অসমাপ্ত যুদ্ধ:শেষ কবে?

সেই সব নানা রঙের দিনগুলি (পর্ব-৩২)

9

শামসুল আরেফিন খান

বিজ্ঞানগুরু আইনস্টাইন একসময় বলেছিলেন,“তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানুষ কী দিয়ে লড়বে তা আমি জানিনা। কিন্তু আমি একথা জানি যে মানুষের হাতে চতুর্থ মহাযুদ্ধ লড়ার জন্য মাটির ঢেলা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না”। তিনি অনেক বড় কথা বলেছেন। কিন্তু কথাটা খুব সহজভাবে বলেছেন। সহজ ভাষায় বলেছেন। তার সেই কথা বুঝতে পন্ডিত-মূর্খ কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথানা। তবুও আমাদের একটামাত্র পৃথিবীতে যুদ্ধের পাঁয়তারা বন্ধ হয়নি।
২০১০ সালে আমি ওয়াশিংটন ডিসিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন হোয়াইট হাউজ দেখার খায়েশটাও পূর্ণ হয়েছিল।ঐ ভবনের বাইরের রঙ ধবধবে সাদা। সেই সাদা রঙ দিয়েই ভিতরের সব কালোকে ঢেকে দেয়া হযেছে। সাদা ভবনটার উল্টোদিকে ফুটপাথ পেরিয়ে গেলাম আবরাহাম লিঙ্কনের বিশাল কালোমূর্তিটা ভালো করে দেখার জন্যে। ফুটপাতের গা ঘেঁষে সেখানে একটা অনতি বৃহৎ তাঁবুর ভিতর দুজন মানুষ বসেছিলেন একটা লম্বা খাতা নিয়ে। বাইরে বিরাট লাইন। আমাদের দেশের রেশনকার্ড বা ভোটের লাইনের মতই ভীড়। প্রত্যেকে নীরবে যেয়ে সেই খাতায় স্বাক্ষর করে উল্টো দিক দিয়ে নিষ্ক্রান্ত হচ্ছেন। তাম্বুর বাইরে একটামাত্র ফেস্টুন। তাতে লেখা,“আমরা শান্তির জন্যে যুদ্ধ করছি”। যুদ্ধে মানুষ মরছে। যুদ্ধ একটা ভয়াবহ অপরাধ। কিন্তু মৌনতা তার চেয়েও বড় অপরাধ। আমরা প্রতিবাদ করছি যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং মৌনতার বিরুদ্ধে। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। মৌন থাকার মানে যুদ্ধকে সমর্থন করা। আমরা শান্তি চাই।
তখন ইরাক যুদ্ধের ২য় বর্ষ চলছিল। ৯/১১ সঙ্কটের পর আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারই ধারাবাহিকতায় সাদ্দাম হোসেনের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের আমূল উৎপাটন সম্পন্ন হয়। মার্কিন নেতৃত্বে মিত্রশক্তি সেই আগ্রাসন পরিচালনা করে। ১৬ সেপ্টেম্বার ২০০১ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয় প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের নির্দেশনায়। কয়েক দিন পরে তিনি কংগ্রেসে দেয়া ভাষণে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আমাদের শত্রুরা উগ্রপন্থী। তাদের রয়েছে একটা বড় নেটওয়ার্ক। তাদের সমর্থক রাষ্ট্রগুলোও আমাদের শত্রু।
সমালোচকদের বলতে শোনা যায় যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে ভীতি ও নিপীড়নের তত্ত্বে ঋৃদ্ধ। এ যুদ্ধে শত্রু বাড়বে। সংঘাত বাড়বে। সন্ত্রাস থামবে না। তা বরং আরও বেড়ে যাবে। ব্যক্তি মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আরও কমে যাবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও নাগরিক অধিকার হরণের প্রবণতা বাড়বে। যুদ্ধ কোন সমাধান দেবে না। তাই সন্ত্রাসের মূল কারণ খুঁজে পেতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচনে মনোযোগী হয়ে লক্ষ্য হাসিলের জন্য ব্যাপক প্রয়াস রাখতে হবে।
