ডাকসু নির্বাচন : গণতন্ত্রের আরেক পরীক্ষা

27

ঢাকা ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১১ মার্চ। সেই সঙ্গে ইউনিভার্সিটির সব হল সংসদেও একই সঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে হল সংসদের নির্বাচন এবার কেন্দ্রের সঙ্গে একসাথে না হয়ে পৃথক পৃথক হলে ভোট গ্রহণ করা হবে। এ নিয়ে ছাত্রসমাজের মধ্যে নানা প্রশ্ন থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত সে রকমই।
ডাকসুকে বলা হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট। রাজনীতিবিদ উৎপাদনের কারখানা। সকল গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের আধার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান-পরবর্তী বাঙালির উপনিবেশবিরোধী যত আন্দোলন, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪-তে বাঙালির ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের ভোটের আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-তে ৬ দফার আন্দোলন, ৬৯-এ আইয়ুববিরোধী গণ-আন্দোলন, ৭০’র নির্বাচন, যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে বিজয় অর্জন করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ববঞ্চিত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার সাংবিধানিক নেতৃত্বদানের অধিকার অর্জন করে এবং সর্বোপরি ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে এক অনন্য অবদান রাখে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে তাদের আন্দোলন এবং জীবনদানের ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জাতির যেকোনো সংকটে পাশে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্তই এই মহান প্রতিষ্ঠানটিকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সৃষ্টির উর্বর ভূমি হিসেবেই গণ্য করে দেশের মানুষ। মনে করে তাদের মুক্তির পথ দেখানোর শক্তি তারা। আগামী দিনের উপযুক্ত ও বিশ্বস্ত নেতা জন্ম নেন ওই সংগ্রামী শক্তির মধ্য থেকেই। জাতির চরিত্র নির্মাণের সেই কারখানা, দেশের নেতৃত্বদানের বিশ্বস্ত ও আস্থাবান নেতা নির্মাণের সেই নির্বাচন হতে চলেছে দীর্ঘ ২৮ বছর পর। সেই নির্বাচন নিয়ে সংগত কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক বিশেষ ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। সেই উত্তেজনা যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে, তা নয়। বাংলাদেশের সমগ্র ছাত্রসমাজের মধ্যেই সে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, উচ্চ থেকে নি¤œস্তর পর্যন্ত দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে, সর্বত্রই নির্বাচনের দাবি উঠছে। তবে এ কথা বলা যাবে না যে এ নির্বাচন নিয়ে কেবল ইতিবাচক আবেগ, আনন্দ, উচ্ছ্বাসই প্রকাশ পাচ্ছে; অনেক নেতিবাচক ভয় ও শঙ্কাও প্রকাশ পাচ্ছে ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের একাদশ নির্বাচনের পরপরই ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা আসায় যেমন আলোচনার ঝড় বেড়েছে, তেমনি সর্বস্তরে পক্ষে-বিপক্ষেও কথা হচ্ছে। বাংলাদেশের চিরায়ত প্রথায় সরকারের মতলবও খোঁজা হচ্ছে কেন এত দিন পর অনেকটা আকস্মিকই নির্বাচন দেওয়া নিয়ে। অনেকেই বলে থাকেন, বিরোধী দলহীন সংসদে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা, সমালোচনা করার কেউ নেই। সেই রেশ ধরেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সংসদগুলোও সরকার একচেটিয়া দখলে নেওয়ার কৌশল হিসেবেই এই নির্বাচনী উদ্যোগ।
একটা কথা মনে হয় কোনো নিন্দুকও অস্বীকার করতে পারবে না, বাংলাদেশে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য সংসদে বিরোধী দল লাগে না। চায়ের দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট সর্বত্রই খোলামঞ্চে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে, যুক্তি থাক না থাক সব বিষয়ে আর সংসদে বিরোধী দল নেই, সে কথাও ঠিক নয়। বিরোধী দল ঠিকই আছে। আর যে কজন এখনো শপথ নেননি, তারাও ৯০ দিনের মধ্যে যেকোনো সময় শপথ নিয়ে অধিবেশনে যোগ দিয়ে সরকারের সমালোচনায় অংশ নিতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেই দিয়েছেন, ১৯৭০-এর নির্বাচনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বলেছিলেন, ‘যুক্তিসংগত কথা বললে পার্লামেন্টে তিনি একজন হলেও তার কথা শোনা হবে এবং গুরুত্ব দেওয়া হবে, তেমনি বলেছেন, সংসদে সকলকেই কথা বলার স্বাধীনতা দেওয়া হবে। বিরোধী দলকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করা হবে না।’
