এরশাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি, জাপার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

12


নিজস্ব প্রতিনিধি : এরশাদের শারীরিক অবস্থা করুণ পরিণতির দিকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিকল্প পথের সন্ধান শুরু করেছেন। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম এরশাদের অবর্তমানে এই পার্টিও যে বিলীন হয়ে যাবে, সমমনা বড় দলে একাকার হয়ে যাবে, তার আলামতও স্পষ্ট।
ক্ষমতাকেন্দ্রিক আদর্শহীন এই দলে ক্ষমতালিপ্সু অনেক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ যোগ দিয়েছিলেন। প্রবীণ, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান, মিজানুর রহমান চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কাজী জাফর আহমদ, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রফেসর এম এ মতিন, শামসুল হুদা চৌধুরী, কোরবান আলী, ইউসুফ আলী, শামসুল হকসহ জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত আওয়ামী লীগ, বিএনপির নেতাদের এরশাদের পার্টিতে যোগ দেওয়ার ঢল নেমেছিল। এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে তারা এরশাদের সঙ্গেই ছিলেন। এরশাদ ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তাদের অধিকাংশ, প্রায় সবাই জাতীয় পার্টি ছেড়েছেন। কার্যত অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ কেউ এখন আর জাতীয় পার্টিতে নেই।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে ভাঙার টার্গেট নিয়েই এরশাদ জাতীয় পার্টি গড়েছিলেন। কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা বিএনপি ত্যাগ করায় দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল। বেগম খালেদা জিয়া তার দৃঢ়চেতা, সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দলকে টিকিয়ে রাখেন এবং ক্ষমতায় আসীন করেন। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবর্তমানে অদূরদর্শী, সুবিধা ও সুযোগসন্ধানী দুর্বল নেতৃত্ব বিএনপিকে আরেক দফা কঠিন সংকটে ফেলেছে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক মিত্র হিসেবে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের সখ্য বরাবরই ছিল। আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপিকেই তারা অনেক কাছের মনে করেন। বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর মতো শক্তিহীনতা এবং দলটির নেতা-কর্মীরা প্রচ- চাপের মধ্যে থাকায় জাতীয় পার্টির বিএনপিমুখী নেতা-কর্মীরাও বিএনপিতে গিয়ে হামলা-মামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নন। মহাজোটের অংশীদার হিসেবে জাতীয় পার্টির কয়েকজন সরকারে থাকার পরও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় এবং জেলা, উপজেলার নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ, হতাশা, ক্ষোভ দানা বেঁধে আছে। স্থানীয় এমপি, দলীয় মন্ত্রীদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত সুযোগ-সুবিধা পাননি বলেই তাদের হতাশা ও ক্ষোভ। এরশাদের দ্রুত পরিবর্তনশীল মানসিকতা, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও দলীয় ইস্যুতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, দলের মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দল, স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতার দুর্নীতি, যোগ্য, ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন, পদ ও মনোনয়ন-বাণিজ্য, রাজনৈতিক-সাংগঠনিকভাবে অযোগ্য, অদক্ষদের শীর্ষস্থানীয় পদে আসীন করাসহ বিভিন্ন কারণে জাতীয় পার্টিতে এ পর্যন্ত চার দফা ভাঙন হয়েছে। কর্মী-নেতারা বিভক্ত হওয়ায় মূল পার্টি অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিস্ময়করভাবে তার পরও এরশাদ ও জাতীয় পার্টি একটি সম্মানজনক অবস্থায় রয়েছে। সারা দেশে সাংগঠনিক শক্ত ভিত না থাকলেও রংপুরে এরশাদ সুদৃঢ়, সুসংহত অবস্থান করে নিতে পেরেছেন বলেই জাতীয় পার্টি রয়েছে। এরশাদের অবর্তমানে এই অবস্থান থাকবে কি না তা নিয়ে শঙ্কিত পার্টির নেতা-কর্মীরা। বাস্তবে জাতীয় পার্টি একটি আঞ্চলিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
রংপুরে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী ভিত করার চেষ্টা করছে। এরশাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তারা বৃহত্তর রংপুরে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে। এরশাদের অবর্তমানে তার ছোট ভাই জি এম কাদের রংপুরে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ধরে রাখতে পারবেন কি না শঙ্কিত দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী। এরশাদ তার অবর্তমানে কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রেসিডিয়ামের অধিকাংশ সদস্যসহ কেন্দ্রীয় কমিটির অনেকেই জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান পদে মেনে নিতে না পারলেও এরশাদের শেষ বেলার ইচ্ছা হিসেবে প্রকাশ্যে বিরুদ্ধাচরণও করতে পারছেন না। রওশন তীব্রভাবে অসন্তুষ্ট হলেও তারও প্রচ- শারীরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হাওলাদারকে যেমনি অপছন্দ করতেন, কাদেরকেও মেনে নিতে পারছেন না। এরশাদের অভিপ্রায়ের বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেওয়ার মতো অবস্থা তাদের নেই। তবে এরশাদের অবর্তমানে তাদের ভূমিকা কী হয়, কোথায় তাদের অবস্থান দাঁড়ায়, তাও নিশ্চিত নয়। সরকারপ্রধান নিজেও তাদের অনেককে অফার দিয়ে রেখেছেন। পার্টিগতভাবে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে সরকার জাতীয় পার্টিকে রাজনৈতিক স্বার্থেই নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জি এম কাদেরকে পার্টির নেতৃত্বে চেয়েছেন। খালেদা-তারেকের অনুপস্থিতিতে সাহসী বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অবর্তমানে বিএনপি বর্তমান কঠিন সময় যাতে উতরে উঠতে না পারে, সরকারের দিক থেকে সে প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল। বিএনপির নেতা-কর্মীরা সাধারণভাবে আওয়ামী লীগবিরোধী। তাদের মধ্যে স্বল্প সংখ্যকই আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার চেয়ে জাতীয় পার্টিতে অধিক হারে ঝুঁকবে। জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ না দেখলে তারা তা নাও করতে পারেন। সেদিক বিবেচনায় জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করার মতো কোনো পদক্ষেপ সরকারের দিক থেকে এ পর্যায়ে নেওয়া হবে না। তবে ব্যারিস্টার আনিস, কাজী ফিরোজ রশিদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাসহ জাতীয় পার্টির অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় নেতার শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি দুর্বলতা থাকায় সময়মতো তাদের আওয়ামী লীগে টেনে নেওয়া যাবে বলে দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here