এ কথায় কোন ভুল নেই যে, দারিদ্য কমলে বৈষম্য হ্র্রাস পাবে। শ্রেণী শোষণ কমবে। কেউ পাবে কেউ পাবেনা, কেউ খাবে কেউ খাবেনা; “তোমরা থাকিবে তেতালার পরে আমরা থাকিব নিচে, সে ভরসা আজ মিছে”- ধরনের পরিস্থিতিতে বঞ্চনার কারণে ক্ষোভ ও মর্মবেদনা জমা হয়। তাতে বুকের মধ্যে অহরহ যে রক্তক্ষরণ ঘটায়, দারিদ্র্য হ্রাস পেলে তাও কমে যাবে। তাতেই হয়ত সন্ত্রাসও কমবে। মশা মারতে শুধু শুধু কামান না দেগে বরং পচা ডোবা থেকে কচুরিপানা সাফ করলে অনেক বেশি উপকার মেলে। এটাই সার্বজনীন অভিজ্ঞতা।
তাই আমার মনে হল, যাঁরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন তাঁরা হয়ত আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পতঙ্গের দংশনে সেকালে আলেকজান্ডারের মত বিশ্বজয়ী মহাবীরের জীবন লীলা সাঙ্গ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। একটা অতি ক্ষুদ্র দেশলাইর কাঠি বারুদের গুদামে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মহা সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। শুকনো পাতায় সূর্যের খরতাপের সঙ্গমে সর্বগ্রাসী দাবানল ঘটা সম্ভব। তেমনি হিংসা বিদ্বেষ সহিংসতায় উৎপন্ন স্ফুলিঙ্গ থেকেও যুদ্ধ ও মহাযুদ্ধ উৎসারিত হওয়াও অসম্ভব। মানুষ এক সময় পাথরের সাথে পাথর ঘষে আগুন উৎপন্ন করেছিল। এখনও সেই মানুষই পায়ে পাড়া দিয়ে প্রলয় সৃষ্টি করে চলেছে।। পাকিস্তানের খ্রিস্টান নারী আছিয়া বিবি কৃষিক্ষেতে কাজ করার সময় তৃষ্ণার জলের জন্যে একজন মুসলমানের পানিপাত্রের দিকে হাত বাড়ালে যে বিপত্তি ঘটে গেলো তাতেই আটবছর কাটাতে হল তাকে ফাঁসির আসামির অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সেই অসহায় নারীর বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই বিচার হয়েছিল ব্লাসফেমী আইনে। অভিয়োগ ছিল তিনি ইসলামের নবীর নামে কটূক্তি করেছেন। উচ্চ আদালতে সে অভিযোগ টেকেনি। সুপ্রিম কোর্ট তাকে চূড়ান্ত বিবেচনায় মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু মোল্লা-পুরুত শ্রেণীর উগ্র নিরেট ধর্মান্ধরা তাকে রেহাই দিতে নারাজ। কারাগার থেকে মুক্তি দেয়ার পরেও ‘খাটি মুসলমান অর্থাৎ প্রকৃত ইসলাম অনুসারীদের’ গজব থেকে বাঁচাবার জন্যে তাকে গোপন আশ্রয়ে লুকিয়ে রেখে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। তার দুটি মেয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে পরিত্রাণ পেয়েছে। কিন্তু সেই উৎপীড়িত মায়ের নিষ্ক্রমন বাধামুক্ত করা গেলো কিনা সেকথা এই লেখার সমাপ্তি টানা পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি। সংবাদসূত্র বিবিসিও কিছু জানায়নি।
কদিন আগে মিশরে কায়রোর রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে এক খ্রিস্টান রমণী গণধর্ষণের শিকার হলেন তার সমাজে অনুমোদিত পোষাক পরিচ্ছদ পরিধান করে রাজপথে হাঁটার কারণে। হোসনি মুবারকের পতনের পর উগ্রপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মোরসি ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না হতেই সেখানকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী এ ধরনের নিপীড়নের শিকার হন।
