বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের গোড়ার কথা

2

ড. মোহাম্মদ আলী খান

বাংলাসাহিত্যের প্রথম উপন্যাস প্যারীচাঁদ মিত্রের (টেকচাঁদ ঠাকুর) আলালের ঘরের দুলাল, প্রকাশকাল ১৮৫৭ খ্রি.। আর প্রথম সার্থক উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী, প্রকাশকাল ১৮৬৫ খ্রি.। প্রথম সার্থক বাংলা নাটক মাইকেল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা, প্রকাশকাল ১৮৫৯ খ্রি.। তবে ভ্রমণ কাহিনী কোনটি প্রথম, সেটি নিয়ে আলোচনা হয় না। অথচ ভ্রমণ কাহিনীর তালিকা যেমন দীর্ঘ, তেমনি গুণে-মানে বাংলা ভ্রমণ সাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ভ্রমণ কাহিনীর অন্যতম পুরোধা শ্রী অন্নদাশংকর রায় চমৎকার বলেছেন, সম্প্রতি প্রবন্ধ লেখকদের এক সম্মেলনে ভ্রমণ কাহিনীকারদেরও আসন দেওয়া হয়েছিল। তখন এই প্রশ্নটা আমার মনে ওঠে, ভ্রমণ কাহিনী কি প্রবন্ধের ঘরের পিসি, না কথাসাহিত্যের ঘরের মাসি? না একাধারে দুই? সময়ের বাতিঘর সাক্ষ্য দেয় যে, উপন্যাস, গল্প বা নাটকের সার্থক আত্মপ্রকাশের আগেই বাংলা ভ্রমণ কাহিনী পাঠককুলকে স্পর্শ করেছে।
ভ্রমণ সাহিত্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বহিরাঙ্গন সাহিত্য, প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির রূপায়ণ, ভ্রমণবিষয়ক স্মৃতিকথা এবং একটি বড় অংশজুড়ে আছে ভ্রমণ গাইড। মানবসভ্যতার বহমান পথ পরিক্রমায় ভ্রমণসাহিত্য প্রাচীনত্বের দাবি করতেই পারে। দ্বিতীয় শতাব্দীর গ্রিক ভূগোলবিদ চধঁংধহরধং-এর কথা স্মরণ করা যায়, যিনি লিখেছেন ভ্রমণবিষয়ক স্মৃতিকথা দউবংপৎরঢ়ঃরড়হ ড়ভ এৎববপব’। আধুনিককালে যার বই বহুল আলোচিত, তা হলো- ঔধসবং ইধংবিষষ-এর দঔড়ঁৎহধষ ড়ভ ধ ঞড়ঁৎ রহ ঃযব ঐবনৎরফবং’, প্রকাশকাল ১৭৮৬ খ্রি.। কিন্তু তারও আগের অনেক ভ্রমণ কাহিনী সময়কে জয় করে আজও কথা বলে, যেমন- ওয়েলসের গেরাল্ড (এবৎধষফ)-এর বই দঔড়ঁৎহবু ঞযৎড়ঁময ডধষবং’ (প্রকাশকাল ১১৯১ খ্রি.), দউবংপৎরঢ়ঃরড়হ ড়ভ ডধষবং’ (প্রকাশকাল ১১৯৪ খ্রি.) কিংবা ইবনে জুবায়ের (১১৪৫-১২১৭ খ্রি.) এবং ইবনে বতুতার (১৩০৪-১৩৬৯ খ্রি.) অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনী দজরযষধ’ (ঞযব ঞৎধাবষং)। ইবনে বতুতার সফরনামা আরবিতে লেখা হলেও বাংলা অনুবাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভ্রমণ গাইডও (ঞৎধাবষ এঁরফব) বহু আগে থেকেই ভ্রমণপিপাসুদের তৃষ্ণা মিটিয়ে চলেছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য থমাস ওয়েস্টের বই দখধশব উরংঃৎরপঃ’, প্রকাশকাল ১৭৭৮ খ্রি.। ভ্রমণ গাইডের পাশাপাশি ভ্রমণবিষয়ক জার্নাল (ঞৎধাবষ ঔড়ঁৎহধষ)-এর বহু উদাহরণ রয়েছে, যা সর্বজন প্রশংসিত।