পাকস্থলিতে ইয়াবা নিয়ে শিশুরা ঢুকছে ঢাকায়

টাকার লোভে অনেক শিশু জড়িয়ে পড়েছে এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে

3

কক্সবাজার : দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে চার শতাধিক মাদক কারবারি নিহত হওয়ার পরও থেমে নেই ইয়াবা পাচার। এখন টেকনাফ থেকে ঢাকায় ইয়াবার চালান আনা হচ্ছে শিশুদের পেটে (পাকস্থলী) করে। টাকার লোভে অনেক শিশু জড়িয়ে পড়েছে এ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। প্রতি চালানের জন্য শিশুরা পাচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্যই জানিয়েছে পেটে ইয়াবা বহনকারী শিশু জসিম ও শাজহান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের একটি টিম গত ২ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর শাহ আলী ও মিরপুর এলাকা থেকে ওই দুই শিশুসহ আটজনকে গ্রেফতার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা। এর মধ্যে দুই শিশুর পেট থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৫ হাজার পিস ইয়াবা।

গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে- ইয়াবা কারবারি লোকমান হোসেন, মো. রঞ্জু, শাহিদা বেগম, ইউনুছ মিয়া, মোছা. শাহনাজ বেগম, মারিয়া আক্তার রিনা এবং শিশু জসিম ও শাহাজাহান। গোয়েন্দা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লোকমানসহ ছয়জনকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। শিশু হওয়ায় আদালত জসিম ও শাজহানকে সংশোধনাগারে পাঠিয়েছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, জসিম ও শাজাহানের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে। আটকের পর তারা অকপটে স্বীকার করেছে তারা পেটে ইয়াবা বহন করে ঢাকায় নিয়ে আসে। ঢাকায় আনার পর তাদের কাছ থেকে ইয়াবার চালান গ্রহণ করে লোকমান হোসেন ও রঞ্জু। চালান পৌঁছে দেওয়ার পর তাদের চুক্তিমতো টাকা দেওয়া হয়েছে। যার পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ইতিপূর্বে তারা চারবার পেটে করে ইয়াবা বহন করে ঢাকায় পৌঁছে দিয়েছে।

ইয়াবা বহনের ব্যাপারে তারা জানিয়েছে, ৫০ থেকে ৬০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট একসাথে ক্যাপসুল বানানো হয় (যারা ইয়াবা দেয়, তারাই এ কাজটি করে দেয়)। এরপর ৫০-৬০টি ক্যাপসুল খেয়ে পেটে করে টেকনাফ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। কখনো বাসে আবার কখনো ট্রেনে করে ঢাকায় আসে। তবে ইয়াবা ক্যাপসুল পেটে নেয়ার পর তারা অন্য কোনো খাবার এমনকি এক ফোঁটা পানিও খেতে পারে না। ঢাকায় এসে নির্ধারিত বাসায় গিয়ে তারা প্রচুর পরিমাণে পানি পান করে। আর এরপরই ইয়াবার ক্যাপসুলগুলো পায়ুপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। পরে সেগুলো ধোয়ার কাজটি তাদেরই করতে হয়। ইয়াবার চালান বুঝে পাওয়ার পরই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, শিশুরা জানিয়েছে তাদের মতো অনেক শিশুই টেকনাফ থেকে পেটে করে ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে আসে। তারা একা কখনো ঢাকায় আসে না। সঙ্গে থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন।

এ ব্যাপারে রাজধানীর তেজগাঁও কেন্দ্রীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালটেন্ট ডা. সৈয়দ ইমামুন হোসেন বলেন, পাকস্থলীতে ইয়াবা বহনে নানা ঝুঁকি রয়েছে। ইয়াবাগুলো এভাবে বহন করা হয়, যাতে পেটের ভেতর হজম হয় না। ইনট্যাক মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ফয়েল (যা দিয়ে ইয়াবা মোড়ানো থাকে) যদি লিক হয়ে যায়, তাহলে ড্রাগটা শিশুর শরীরে চলে যাবে। এর ফলে ড্রাগের ওভার ডোজে তার মৃত্যু হবে। দেখা গেল, ফয়েল লিকও করল না, আবার মলদ্বার দিয়ে বেরও হলো না, সে ক্ষেত্রেও মৃত্যু ঝুঁকি রয়ে যায়।

আত্মসমর্পণ নিয়ে সমন্বয়হীনতা

দেশব্যাপী মাদক নির্মূলে, বিশেষ করে ইয়াবার বিস্তাররোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। মারণনেশা এই বড়িটি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ সীমান্ত হয়ে। তাই সরকারের বিশেষ টার্গেটে রয়েছে এ জেলার মাদককারবারিরা। তাদের বিরুদ্ধে চলছে সাঁড়াশি অভিযান। ইতোমধ্যে সরকারের তরফে মাদককারবারিদের বার্তা দেওয়া হয়েছে আত্মসমর্পণ করতে হবে, নয়তো বরণ করতে হবে ভয়াল পরিণতি। এরই ধারাবাহিকতায় এক দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কথিত ক্রসফায়ারে এ হীনকান্ডে সঙ্গে জড়িতদের মৃত্যুর তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। অন্য দিকে প্রাণভয়ে অনেক মাদককারবারি ইতোমধ্যে পুলিশি হেফাজতে চলে এসেছে।

আগামী ১৬ ফেব্রæয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজন করা হবে কক্সবাজারের ইয়াবাকারবারিদের আত্মসমর্পণের। পুলিশ হেফাজতে থাকা কারবারিরা আত্মসমর্পণের এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলোর পথে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। সেই দিনক্ষণ ক্রমেই এগিয়ে এলেও কিছু বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। আত্মসমর্পণকারীদের ক্ষেত্রে ইয়াবার টাকায় গড়ে তোলা তাদের অবৈধ সম্পদ এবং ইতিপূর্বে হওয়া মামলাগুলোর কী হবে এ বিষয়ে এ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আত্মসমর্পণের পুরো প্রক্রিয়াটি পুলিশ প্রশাসন দেখভাল করছে। তবে এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী অন্যান্য সংস্থা অনেকটাই অন্ধকারে রয়ে গেছে বলে জানা গেছে। এসব সংস্থার কর্মকর্তারা ইয়াবাকারবারিদের আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ায় যথাযথ সমন্বয় হচ্ছে না বলে মনে করছেন।

জানা গেছে, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে জোরদার অভিযান পরিচালনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট কমিটি রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে রয়েছে একটি কোর কমিটি। এ ছাড়া টেকনাফের ইয়াবাকারবার বন্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) ড. এ এফ এম মাসুম রাব্বানীর নেতৃত্বে কাজ করছে একটি টাস্কফোর্স। এসব কমিটিতে সব সংস্থার সদস্যদেরই যুক্ত রাখা হয়েছে; কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো কমিটি আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার অনেক কিছু সম্পর্কেই জানে না। কারণ পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত টেকনাফের ১৪০ ইয়াবাকারবারি পুলিশ হেফাজতে এসেছে আত্মসমর্পণের জন্য। আগামী ১৬ ফেব্রæয়ারি এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে। এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় অন্যতম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন ক্ষমতাসীন দলের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি। তার ৩ ভাইসহ নিকট আত্মীয়দের বেশ কয়েকজনও আত্মসমর্পণে প্রস্তুত; তারা পুলিশ হেফাজতে আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কক্সবাজারের প্রতিনিধিরা যেসব প্রতিবেদন তাদের সদর দপ্তরে ইতোমধ্যে পাঠিয়েছেন, সেসব প্রতিবেদনে আসন্ন আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই তুলে ধরা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here