আফগানিস্তানের তালেবানী তান্ডবে সে দেশের অগণিত সংখ্যালঘু হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান জৈন বৌদ্ধ শিখ জনগণ প্রাণ হাতে নিয়ে মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশে ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর মুসলিম ব্রাদারহুডের দোসর বিএনপি- জামায়াত সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠত হল। আর ঠিক সেদিনই ১২ বছরের মেয়ে পূজা শীল ১২/১৪ জন মরদে-মোমীনের গণধর্ষণের শিকার হ’ল নিজ গৃহে। মাকে খুঁটিতে বেঁধে রেখে শিশু মেয়েটাকে শকুনের মত খুবলে খাচ্ছিল পাষন্ডরা। অসহায় মা নিরুপায় হয়ে তখন কন্ঠের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলছিলেন, “বাবারা তোমরা একজন একজন করে যাও আমার মেয়ের কাছে। ও খুবই ছোট একটা মেয়ে”। অমন একটা মর্মন্তুদ দৃশ্যের অবতারণা ১৯৭১ ছাড়া আর কখনও হয়েছে বলে আমি শুনিনি। চট্রগ্রামের বাঁশখালির ট্রাজেডিও যেন হার মেনেছে নিষ্ঠুরতার দিক থেকে। সেখানে এক রাতে ১৪ নারীপুরুষ শিশুকে তাদের নিজ বাড়িতে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনাও একাত্তর সালকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
১২ মে ২০০৩ জেনেভায় জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপে পঠিত পেপারে মানবাধিকার কর্মী সালাম আজাদ বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সামনে এখন খোলা রয়েছে মাত্র তিনটি পথ: ১.মুসলমান হওয়া, যা তাদের জন্য আত্মহত্যার শামিল। ২.দেশত্যাগ করা এবং ৩.বাইরের সাহায্যে সমস্যার সমাধান খোঁজা। শিতাংশু গুহ তার পেপারে বলেন, “বাংলাদেশে যা হচ্ছে তা স্লো জেনোসাইড ও এথনিক ক্লিনজিং। সংখালঘু জনসংখ্যা মাত্র কয়েক বছওে ৩০ শতাংশ থেকে দশ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়া জনসংখ্যা সম্মিলিতভাবে বাহরাইন, অইসল্যান্ডজর্দান লেবানন লিবিয়া নামিবিয়া ওমান পানামা ও কোস্টারিকার জনসংখ্যার সমান”।
২০০৩ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল সুইজার ল্যান্ডে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের আর এক সম্মেলনে “নারীর প্রতি সহিংসতা , বাংলাদেশ প্রেক্ষিত “ শীর্ষক প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কর্মী ড. রাধিকা কুমার স্বামী ০৩ অক্টেবর, ২০০৩ রাতে পটুয়াখালি জেলার বাউফল থানার কাছিপাড়া গ্রামে সংখ্যালঘু মহিলার উপর নির্যাতন এবং ০৯ অক্টোবর ২০০১, মাগুরা জেলার শ্রৗপুর উপজেলার নহাটা গ্রামের ৩ হিন্দু বালিকা অপহরণ ও গণধর্ষণের বিবরণ তুলে ধরেন। বিশেষ ঘটনা হিসাবে নাম উল্লেখ করে (১) অর্চনা (২) ববিতা (৩) নিহারিী (৪) চারুবালা (৫) ঊষা (৬) মাধভী (৭) মাধুরি (৮)গীতা (৯)প্রিয়াঙ্কা(১০)কুসুম (১১)বিষ্ণু (১২) সবিতা (১৩) শিল্পী (১৮) রিতা, (১৯)শ্রীমতি, (২০)কল্যানী এবং (২১}পূর্ণিমার দুর্ভাগ্যের কথা বলেন।
আমার বিশ্বাস, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। থমকে গিয়েছে। আমরা সেদিন ৯ মাস শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় থেকে মুক্তবাতাসে নিশ্বাস নেয়ার অবকাশ পেলাম মাত্র। জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের মৃত্যুকূপ থেকে বেরিয়ে এলেন। এক কোটি শরণার্থী পরবাসের নরক জ্বালা থেকে বেরিয়ে নিজের পোড়ামাটিতে ফিরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। সবই সম্ভব হযেছিল শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে। তার নির্দেশে, বাংলাদেশ -ভারত যৌথ বাহিনীর অধিনায়ক লে. জেনারেল অরোরা গভীর নিষ্ঠার সাথে যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন একটা ডেড লাইনের দিকে। জেনারেল জ্যাকব নিজে গেলেন হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজির আস্তানায়। সেই অনমনীয় গোঁয়ার সেনাপতিকে বললেন, দেখো তোমরা হেরে গেছো এই যুদ্ধ। এখন তোমরা চারি দিক থেকে অবরুদ্ধ। তুমি একজন বীর সেনাপতি। তোমাদের ৮০/৯০ হাজার লোককে সপ্রাণ দেশে ফিরিয়ে নেয়াই হবে তোমার জন্যে সর্বোত্তম বীরোচিত কাজ। এভাবে তিনি আত্মসমর্পণের দলিলে নিয়াজির সম্মতি-স্বাক্ষর আদায় করতে সক্ষম হলেন।