‘তারেক’ মোহ কাটছে

24

ঠিকানা ডেস্ক : যতই দিন যাচ্ছে ততই ‘তারেক’ মোহ কাটছে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে। আর এই তারেক মোহ শুধু দেশের নেতাকর্মীদের নয়, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে যেসব নেতাকর্মী তারেকে ‘আবিষ্ট’ ছিলেন তাদেরও কাটতে শুরু করেছে।
যদিও এখনও বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ছাড়া এ বিষয়ে কোনো নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কিছু বলছেন না।
গত ২৭ জানুয়ারি দেশের একটি গণমাধ্যমে প্রথম লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলের হাল ধরতে হলে দেশে ফিরে আসতে হবে। তিনি মনে করেন, একাদশ নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি ভুল করেছে।
বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান বলেন, যদি দলের নেতৃত্ব দিতে হয়, তারেক রহমানকে দেশে আসতে হবে। দেশে এসেই তাকে নেতৃত্ব দিতে হবে। দল পরিচালনা করতে হবে। বিদেশ থেকে দলের নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয় বলেও মনে করেন দলের সিনিয়র এই নেতা।
অবশ্য বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই এখন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিষয়ে আগের মতো ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন না। যদিও এ বিষয়ে তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ। তবে, মোটা দাগে অনেকে বলার চেষ্টা করেন, বিএনপিকে লন্ডনমুখী থাকলে আর চলবে না। তাকে প্রকৃত অর্থে দেশমুখী হতে হবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে গড়া দেশের অন্যতম বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলটি ধীরে ধীরে জনসম্পৃক্ততা হারিয়ে ফেলবে। পুরোপুরি জনবিচ্ছন্ন হয়ে যাবে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় একযুগেরও বেশি সময় ধরে লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন। শোনা যায়, সেখানে তিনি ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। তিনি দেশ থেকে অর্থ পাচার মামলায় দ-প্রাপ্ত আসামিও বটে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অপসারণ করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। যা ওয়ান ইলেভেনের সরকার হিসেবে পরিচিত। ওই সরকারের পক্ষ থেকে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মামলা দায়ের হতে থাকে। এরপর ৭ মার্চ একটি দুর্নীতি মামলার আসামি হিসেবে তারেক রহমানকে তার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে আরও ১৩টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করে তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়।
২০০৮ এর আগস্টে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলাগুলো আদালতে গতি লাভ করে। প্রায় ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সবগুলো মামলায় তারেক রহমানের জামিন হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১১ সেপ্টেম্বর বিশেষ কারাগার থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বিএসএমএমইউতে তারেককে দেখতে যান। সেদিন রাতেই তারেক রহমান উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কে কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণীর নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের দুর্নীতি নিয়ে সব সময়ই উচ্চ কণ্ঠ।
চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তারেক রহমান লন্ডনে চলে গেলে সেখানে তাকে ঘিরে দেশের মত আবারও একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠে। তার চারপাশে দেশের ‘বহুল বিতর্কিত হাওয়া ভবন’-এর বিতর্কিতরা আবারও ভিড় করা শুরু করে। এছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকাসহ প্রবাসে অবস্থানরত বিএনপির নেতাকর্মীরা নিয়মিত লন্ডনে হাজিরা দিতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে তারেক রহমান রীতিমত ‘ক্রেজে’ পরিণত হন। এসব প্রবাসী নেতাকর্মীরা তাকে নিয়মিত অর্থের জোগান দিতে থাকেন। সমালোচনা আছে, লন্ডনে কোনো কাজ বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না থাকলেও সেখানে তারেক অত্যন্ত বিলাসী জীবন যাপন করেন।
বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি দলীয় একাধিক প্রার্থী লন্ডনে হাজিরা ও দলীয় মনোনয়ন পেতে তারেক রহমানকে উৎকোচ প্রদানের বিষয়টি রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে আলোচিত।
তবে ধীরে হলেও প্রবাসী নেতাদের মধ্যে এখন তারেক মোহ কাটতে শুরু করেছে। আগে যেখানে মাসে এক বা একাধিকবার প্রবাসী নেতারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে তার কাছে নিয়মিত ছুটে যেতেন, সেখানে এখন ভাটার টান এসেছে। তারেক রহমানের নিজের ও তার চারপাশের সুবিধাভোগীদের বিতর্কিত কর্মকা-ের কারণেই এসব নেতাদের মধ্যে তারেক ‘ক্রেজ’ কাটছে বলে জানা যায়।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের যেসব নেতা অতীতে তারেক রহমানের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য সব সময় মুখিয়ে থাকতেন তারা এখন নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক প্রোফাইলে আগের বিএনপি নেতা পরিচয় বর্তমানে ‘হাইড’ করেছেন বা মুছে ফেলছেন। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে প্রায় ২৫ বছর ধরে বসবাস করেন ফিনল্যান্ড বিএনপির একাংশের সভাপতি জামান সরকার মনির। তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইলে আগে লিখতেন ‘সভাপতি, ফিনল্যান্ড বিএনপি’। এখন তিনি বিএনপির রাজনীতি থেকে বিমুখ হয়েছেন। এমনকি ফেসবুক থেকে ‘সভাপতি, ফিনল্যান্ড বিএনপি’ পরিচয়টিও সরিয়ে ফেলেছেন।
একইভাবে জার্মান বিএনপির অনেক নেতারও ফেসবুক ঘেটে দেখা যায় তারা নিজের প্রোফাইল থেকে বিএনপি নেতা পরিচয়টি সরিয়ে ফেলেছেন।
লন্ডনে বাস করেন বিপ্লব কুমার পোদ্দার। তিনি ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতা। ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ভিপি। বর্তমানে তিনি লন্ডনে সলিসিটর ও কমিশনার ফর ওথস এ্যাট হ্যামলেট সলিসিটরস এলএলপি হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি লন্ডন বিএনপির বিগত কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদকও ছিলেন। একজন সুলেখক মি. পোদ্দার লন্ডন বিএনপির বর্তমান কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল থেকে বিএনপি সংশ্লিষ্টতাও মুছে ফেলেছেন।
দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নরওয়ে বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বাদল ভূঁইয়া। তিনিও নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ‘নরওয়ে বিএনপির সভাপতি’ পরিচয়টি হাইড করেছেন। বাদল ভূঁইয়া বিএনপির রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, আর কত। বিএনপির রাজনীতির অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছি। কিন্তু কোনো আফসোস নেই। তবে, এখন বিভিন্ন কারণে আমি আর বিএনপির রাজনীতি নিয়ে আশাবাদী নই।
বাদল ভূঁইয়া বলেন, একজন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ও শহীদ জিয়ার আদর্শের অনুসারী হিসেবে আমি বিএনপির মঙ্গল কামনা করি, ভাল চাই। একই সঙ্গে বিএনপির দেশমুখী হওয়া একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আমাদের নেতা তারেক রহমান আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরে ভবিষ্যতে অবশ্যই দলের হাল ধরবেন, এটা যেমন বিশ্বাস করি; তেমনি মনে করি বিএনপির সময় এসেছে লন্ডনমুখিতা বাদ দেয়ার। দেশে দলের যে সিনিয়র-মধ্যম ও মাঠ পর্যায়ের নেতা আছেন তাদের দলের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত। সংগঠনের প্রতি নজর দেয়া উচিত। এসব নেতারা বিএনপি থেকে অনেক কিছু পেয়েছেন। দলের প্রতিও তাদের দায়িত্ব আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here