প্রাণের যোগ অমর একুশে গ্রন্থমেলা

4

অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাংলাদেশে বইয়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী এ গ্রন্থমেলার আয়োজন করে। পাঠকের সমাগমে এই মেলা প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরে ওঠে। সারা দেশ থেকে লাখ লাখ পাঠক বই কিনতে বইমেলায় ভিড় করে। বইয়ের জন্য পাঠকের আকুতির পরিমাপও এই গ্রন্থমেলা। তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের দেশে এই গ্রন্থমেলা অন্য রকম আশা-জাগানিয়া। লিখেছেন-তুহিন ওয়াদুদ

অমর একুশে গ্রন্থমেলা বইসমুদ্রে পরিণত হয়। বিচিত্র বইয়ের সমাবেশ ঘটে। লেখক-পাঠক-বই এই তিনের সমন্বয়ে প্রাণের যোগ সাধিত হয়। পাঠকবিশেষে তার রুচির তারতম্য ঘটে। একেক পাঠকের আগ্রহ একেক ধরনের বইয়ের দিকে। কেউ হয়তো ইতিহাসনির্ভর বই পড়তে ভালোবাসে। কেউ হয়তো ভালোবাসে উপন্যাস, কেউ বা ছোটগল্প, কেউ হয়তো দর্শনভিত্তিক বইয়ের পাঠক। বিজ্ঞান-কল্পকাহিনীর দিকে কারো কারো ঝোঁক। কেউ হয়তো কবিতায় বেশি মনোযোগী। কেউ হয়তো একই সঙ্গে একাধিক রকম স্বাদের বই পড়তে ভালোবাসেন। কেউ বা লেখকবিশেষে কারো কারো বই বেশি পছন্দ করেন। পছন্দের লেখকের যত নতুন বই প্রকাশিত হবে, তার সবটাই তিনি পড়বেন। কেউ কেউ আছে, মননশীল প্রবন্ধের বই বেশি পছন্দ করে। বিচিত্র স্বাদের পাঠক আর তার বিচিত্র স্বাদের বইয়ের সবচেয়ে বড় সমাবেশ বইমেলা। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের প্রবাসী বাঙালিরাও ছুটে আসেন এই গ্রন্থমেলায়।
বইমেলায় সারি সারি দোকান : ছোট-বড় সব প্রকাশনাই চেষ্টা করে গ্রন্থমেলায় বইয়ের দোকান দিতে। বাংলা একাডেমির নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রও থাকে। লিটলম্যাগাজিন কর্নারেও অনেক স্টল থাকে। গ্রন্থমেলায় দোকান করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। বিজ্ঞানচেতনা পরিষদ বইমেলায় স্টল দিত। ২০০২ সালে বিজ্ঞানচেতনা পরিষদের বইয়ের দোকান এক মাসের প্রায় ২০ দিনই আমি দোকান করেছি। বাকি কদিন পারিনি। কারণ তত দিনে আমার শরীরে জন্ডিস ধরা পড়েছে। বইয়ের দোকান থেকে একবার হুমায়ূন আজাদ স্যারের ‘নারী’ বইয়ের একটি কপি চুরি হয়ে যায়। আজাদ স্যার আমাদের দোকানে মাঝেমধ্যে আসতেন। এক দিন স্যারকে তার বই চুরি হওয়ার কথা শোনালাম। তিনি খুব খুশি হলেন। তার বই পাঠক চুরি করে নিচ্ছে পড়ার জন্য। এটা তার কাছে খারাপ লাগেনি। বরং তার বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহকে তিনি সেদিন বড় করে দেখেছিলেন। বিজ্ঞানচেতনা পরিষদের দোকান আর ছোটকাগজ ‘চিহ্ন’-এর স্টল বইমেলাকে বড় আপন করে তুলত। গ্রন্থমেলাকে মনে হতো নিজেদের মেলা।
গ্রন্থমেলার পরিসর : আন্তর্জালিক (ইন্টারনেটের) যুগে কাগজে ছাপানো বইয়ের চাহিদা কমে যাবে এই আশঙ্কা অনেকের ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আশঙ্কা সত্য হয়ে ওঠেনি; বরং গ্রন্থমেলার কলেবর আর পাঠকের সংখ্যা এবং বই বিক্রির হার বলছে, আন্তর্জাতিক যুগ পাঠককে কাগজে ছাপানো বইবিমুখ করে তুলতে পারেনি। দেশে তথাকথিত সনদধারী শিক্ষিতের সঙ্গে পাঠকের সংখ্যা বিবেচনা করা চলে না। আমাদের দেশে যারা পাঠক নয়, তারা সারা দিন ফেসবুকে কিংবা অনলাইনে প্রচুর সময় কাটাতে (অনেকটাই নষ্ট) পারে; কিন্তু যারা প্রকৃত পাঠক, তারা কখনোই বইবিমুখ নয়।