১৬ ডিসেম্বও ৭১ দুপুরে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করলেন। ৮৩ হাজার যুদ্ধবন্দীর নিরাপদে দেশে ফেরা নিশ্চিত হল।
নিউইয়র্কে তখন ১৫ ডিসেম্বর রাত ভোর হবে হবে করছে। নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব সোভিয়েত ভেটোর মুখে পড়ে মার খেয়েছে। নিয়াজি আত্মসমর্পণ না করলে হয়ত ২৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিশ্চিত অনুমোদন পেতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ বহু রক্তের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর পাওয়া শান্তি স্থায়ী হতে পরেনি। ১৫ আগস্ট প্রতিবিপ্লবের কারণে তা রক্তের বন্যায় ভেসে গেছে। দুই পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধের মত ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধও শীতল যুদ্ধের রূপপরিগ্রহ করেছে।এ যুদ্ধ শেষ হবেনা একাত্তরের পরাজিত মৌলবাদী শক্তি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন ও নির্মূল না হলে। এই বাস্তবতায় পরাজিত শক্তি জাতিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার প্রয়াস পাচ্ছে। গৃহযুদ্ধের হুমকির মুখে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তিকে তারা জিম্মী করে রেখেছে। ৭২ এর সংবিধান পুরোপুরি ফিরে আসতে পাছেনা।
(২): সিরিয়া রণাঙ্গন থেকে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি দু হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রত্যয়ের সাথে বলেছেন, ‘আই এস’ যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। দৃশ্যমান অবস্থায় সিরিয়া রণাঙ্গন পাহারা দিচ্ছে ইরাণ এবং রাশিয়া। যুদ্ধশেষ হয়েছে কথাটা খুব সহজভাবে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিষয়টা কিন্তু ততো সহজ না। সেই কথার ভিতরে হয় ফাঁকি আছে না হয় পাশ কাটিয়ে যওয়ার চেষ্টা আছে। সত্য এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়াসও হতে পারে। অথবা তাতে মিথ্যার বেসাতি আছে। শঠতা ও কপটতা আছে। ফাঁকিটা ধরা পড়েছে সাথে সাথেই।
মার্কিন সৈন্যরা যখন গাট্টি বোচকা নিয়ে দেশের পথে পাড়ি জমিয়েছে ঠিক তখনই আবার তাদের উপর ‘আই এস’ বোমা হামলা চালিয়েছে। কয়েকজন তাতে আহত হয়েছে। এই খবরটাও মিডিয়াতে চাউর হতেই মার্কিন সেনাদের মনে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। রণক্ষেত্রে যখন কোন সৈনিক লড়াই করে তখন সে মন থেকে কোমল অনুভূতিগুলোকে মুছে ফেলে দেয়। শত্রু হননের জন্যে মনকে কারবালার ঘাতক সীমারের মত কঠিন করে তোলে। কিন্তু ঘরমুখি হতেই তাদের মানসপটে ভেসে ওঠে মায়ের অশ্রুভেজা মুখ। পিছনে রেখে আসা স্ত্রী ও সন্তানদের বিষণœ চেহারা।স্বজনদের আকুতি। ঘরে ফেরার সময় কোন বিঘœ সৃষ্টি হলে তাই মনের উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। দেশের মানুষকে বুঝ দেওয়াটাও খুব কঠিন হয়ে পড়ে। মায়ের মন ডুকরে কাঁদে অজানা আশঙ্কায়।