আসলে সমাজে আমরা অধঃপতনের কথা যতই বলি, আর যতই বলি যুক্তিবাদী মানুষের অভাবের কথা কিংবা সমাজে তাদের মর্যাদার আসন না থাকার কথা বলি, আসলে সবই আছে। সমাজ একেবারে সভ্যশূন্য হয়ে পড়লে সমাজ চলত না। আসলে যারা নিজেদের কর্মদোষে সমাজে আসনচ্যুত হন, তারা সমাজের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের নির্দোষ ভাবতে চান। সমাজের চারদিক আজ যতটুকু অন্ধকার, যতটুক ধস, তার দায় যারা সবকিছু নেতিবাচকভাবে দেখেন তারাও একেবারে এড়াতে পারবেন না। পাপ তাড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে তো অনেকেই পঙ্কিলে পা ডুবিয়েছেন। আমরা দেখি না ভালো কথা, সংগত কথা বললে জনগণ গ্রহণ করে কি না, কিংবা মর্যাদা দেয় কি না।
যা হোক, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে বেশি কথা হচ্ছে। কারচুপি এবং বল প্রয়োগে ফল পাল্টে দেওয়ার আশঙ্কা নিয়েও অনেককে সোচ্চার দেখা যাচ্ছে। আসলে কানে হাত দিয়ে দেখার শ্রম না নিয়ে চিলের পেছনে দৌড়ানোর অভ্যাস আমরা যত দিন ত্যাগ করতে না পারব, তত দিন এ রকম পরিবেশ থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না।
তবে আশার কথা, এখন পর্যন্ত অমঙ্গলের কোনো আলামত ডাকসু নির্বাচন নিয়ে দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সব ছাত্র সংগঠনের গভীর আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। ১৯৯১ সালে ডাকসুর গঠনতন্ত্রে যে সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছিল, সে অনুযায়ী যেকোনো কোর্সে নাম লিখিয়ে ছাত্রত্ব থাকলেই তারা ভোটার এবং প্রার্থী হতে পারবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত কেবল নিয়মিত শিক্ষার্থীরা ভোটার ও প্রার্থী হতে পারবেন। যারা এমফিল এবং পিএইচডি করছেন ভোটাধিকার পাবেন কিন্তু প্রার্থী হতে পারবেন না। আর বিভিন্ন বিভাগে সান্ধ্যকালীন কোর্স বা অন্য কোনোভাবে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব টিকিয়ে রাখা ছাত্ররা না ভোটার হতে পারবেন, না প্রার্থী হতে পারবেন। এই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত ছাত্রের শর্ত পূরণ করতে না পারায় ছাত্রলীগ, ছাত্রদল এবং বাম সংগঠনের অনেক ছাত্রনেতাও ডাকসুর ভোটারও হতে পারছেন না, প্রার্থীও হতে পারছেন না। এ থেকে কর্তৃপক্ষের প্রকৃত ছাত্রদের নিয়েই একটি ডাকসু গঠনের সদিচ্ছা লক্ষ করা যায়। সাধারণ ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ আশা করে, কর্তৃপক্ষের এই সদিচ্ছা যেকোনো পরিস্থিতির কারণে যেন ক্ষুন্ন না হয়। সকল পরিস্থিতিতে অটুট থাকে। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে ডাকসুর শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষের সেই সদিচ্ছার প্রতিফলও লক্ষ করা যায়।
ডাকসুর নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সব ছাত্রসংগঠন, বিশেষ করে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বাম ছাত্রসংগঠন সবাই আগ্রহ প্রকাশ করছে। এখন পর্যন্ত তারা পৃথকভাবে নির্বাচন করবে বলে জানা গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত নীতি-আদর্শ এবং কর্মসূচিভিত্তিক কেউ কেউ ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও করতে পারে। এখন পর্যন্ত সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির যে পরিবেশ দেখা যাচ্ছে, সবাই প্রত্যাশা এবং প্রার্থনা করছে যেন এই পরিবেশ শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে এবং নির্বাচন শেষেও সম্প্রীতির সম্পর্ক বজায় রেখে ডাকসুকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে অতীতে যে রকম অবদান রেখেছে জাতীয় পর্যায়ে, এখনো যেন সেই ভূমিকা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন দেশের মানুষ এবং ছাত্রসমাজের আশা-আকাক্সক্ষাকে মাটি করে অন্য কোনো শক্তির স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে না পারে।
দেশের মানুষ স্বাধীনতার ৪৭ বছরে সবচেয়ে বেশি হতাশ হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একশ্রেণির ছাত্র এবং কতিপয় শিক্ষকের অনাকাক্সিক্ষত ও অনৈতিক কার্যক্রমে। এ অবস্থার জন্য অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্ব করার মতো নির্বাচিত ছাত্র নেতৃত্ব না থাকাকে দায়ী করেছেন। জাতীয় রাজনীতি এবং শিক্ষক সমাজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়াকেও অনেকে দায়ী করতে চান। কারণ যেটাই হোক, দেশের মানুষ ছাত্রসমাজের গৌরব কোনোভাবেই মলিন দেখতে চায় না। ২৮ বছর পর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজ তাদের গৌরবময় ঐতিহ্য যেন ফিরে পেতে পারে। দেশের মানুষ যেন নতুন করে বাংলার ছাত্রসমাজের ওপর ভরসা রাখতে পারে। তারা যেন সত্যি প্রমাণ করতে পারে ডাকসু বাংলাদেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট।
বাংলাদেশের মানুষের একান্ত প্রার্থনা ছাত্রসমাজ পুনরায় তাদের সেই গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হোক। আমরা আশা করি, ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষের সেই আশা পূরণ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here