবেই বিএনপি এই নির্বাচন, সরকার ও সরকারপ্রধানকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়। তারা চেষ্টা করে যাবে শেষ পর্যন্ত সরকারকে স্বীকৃতি না দিয়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়া ও কর্মসূচির মাধ্যমে আরো একটি নির্বাচন নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে দেওয়ার জন্য।
এদিকে বিএনপি ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে নির্বাচনের ফল মেনে সরকারকে স্বীকৃতি না দিলেও কার্যত ঐক্যফ্রন্ট তার ব্যানারে এই নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে সরকারকে ও প্রধানমন্ত্রীকে মেনে নিয়েছে। স্বীকৃতিও দিয়েছে। আর ফল মেনে নিয়েই তারা প্রধানমন্ত্রীর বরাবর চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে তারা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীও সম্বোধন করেছে। নির্বাচন ফেয়ার হয়নি বলে তারা যে আমন্ত্রণে যেতে পারছে না তারও ব্যাখ্যা দিয়েছে। চিঠির কোথাও প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়নি তারা নির্বাচনের ফল মানে না ও ফল প্রত্যাখ্যান করেছে। এটাও বলেনি, সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুনরায় সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।
জানা গেছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে জামান টাওয়ারের কার্যালয়ের ঠিকানার প্যাডে ৩১ জানুয়ারি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর বরাবর চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি এককভাবে স্বাক্ষর করলেও সেখানে তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন। কার্যত তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকেই ওই চিঠি দিয়েছেন।
ওই চিঠির শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষণে সম্বোধন করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, গণভবন, ঢাকা। মহোদয়, গণভবনে ২রা ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুভেচ্ছা বিনিময় ও চা চক্রের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আজ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চা চক্রের আমন্ত্রণ অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে আলোচিত হয়েছে। কমিটি এই চা চক্রে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’ সেখানে আরো বলা হয়, ‘৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে গঠিত সরকার কোনোভাবেই নৈতিক নয়। সেদিন দেশের মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে প্রতিনিধি নির্বাচন করার ক্ষমতাকে হরণ করা হয়েছে।’
চিঠিতে কোথাও ফের নির্বাচনের দাবি তোলা হয়নি, এমনকি ফল প্রত্যাখ্যানেরও কোনো বিষয় নেই। চিঠির শেষ প্যারায় লেখা হয়েছে, ‘অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হাজার হাজার নেতা-কর্মী এখনো জেলে আছে। নতুন নতুন মামলায় আরো অসংখ্য নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আহূত চা চক্রে অংশগ্রহণ কোনোক্রমেই সম্ভব নয়।’ ঐক্যফ্রন্টের তিনজন প্রতিনিধি এই চিঠি পৌঁছে দেন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-২ খোরশেদ আলমের কাছে। তিনি ১ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ওই চিঠি রিসিভ করেন। ফ্রন্টের প্রতিনিধিদলে ছিলেন ফ্রন্টের দপ্তর প্রধান জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু, মিডিয়া উইংয়ের প্রধান জাহাঙ্গীর আলম প্রধান এবং সমন্বয় কমিটির সদস্য আজমিরি বেগম।
সূূত্র জানায়, বিএনপি এখনো ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করার কারণে তারা মনে করে সরকারকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চা আপ্যায়নের অনুষ্ঠানে গিয়ে এ কারণে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। ঐক্যফ্রন্টের প্যাডে চিঠি দেওয়া হয়। বিএনপি আলাদা করে কোনো চিঠি দেয়নি।
সরকার বিএনপির এই ধীরে চলো নীতিতে বিচলিত নয়। তবে সরকার চাইছে ঐক্যফ্রন্টের ও বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে আসুক। সে জন্য চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। বিএনপির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগের হিসাব খুব সোজা।
এদিকে বিএনপির নেতারা মনে করছেন, এখন বিভিন্ন দল নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারে বসলেও কার্যত একদলীয় শাসনে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। একনায়কতন্ত্রও চলছে। তাই একজন যা বলছেন তা-ই হচ্ছে। তারা এ ধরনের প্রচারণাও বিভিন্ন মহলে চালানোর চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন দেশও বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুরোপুরি নেই বলেও মন্তব্য করছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে। বিএনপির ও ওই সব গণমাধ্যমের কথা সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না। সরকারের মতে, এ দেশের জনগণ ও ভোটাররা তাদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করেছে। সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। সব দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট বিভিন্ন কারণে হেরেছে। এখন তারা পরাজয় মেনে নিতে না পেরে নানা কথা বলছে। সেই সঙ্গে অভিযোগ করছে, নির্বাচন সুষ্ঠুু হয়নি, কারচুপি হয়েছে। নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করারও দাবি জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। কমিশন ওই সব দাবি আমলে নেয়নি।
অন্যদিকে বিএনপি বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সংলাপ আপাতত স্থগিত করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অন্যান্য নেতার মুক্তির দাবিতে ঘোষিত ৮ ফেব্রুয়ারি জনসভার পরিবর্তে ওইদিন প্রতিবাদ সমাবেশ করবে। রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। তারা নির্বাচন বাতিল ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সারা দেশে প্রতিবাদ সমাবেশও করবে। এর কারণ হিসেবে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা বইমেলার কারণে স্থগিত করা হয়েছে। তবে একই দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here