সিরিয়া যুদ্ধের বিষয়টা খুবই গম্ভীর। এর ডারপালা অনেক। শিকড়টাও মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত। সিরিয়া ও ইরাকে ক্রিয়াশীল ‘আইএস’ এবং আফ্রিকায় সক্রিয় আল শাবাবের শিকড় একইসাথে জড়িয়ে আছে রসুনের মত গুচ্ছমূলে। সোমালিয়া জঙ্গীবাদের ঘাটি। দুর্ধর্ষ মার্কিন ম্যারিণ সেনারও সে ঘাটি ধ্বংস করতে পারেনি। পর্যবেক্ষকরা অবশ্য বলছেন, আই এস যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রাঙ্কেন স্টাইন। তারা সমাজতন্ত্র দমনের গোপন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প এজেন্ডা নিয়ে কাজ করতে উৎপন্ন হয়েছিল। আইএস সেই চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা সারা দুনিয়ায় জনগণের সার্বভৌমত্বের বিপরীতে শরিয়া আইনে খেলাফত তথা আল্লার হুকুমত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বিভিন্ন নামে ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে তৎপর রয়েছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তাদের দোসর তালেবানরা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সেখান থেকেও দৃশ্যতঃ মার্কিন সৈন্যরা মুখ থুবড়ে ফেরত এসেছে।কিন্তু তালেবান, আরশাবাব বা “আই -এস’কে নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্র যে আদৌ সচেষ্ট নয় এখন সেটাও কারও অজানা বিষয় না। সিরিয়া সঙ্কটের গোড়ায় গেলে বিষয়টা প্রাঞ্জল হয়।
১৯৮২ সালে সিরীয় আরব বাহিনী সরকার বিরোধী অভ্যুত্থান দমন করতে হামা শহরে সমবেত উগ্রপন্থী সুন্নী সম্প্রদায় এবং মুসলিম ব্রাদারহুড দলের জঙ্গীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সেনা অভিযান চালায়। সেনা বাহিনী তার আগে ২৭ দিন হামা শহর অবরোধ করে রাখে। মুসলিম ব্রাদারহুড এবং উগ্রপন্থী সুন্নী সম্প্রদায় সিরিয়ার সেক্যুলার সরকার প্রধান হাফিজ আল আসাদকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল ১৯৭৬ সাল থেকে। সিারয়াতেই তখনও বাথপার্টির নেতৃত্বাধীন আরবের একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতাসীন ছিল। মিশরের মুক্তিদাতা কর্ণেল নাসের এবং দার্শনিক মাইকেল আফলাক আরবে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৫৮ সালে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র ‘ইউ-এ- আ’ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু মিশর, সিরিয়া ও ইয়েমেনকে নিয়ে গঠিত ধর্মনিরপেক্ষ আরব প্রজাতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। ১৯৬১ সালে সেই আরব ফেডারেশন বিলুপ্ত হয়।
হামা ম্যাসাকার নামে খ্যাত জঙ্গী নির্মূল অভিযানে কত লোক নিহত হয়েছিল তার কোন সঠিক হিসাব মেলেনা। পাশ্চাত্য দেশের কূটনীতিকদের প্রাথমিক জরিপে ছিল ১০০০। পরে বেড়ে দাঁড়ালো ২০০০। সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক দাবি করলেন ২০,০০০ এবং সিরীয় মানবাধিকার কমিটি বললো ৪০,০০০। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সংশয় থাকলেও জঙ্গীবাদী বিদ্রোহ সম্পূর্ণ নির্মূলিকরণের সাফল্য নিশ্চিত হয়েছিল। সেই অভিযানে ১০০০ সিরীয় সৈন্য নিহত হয়। প্রাচীন শহরের বড় অংশটাই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সিরীয় মিডিয়া দাবি করে, “বিদ্রোহীরাই প্রথম হামলা শুরু করেছিল। তারা ঘুমন্ত অবস্থায় আমাদের কমরেডদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। নারী ও শিশুদের হত্যা করে তাদের দেহ পাগলা কুকুরের মত ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। তার পরেই সিরীয় নিরাপত্তিা বাহিনী বিদ্রোহীদের চরম শিক্ষা প্রদান কর’’।