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে একগুচ্ছ বাংলা ভ্রমণ কাহিনীর উদাহরণ পাওয়া যায়, সেসব বই আমাদের বিস্মিত করে, একই সঙ্গে করে আপ্লুত, মাতৃভাষা যাদের বাংলা, তারা এ জন্য গর্ব করতে পারেন অনায়াসে। এক্ষেত্রে প্রথম নাম আসে বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৮৭-১৯৪৯ খ্রি.)। তিনি ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পিতামহ। বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় ৫৩ বছর বয়সে রচনা করেন অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনী ‘কালনা থেকে রংপুর’, ভ্রমণকাল ১৫ কার্তিক ১২৪৭ থেকে ১৪ অগ্রহায়ণ ১২৪৭ বঙ্গাব্দ (১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ)। আজ থেকে অর্থাৎ ১৪২৫-১২৪৭ বঙ্গাব্দ=১৭৮ বছর আগে এই ভ্রমণ সম্পাদিত হয় এবং মোট সাতাশ দিনে নৌপথে নৌকাযোগে তিনি কালনা থেকে রংপুর গিয়েছিলেন। তিনি ভ্রমণকাহিনীটির নামকরণ করেননি, রোজনামচার ধাঁচে লেখা। তখন বাংলা গদ্যভাষা অর্থাৎ সাহিত্যিক গদ্যভাষা নির্মিত হয়নি, বরং তা ছিল প্রাকৃত ঘেঁষা, ছেদ ও যতির ব্যবহার নেই। গদ্যে বিরামচিহ্ন প্রয়োগের রীতিও সে সময় শুরু হয়নি। বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় তার ভ্রমণ কাহিনীর শুরুর দিকে লিখেছেন-
‘…১২৪৭ সাল তারিখ ১৫ কার্ত্তিক মোং কালনার গঞ্জ হইতে শ্রীতিলকচন্দ্র কু-ুর তহবিলের শ্রীবেঙ্গু মাজির নৌকায় আরোহণ হইয়া ঐ দিবষ আন্দাজ দিবা এক প্রহরের সময় নৌকা খুলিয়া রাত্র আন্দাজ ছয় দ-ের সময় মোং শ্রীপাট নবদ্বিপের পূর্ব আন্দাজ দুই ক্রোষ পথ দূরে নৌকা লাগান হইলÑ তথায় পাক করিয়া আহারাদি করিয়া রাত্রে থাকা গেল ইতি…।’
বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে ধ্রুপদী সংযোজন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৪০-১৮৮৯) বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনী ‘পালামৌ’। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় মোট ছয় কিস্তিতে এটি প্রকাশিত হয় ১২৮৭, ১২৮৮ ও ১২৮৯ বঙ্গাব্দে। প্রকাশকালে লেখক প্রাঃ নাঃ বঃ ছদ্মনাম ব্যবহার করেন।
সুকুমার সেন লিখেছেনÑ ‘ছোটনাগপুরের আদিম গিরি-দরী-অরণ্যানী এবং আরণ্যক পশু-মানব লেখকের সমবেদনা রসধারার অভিষেকে পালামৌ প্রবন্ধগুলিতে অভিনব মাধুর্যম-িত হইয়া জীবন লাভ করিয়াছে।’ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ যেমন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত, তেমনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড় ভাই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’কে বাংলা গদ্যসাহিত্যে প্রথম সার্থক ভ্রমণ কাহিনী হিসেবে গণ্য করা যায়।