গ্রন্থমেলায় সবাই যেতে পারে না : ইচ্ছা থাকলেও অসংখ্য পাঠক ঢাকার এই অমর একুশে গ্রন্থমেলায় যেতে পারে না। অনেকেই আছে, কাজের ব্যস্ততায় যেতে পারে না। এ ধরনের পাঠক এক বছর যেতে না পারলেও অন্য বছর ঠিকই যায়; কিন্তু এমন অনেক পাঠক আছেন, যিনি পাঠক হিসেবে অনেক বড় পাঠক। বোদ্ধা পাঠক। আর্থিক সামর্থ্য না থাকার কারণেই তারা যেতে পারেন না। কয়েক দিন আগে রংপুরের টাউনহল চত্বরে একটি ছোট বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রফিকুল ইসলাম দুলাল নামের একজন বোদ্ধা পাঠক বলছিলেন, ‘সামর্থ্য না থাকার কারণে আমি কোনো দিন ঢাকার একুশে গ্রন্থমেলায় যেতে পারিনি। তাই ছোট ছোট বইমেলায় অন্তত আমি নিয়মিত যাই। ওই বইমেলার কিছুটা চাহিদা পূরণ হয় এতে।’
ছোট ছোট বইমেলা ও অমর একুশে গ্রন্থমেলা : সারা দেশে ব্যক্তি-সংগঠন-প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অসংখ্য ছোট ছোট বইমেলার আয়োজন করা হয়। এসব মেলা পাঠকের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলেও অনেক পাঠকের সমাগম এসব মেলায় হয়ে থাকে। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াও কর্মকা-ের কারণে অনেক কাজ ব্যাহত হয়েছিল। তখন সরকারি কিছু টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সেই টাকা দিয়ে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে বইমেলার আয়োজন করেছিল। রংপুর বিভাগের বইমেলায় দেখেছি অসংখ্য পাঠকের ভিড়। প্রতিদিন হাজার হাজার পাঠকের ভিড়ে মুখরিত ছিল মেলা। যেসব প্রকাশনা এসেছিল বই নিয়ে, তারা সবাই আশাতীত বই বিক্রি করেছে।
স্মৃতিতে গ্রন্থমেলা : ছোটবেলা থেকেই আমার নিজের কাছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৯৩-৯৪ সালের কথা। তখনো বঙ্গবন্ধু সেতু হয়নি। কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার মানে হচ্ছে, এক দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া। ওই রকম সময়ে শুধু গ্রন্থমেলাকে উদ্দেশ করে আমার জীবনে প্রথম ঢাকা যওয়া। আশৈশব বই পড়ার প্রতি অদম্য আগ্রহ ছিল। আমার এক চাচার নাম মণি। ছোটবেলায় বই পড়া নিয়ে তার সঙ্গে দিন-রাত আলোচনা হতো। তিনি বইমেলা ঘুরে এসে গল্প করতেন। গ্রন্থমেলায় না গেলে গ্রন্থমেলার ভালো লাগার অনুভূতি ব্যক্ত করা যাবে না, এমনটিই তিনি বলতেন। আমাদের বাড়িতে তখন ইত্তেফাক পত্রিকা নেওয়া হতো।
পত্রিকায় গ্রন্থমেলার খবর পড়তাম। ভাবতামগ্রন্থমেলাটা যদি কাছেই কোথাও হতো জীবনে প্রথমবার কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে দুই দিন থাকলাম। এই দুই দিনই বইমেলায় ঘুরলাম। চাচার মুখে গল্প শুনেছিলাম, সেখানে লেখকদের দেখা যায়। কথাও বলার সুযোগ আছে। আমার কাছে সেসব দিনের ওই আবেগ ছিল উছলে পড়া। গ্রন্থমেলায় হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন স্টলে স্টলে বসে ভক্ত পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন। সীমাহীন আবেগ নিয়ে আমি লেখকদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জড়তাজনিত কারণে তাদের কাছে যাইনি, কোনো অটোগ্রাফ নিইনি। কোনো কথাও বলিনি। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলাম। এখনো যখন ইমদাদুল হক, আনিসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ কিংবা জাফর ইকবালকে ভক্ত পাঠকবেষ্টিত দেখি, আমার সেই মেলার কথাই মনে পড়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here