স্মরণ করা যেতে পারে যে ১৯৪০ সাল থেকে ধর্মনিরপেক্ষ সিরীয বাথপার্টির সাথে উগ্র ধর্মবাদী চরমপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডের সংঘাত ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। হামা শহর ছিল মৌলবাদীদের শক্ত ঘাটি এলাকা। সিরীয় নিরাপত্তার অভিযানে সেই ঘাটি মাটিতে মিশে যায়। দেশব্যাপী তাদের যে সমর্থক গোষ্ঠী ছিল, তারাও মাথা তুলতে ব্যার্থ হয়। তারা সবাই পালিয়ে জর্দান ইরাক, যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনে আশ্রয় নেয়। সেসব অবস্থান থেকেই ২০১১ সালে আরব বসন্তের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে গা ভাসিয়ে তারা ফিেের আসে দ্বিতীয় হামার পটভূমিতে। আলকায়দা জঙ্গীদের সাথে নিয়ে পাশ্চাত্যের সহযোগিতায় তারা শিয়া সম্প্রদায়ের সমর্থনপুষ্ট প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সেক্যুলারপন্থী সরকার উৎখাতের জন্য আদাজল খেয়ে লড়াই শুরু করে। ইরাক থেকে আইএস যোগ দেয় তাদের সাথে। রাশিয়া এবং ইরান সিরিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায়। কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গীবাদ বিরোধী লড়াইতে নামমাত্র অংশগ্রহণ করে। একদিকে সৌদি সমর্থিত মুসলিম আরব সংহতি অন্যদিকে রাশিয়া-চীন -ইরাণ সমর্থিত সেক্যুলার ঐক্য। এ যুদ্ধ থামবার নয়।
(৩: বাংলাদেশ ভূখন্ডে মুসলিম ব্রাদারহুড সদর্পে বিরাজ করছে ভিন্ন নাম পরিচয় নিয়ে। ১৯৪৮ সাল অব্দি তারা স্বনামে তৎপর ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের একটি সক্রিয় সংগঠনের মনোনয়নে একাত্তরে রাজাকারে রূপান্তরিত হওয়া সাংসদ কক্সবাজারের মৌলভি ফরিদ আহমদ ‘ঢাকসু ভিপি’ ও পরবর্তীকালের রাজাকার সর্দার গোলাম আজম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ফরিদ আহমদ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হন। অন্যদিকে গোলাম আজম মুসলিম ব্রাদারহুডের ভারতীয় সোল এজেন্ট ও পাকিস্তান জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মওদুদির কাছ থেকে এজেন্সি নিয়ে জিয়াউর রহমানের সহায়তায ‘জামাতে ইসলামী বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার আগে তিনি মওদুদির সাথে থেকে মুসলিম ব্রাদারহুড পরিবারের রাজনৈতিক হাতিয়ার মুসলিম লীগের ভগ্নাংশ নিয়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করেন এবং হানাদার পাকিস্তানী হার্মাদদের পাশে গিয়ে রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর তরুণ সদস্যরা আল-শামস্ ও আল-বদর পরিচয়ে নারী ও শিশু সহযোগীদের নিয়ে হিং¯্র রণ মেধযজ্ঞে জল্লাদের ভূমিকা পালন করে। ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাঙালি বুদ্ধিজীবী নিধনের নীল নক্শা বাস্তবায়নে প্রধান ভূমিকা পালন করে। মুসলিম ব্রাদারহুডের আর এক দোসর হেফাজতে ইসলামের ক্যাপটেন মওলানা শফি একাত্তরে মোজাহিদ বাহিনী নিয়ে হানাদারদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদারহুডের দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠাতা মিশরের হাসান বান্না ও সাঈদ কুতুব জেনারেল নাগীবের ঘাড়ে চড়ে কর্ণেল নাসেরকে ধরাশায়ী করতে যেয়ে নিশ্চিহ্ন হন। মওলানা মওদুদির হাতে গড়া পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী দল আজও বিভিন্ন জার্সী পরে রাজনীতির ক্রীড়াঙ্গনে তৎপর রয়েছে। খ্রিস্টান রমণী আছিয়া বিবি তাদেরই হিংস্র ছোবলের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশে জামায়াতের শেষ চিহ্ন এখনও মুছে যায়নি। ২০০১ সালে তারা তরুনী পূজা শীলের গণধর্ষণ ও একই সময়বিভিন্ন পটভূমিতে মানবাধিকার কর্মী সালাম আজাদ, শিতাংশু গুহ এবং ড. রাধিকা কুমারস্বামী বর্ণিত নারী নিপীড়নে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। ২০১৩-১৪ সালের আগুন সন্ত্রাস ছিল সাম্প্রতিক কালে তাদের সবচেয়ে বড় মহড়া। তার আগে শাপলা চত্বরের মুসল্লি সমাবেশের মধ্যে হামা সঙ্কটের উপাদান নিহিত ছিল। জাতির পরম সৌভাগ্য যে সেদিন মুসলিম ব্রাদারহুড পরিবারের দেশীয় ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ডাকাডাকি সত্ত্বেও জনগণ সাড়া দেয়নি। সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য সেই গভীর সঙ্কটের রক্তপাতহীন সমাধান ও সহজ নিরসন। সিরিয়ার সাথে বাংলাদেশের সামঞ্জস্য ও সাজুয্যের জায়গা এটাই যে আমরা উভয় দেশ লড়ছি নিজ নিজ বাস্তবতায়, সকল ধর্মমতের মানুষের জন্য নিজ ধর্ম পালনের অবাধ স্বাধীনতা এবং “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড“ এর বিধান সম্বলিত সমসমাজ ও সেক্যুলার রাষ্ট্র কায়েম রাখার জন্যে।
দু দেশের দুর্ভাগ্যের বিরাট মিল রয়েছে। সিরিয়ায় যুদ্ধের আগুন দপ করে নিভে গেলেও ছাইচাপা তুষানল জ্লছে ধিকিধিকি এবং তা জ্বলবেই যতদিন মৌলিক দ্বন্দ্বের সমাধান না হবে। সেই মৌলিক দ্বন্দ্বের একটি হ’ল শিয়া সুন্নীর দু সহস্রাব্দ স্থায়ী বিরোধ। অন্যটি সামন্তবাদের সাথে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের ত্রিমুখী বিরোধ। সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের চৌকিদার ও সাধারণ মিত্র হ’ল মৌলবাদ। সেক্যুলার সিরিয়া নিজের ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্যের মধ্যে নিজেও এখনও সামন্তবাদের খোলস থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারেনি। তা সত্ত্বেও সমাজবাদের সাথে সখ্য ও নৈকট্যের কারণে পুঁজিবাদ ও তার প্রতিপালক সাম্রাজ্যবাদের সাথে তার বিরাজমান দ্বন্দ্ব সমাধানযোগ্য নয়।
বাংলাদেশেরও মৌলিক ও সমাধানহীন দ্বন্দ্ব তাজা রয়েছে বিলীয়মান সামন্তবাদ ও তার রক্ষক-ভক্ষক মৌলবাদের সাথে। মৌলবাদের গুরুমশাই মুসলিম ব্রাদারহুড, তার শাবক ও সংঘশক্তির সাথে বাংলাদেশের কুয়াশা ঢাকা নীরব নিশব্দ লড়াই চলছে ও চলবে যতদিন মৌলিক দ্বন্দ্বের প্রাকৃতিক সমাধান না হয়।
আসল সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন বিজ্ঞানগুরু জ্ঞানতাপস আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি ইশারা করেছেন পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের আত্মবিধ্বংসী এক অপরিণামদর্শী সংঘাতের সর্বনাশা পরিণতির দিকে। সে সংঘাতই হবে চূড়ান্ত এবং অনিবার্য। তারপর মানুষ আবার ফিরে যাবে প্রকৃতির কাছে। সেখানে বিরাজিবে এক বৈষম্যহীন সমতা এবং সবার জন্য আদি অকৃত্রিম লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড।
ক্যালিফোর্নিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here