উনিশ শতকে বহুবিধ ভ্রমণ কাহিনীতে স্থান পেয়েছে তীর্থভ্রমণ। এসব গ্রন্থকে বিশুদ্ধ ভ্রমণসাহিত্য হিসেবে গণ্য করার বিষয়ে সমালোচকদের অনীহা থাকলেও, বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের বিকাশে তার অবদান অনস্বীকার্য। তীর্থভ্রমণ প্রধান গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ যদুনাথ সর্বাধিকারীর বই তীর্থভ্রমণ বা তীর্থভ্রমণের রোজনামচা, বইটির রচনাকাল ১২৫৯-১২৬৪ বঙ্গাব্দ (১৮৫২-১৮৫৭ খ্রি.) আর বইটি প্রকাশিত হয় ১৯১৫ খ্রি.। বিদ্যাবিনোদ লিখেছেন ‘উত্তরখ- পরিক্রমা’ যার প্রকাশকাল ১৯১২ খ্রি.। এ ধরনের তীর্থভ্রমণ কাহিনীর মধ্যে আরও রয়েছে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যয়ের শ্রীশ্রীগয়াতীর্থ বিস্তার, ঈশ্বরচন্দ্র বাগচীর তীর্থমুকুর, দীনবন্ধু মিত্রের সুরধুনী কাব্য (১৮৭১ খ্রি.) ইত্যাদি। উল্লিখিত তীর্থভ্রমণ কাহিনী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবই ভারতকেন্দ্রিক। মুসলমানদের কাছে সেরা তীর্থভ্রমণ মক্কা বা মদিনা অর্থাৎ ওমরাহ ও হজ পালন। এই হজ ভ্রমণের কাহিনী বাংলায় প্রথম কে লিখেছেন সে তথ্য সহজলভ্য নয়। বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ ১৯২০ খ্রি. হজ শেষে ১৯২১ খ্রি. প্রকাশ করেন তার বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনী ‘হেজাজ ভ্রমণ’। কাশ্মির কুসুম একটি অসাধারণ ভ্রমণবৃত্তান্ত, লিখেছেন রাজেন্দ্র মোহন বসু, প্রকাশকাল ১৮৭৫ খ্রি.। ১৯০৩ খ্রি. দুর্গাচরণ রক্ষিতের বই সচিত্র ভারত প্রদক্ষিণ ব্যতিক্রমধর্মী, সেখানে যেমন রয়েছে ভ্রমণরস, তেমনি পাশাপাশি ছিল ১৮টি ছবি যা সে সময়ের জন্য দুর্লভ সংযোজন। শিবনাথ শাস্ত্রীর ইংলন্ডের ডায়েরি পুরোপুরি ভ্রমণসাহিত্য গুণসম্পন্ন না হলেও ভ্রমণের রস-আস্বাদন করা যায় সহজেই তার ডায়েরির পাতা থেকে। ১৫ এপ্রিল ১৮৮৮ খ্রি. কলকাতা থেকে তার বিলাত যাত্রা এবং ছয় মাস পর ফিরে আসেন স্বদেশে, এ সময়ে লিখেছেন দিনলিপি। স্বামী বিবেকানন্দের (নরেন্দ্রনাথ) পরিব্রাজক ও তার অনুজ মহেন্দ্রনাথের বদ্রীনারায়ণের পথে বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে স্মরণীয় সংযোজন। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রমণবৃত্তান্ত ছিল অসাধারণ যা ১৮৯৮ খ্রি. আত্মজীবনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
পুরুষশাসিত বাঙালি সমাজে নারীদের ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া ভ্রমণ করা সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু সেই সেøাতের উল্টোপথে সাঁতরিয়ে কয়েকজন স্বনামধন্য নারী বিদেশ সফর করেছেন এবং ভ্রমণ কাহিনী লিখে বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছেন। শতবর্ষের ব্যবধানে মৃত ছাপার অক্ষরের ভিড়ে তারা চাপা পড়ে যাননি। এই যাত্রায় যার নাম প্রথমে আসে, তিনি