টেক্সাস ডিটেনশন সেন্টারে ইমিগ্র্যান্টদের অনশন চলছে

জোর করে নাক দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে

7

কাজী ইবনে শাকুর : ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) টেক্সাস ডিটেনশন খানায় আমেরিকার অভ্যন্তরে আটককৃত অনশনরত ইমিগ্র্যান্ট বন্দীদের জোর করে আহার করাচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকে মাসাধিকাল ধরে অনশনে আছে। স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় এ বিষয়ে বিশদ রিপোর্ট হয়েছে।
এসোসিয়েটেড প্রেস এর পক্ষ থেকে রিপোর্ট করা হয়, ছয় ইমিগ্র্যান্টকে নাকের ভেতর দিয়ে জোরপূর্বক প্লাস্টিকের নল ঢুকিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। এই অনশন এক মাস ধরে চলছে। আইস এর পক্ষ থেকে বলা হয় আল প্যাসো প্রসেসিং সেন্টারে ১১ জন বন্দী খাবার নিতে নারাজ। অনেকে এর মধ্যে ৩০ দিনের বেশি ধরে অভুক্ত। এসোসিয়েটেড প্রেসের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে এমন বন্দীরা বলেছে, ভারত ও কিউবা থেকে আসা প্রায় ৩০ জন বন্দী খেতে অস্বীকৃতি জানায়। যোগাযোগকারীদের সাথে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও একজন এটর্নি ছিলেন। অনশনকারীদের মধ্যে অনেকে এত দুর্বল যে, তারা দাঁড়াতে পারেন না। এরা ছাড়া মিয়ামী, ফিনিক্স, সান দিয়াগো সান ফ্রান্সিসকোতে আরও চারজন অনশন করছে বলে আইস মুখপাত্র জানিয়েছেন। অনশনকারীদের মধ্যে ভারতীয় বলে কতিথদের মধ্যে বাংলাদেশিও থাকতে পারে বলে অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে। অনশনরতরা বলেছে, তারা অনশন শুরু করেছে আইস কর্মকর্তাদের মৌখিক গালিগালাজ ও প্রহরীদের কাছ থেকে ডিপোর্টেশন এর হুমকি পাওয়ার পর। তারা দীর্ঘমেয়াদি লকআপ এর বিষয়েও চিন্তাগ্রস্ত। অথচ তারা এখন আইনি প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষায় আছে।
মধ্য জানুয়ারিতে যখন তারা অনশনে রয়েছে তখন এক ফেডারেল জাজ তাদের জোর করে খাওয়ানোর অনুমতি দেন। প্রথম টেক্সাসে আল পেসোর কতিপয় অনশনকারীদের জোর করে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। মুখপাত্র বন্দীদের অভিযোগ কি তা অবশ্য বর্ণনা করেননি। তবে বলা হয় আল পেসো প্রসেসিং সেন্টার ফেডারেল স্ট্যান্ডার্ড মেনে জোর করে খাওয়াবার ব্যবস্থা করে। আইস কর্মকর্তারা বলেন বন্দীরা যে খাবার ও পানীয় পান করে তা তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য তারা পরীক্ষা করে দেখেন।
যে সব লোকদের নাক দিয়ে খাওয়ানো হয় তাদের নাক দিয়ে রক্ত ঝরে। তারা দিনে কয়েকবার বমি করে বলে পাঞ্জাব থেকে আগত দুইজনের এক চাচা অমৃত সিং জানিয়েছেন। কালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত সিং বলেন, তারা বড়ই দুর্বল। তাদের শরীর ভালো না। তাদের বারবার হাসপাতালে নেয়া হয়। তারা জানতে চায় তারা এখনো কেন জেলে? তারা তাদের অধিকার পেতে চায়, সরকারের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন চায়।
তারা দুইজন এসাইলাম চাচ্ছেন। কোর্ট রেকর্ডে দেখা যায় যে, তারা সীমান্ত অতিক্রম করে গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকায় প্রবেশ করে এক মিসডিমিনার অপরাধ করেছে। অতীতে সারাদেশে ইমিগ্রেশন সেন্টারগুলোতে বড় ধরনের অনশন হয়েছে। এবং সেখানে বিচার করা অনশনকারীদের অসম্মতিতে জোর করে খাওয়ানোর অনুমতি দেয়া হয়। মিডিয়া রিপোর্ট বা সরকারি বিবৃতিতে কখনই বলা হয়নি যে, ইমিগ্র্যান্টরা অনিচ্ছাকৃতভাবে খেয়েছে। তাদের নাক দিয়ে খাওয়ালেও তারা অনশন ভেঙেছে বলে এমন কোনো নজির নেই। আইস এর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। জবাব পাওয়া যায়নি কতবার তাদের জোর করে খাওয়ানো হয় দিনে।
কাউকে জোর করে খাওয়ানোর জন্য মেডিকেল এক্সপার্টরা একটি প্লাস্টিক টিউব জারে তাদের হাতের সাথে পেঁচিয়ে নেন, তারপর টিউবের আলার লুব্রিকেন্ট দেয়া হয় আর তা রোগীর নাক দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয়, রোগীকে টিউব দিয়ে দেয়া তরল সামগ্রী ও জল গলাধীকরণ করানো হয়। তা কখনও বেশ বেদনাদায়ক।
আল-পাসো ডিটেনশন ফ্যাসিলিটি এয়ারপোর্টের কাছে ব্যস্ততম সড়কে অবস্থিত। আর তা চেইন ফেন্স দিয়ে ঘেরাও করা ও প্রহরী বেষ্টিত।
নন প্রফিট ফ্রিডম ফর ইমিগ্র্যান্টস এর পরিচালক খ্রিস্টিনা ফিরালহো বলেন, নিজেরা অনশন করার মাধ্যমে এই লোকগুলো আইস তাদের যে যন্ত্রণা দিতেছে এবং আইস যে তা করদাতাদের কাছ থেকে গোপন রাখতে চায়, তা জনগণকে জানাতে চায়। মিশিগানের এক এটর্নি রুবী কাউর এক অনশনকারীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনি বলেন, তার ক্লায়েন্টকে তিন সপ্তাহ পরে জোর করে খাওয়ানো হয়েছে এবং তাকে স্যালাইন দেয়া হয়েছে। তিন সপ্তাহ তিনি কোনো পানি পর্যন্ত খাননি।
কাউর বলেন, যারা অনশনে আছেন, তাদের একাকী রাখা হয়েছে। তারপর আইস অফিসাররা তাদের এক প্রকার মানসিক নির্যাতন করে। আর এসাইলাম আবেদনকারীকে বলে তারা তাকে পাঞ্জাবে ফেরত পাঠাবে।
কিউবান এক বন্দীর দশাও তাই। সে বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। তার অনশন চলছে। কারণ দেশে ফেরত পাঠালে সে মারা পড়বে।
জানা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় জোর করে খাওয়ানোর নিয়ম ভিন্ন। ফেডারেল কোর্ট কোনো অনশনকারীকে জোর করে খাওয়ানোর জন্য জাজের আদেশ বা অনুমতি লাগবে কিনা তা নির্ধারণ করেননি। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুমতি বা আদেশ দেয়া হয় গোপনে।
ওয়াশিংটনে টাকোসাতে বন্দীদের জোর করে খাওয়ানোর জন্য কোর্ট ছয়বার আদেশ দেন। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে আরিজোনায় এক বিচারক অনশনত এক ইরাকি বন্দীকে জোর করে খাওয়ানো ও ইরাকের আরেক খ্রিস্টান বন্দীকে তার বন্ধুর সাথে থাকতে না দেয়ার ব্যাপারে আইসকে অনুমতি দেননি।
২০১৫ সালের মে মাস থেকে ১৮টি ইমিগ্রেশন বন্দী শিবিরে ১৩৯৬ জন লোক অনশন করেছেন বলে ফ্রিডম ফর ইমিগ্র্যান্টস নামে এক ননপ্রফিট সংগঠন ডকুমেন্ট করেছে। কখন থেকে জোর করে খাওয়ানো শুরু হয়েছে তা ফ্রিডম ফর ইমিগ্র্যান্টস এর পরিচালক খ্রিস্টিনা ফিরালহো উল্লেখ করেননি। ২০১২ সালে গুয়ান্তনামো বে তে অত্যাচারের বিরুদ্ধে অনশন হয়। ২০০৬ সাল থেকে ব্যাপকভাবে অনশনের সময় জোর করে খাওয়ানো হয়। চার সপ্তাহ ধরে না খেয়ে কাটানোর পর শরীরের মেদ মাংসে ধস নামে। অর্থাৎ মেটাবলিক সিস্টেম ভেঙে পড়ে। আর অনশনকারীদের স্থায়ী ক্ষতিসাধন হতে পারে বলে সিয়াটলের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন এর ড. মার্ক অভিমত ব্যক্ত করেন। জোর করে খাওয়া মেডিকেল পেশার জন্য এথিকেল প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশন। আর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা ডাম্পারদের অংশগ্রহণকে এসোসিয়েশনের গৃহীত এথিকসবিরোধী বলে মনে করেন। ‘একজন রোগী যার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আছে সে যে কোনো মেডিকেল হস্তক্ষেপ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এই এসোসিয়েশন টোকিওর বিশ্ব মেডিকেল এসোসিয়েশনের ঘোষণাও গ্রহণ করেছে। এই ঘোষণায় বলা হয়েছে, কোনো বন্দী যদি খাদ্য নিতে অস্বীকার করে এবং ডাক্তাররা বিশ্বাস করে তারা রেশনাল জাজমেন্ট দিতে পারঙ্গম তাদের কৃত্রিমভাবে খাওয়ানো যাবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here