হলেন কৃষ্ণভাবিনী দাস। তিনি ইংল্যান্ডে যান ১৮৮২ খ্রি. এবং আট বছর সেখানে ছিলেন। সেই সময়ের কাহিনী নিয়ে লেখেন ইংলন্ডে বঙ্গমহিলা। বইটি জেএন ব্যানার্জি অ্যান্ড সন্স, ব্যানার্জি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ খ্রি.। তথাপি এই তথ্য আকর্ষণীয় যে, বইয়ের কোথাও লেখিকার নাম ছিল না। যাই হোক এটা সত্য যে, এটি বাংলাসাহিত্যে মহিলা লিখিত প্রথম ভ্রমণ কাহিনী। এই সঙ্গে আর একটি নাম ইতিহাসের গৌরবময় পাতায় স্থান করে নিয়েছে, তিনি হলেন প্রসন্নময়ী দেবী। তার ভ্রমণ কাহিনীর নাম আর্য্যাবর্ত্তে বঙ্গমহিলা, প্রকাশকাল ১৮৮৮ খ্রি.। উল্লেখ্য, কৃষ্ণভাবিনী দাসের বই যেখানে ছিল বিদেশ ভ্রমণ কাহিনী, সেখানে প্রসন্নময়ীর বইটি ছিল ভারত ভ্রমণ কাহিনী।
বিলাত ও ভারতের বাইরেও যেকোনো বঙ্গনারীর পদচারণা হতে পারে এবং তার ভিত্তিতে যে ভ্রমণ কাহিনী রচিত হতে পারে, তার প্রমাণ হরিপ্রভা তাকেদার বিখ্যাত বই বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা। গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ১৯১৫ খ্রি.। ১৯০৭ খ্রি. জাপানি যুবক তাকেদার সাথে হরিপ্রভার বিয়ে হয় ঢাকায় এবং তিনি স্বামীর সাথে জাপান যান ১৯১২ খ্রি.। সেই জাপানে বসবাসের অভিজ্ঞতা সংবলিত অনবদ্য গ্রন্থ বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা। সেই সঙ্গে আর একটি নাম না করলেই নয়, তিনি হলেন জগৎমোহনী চৌধুরী, যিনি কোনো পুরুষসঙ্গী ছাড়াই একাকী ১৮৯৪ খ্রি. লন্ডনে গিয়েছিলেন, তাঁর ভ্রমণ কাহিনীর নাম ইংলন্ডে সাত মাস, প্রকাশকাল ১৯০২ খ্রি.। আর একটি ভ্রমণ কাহিনী, ১৯১৫ খ্রি. প্রকাশিত, শ্রীমতী বিমলা দাশগুপ্তার নরওয়ে ভ্রমণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভ্রমণ-সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃত। ১৯১৬ খ্রি. প্রকাশিত হয় শরৎরেণু দেবীর পারস্যে বঙ্গ রমণী। একই বছরে অবলা বসুর জাপান ভ্রমণ মুকুল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, ১৩০২-১৩৩২ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত তিনি মুকুল ও প্রবাসী পত্রিকায় অনেক ভ্রমণ কাহিনী লেখেন। এ সবই ভ্রমণসাহিত্যে বঙ্গনারীদের স্মরণীয় অবদান।
ঘরকুনো বাঙালি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে পৃথিবীর সবকটি মহাদেশে, সে প্রতিনিয়ত পাড়ি দিচ্ছে কত দেশ-মহাদেশ-অরণ্য-পর্বত-সাগর-মহাসাগর-নদী-উপত্যকা। লেখা হচ্ছে একের পর এক ভ্রমণ কাহিনী ও তা প্রকাশিত হচ্ছে, বাংলা ভ্রমণ সাহিত্য হচ্ছে সমৃদ্ধ ও সমাদৃত; আর এই প্রাণন্ত, গীতিময় ও মনোলোভা আয়োজনের প্রাতঃস্মরণীয় হলো বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের গোড়ার কথা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here