ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান স্মরণে

7

মোহাম্মদ জামান খোকন

ঊণসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান দিবস বাঙালির জাতীয় জীবনের অন্যতম তাৎপর্যমন্ডিত দিবস। ঊণসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রবল বানে পাকিস্তানের লৌহমানব খ্যাত আইয়ুব খানের গদি ভেসে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন দশক পালন করেও রক্ষা পান নি আইয়ুব খান। তারই উত্তরসূরী ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিতে হয়েছিল তাকে। সেই গণ-অভ্যুত্থানের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে এই বছর।
১৯৬৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হরতাল ঘোষণা করেন। শহীদ আসাদ ঢাকার নরসিংদীতে হাজার হাজার কৃষক শ্রমিককে নিয়ে হরতাল পালন করেন। হরতাল চলাকালে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে তিনজন কৃষক নিহত হন। পরদিন পত্রিকা অফিসে এসে আসাদ তা বর্ণনা করেন এবং পত্রিকায় তা ছাপা হয়। ইতোমধ্যে ডাকসুর তৎকালীন সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমদকে নিয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কার্যক্রম চলছিল পুরোদমে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই মামলার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। বিভিন্ন মিছিল মিটিং চলতে থাকে। নরসিংদীর ঘটনায় এই সংগ্রাম আরও ত্বরান্বিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত নেন ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯ সালে সারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালিত হবে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ইতোমধ্যে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সে ২০ জানুয়ারি ১১ দফার সমর্থনে আসাদ নেতৃত্ব দেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশেই চানখারপুলে পুলিশের গুলিতে আসাদ শহীদ হন। আসাদের পুরা নাম ছিল আমানুল্লাহ মুহম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি ছিলেন তৎকালীন ঢাকা হলের (বর্তমানে শহীদ উল্লাহ হল) পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ঢাকা হল শাখার সভাপতি। পরবর্তীতে আসাদের রক্তশাখা শার্ট নিয়ে মিছিল বের হয়। কবি শামসুর রাহমান লিখেন সুবিখ্যাত ‘আসাদের শার্ট’ কবিতা। এভাবেই ছাত্র সংগাম পরিষদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকেন। শেরে বাংলা নগরে আইয়ুব গেটের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় আসাদ গেট।
এর পরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সারা পাকিস্তানে ২৪ জানুয়ারি আবার হরতাল পালিত হয়। সেদিন নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর শহীদ হন এবং রুস্তম নামক একজন ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিনে সরকারের পক্ষ থেকে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। ঢাকা শহরের ভার সেনাবাহিনীর হাসে ন্যস্ত করা হয়। সেদিন সেনাবাহিনী ও ইপিআর এর বেপেরোয়া গুলিতে নাখালপাড়ায় আনোয়ারা বেগম নামে এক মহিলা ঘরের ভেতরে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এতে সারাদেশে জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এভাবেই সংগ্রাম, মিছিল, সভা চলতে থাকে। ঢাকা নগরী মিছিলও মিটিংয়ের নগরীতে পরিণত হয়। এরই মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দি অবস্থায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গুলি করে হত্যা করা হয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল ইলাটর নামকরণ করা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হক হল।
মওলানা ভাসানী পল্টন ময়দানে লক্ষাধিক লোকের জনসভায় ঘোষণা দেন অনতিবিলম্বে ১১ দফায় বাস্তবায়ন ও রাজনবন্দীদের মুক্তি না দিলে প্রয়োজনে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হবে। তিনি ঘোষণা করেন, প্রয়োজনে ফরাসি বিপ্লবের মতো জেলখানা ভেঙে শেখ মুজিবকে নিয়ে আসা হবে। শুধু স্লোগানে ‘জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব’, ‘আইয়ুব মোনায়েম ভাই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই’, মিটিং শেষে তৎকালীন মর্নিং নিউজ ও বিচারপ্রতির বাড়িতে আগুন দেয় জনতা। পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে বিচারপতি পালিয়ে বাঁচেন। তারপরে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে সেনাবাহিনী বেয়নট চার্চ করে হত্যা করে। তিনি ছাত্রদেরকে মিছিল থেকে ফিরিয়ে নিতে এসেছিলেন। সেনাবাহিনীর কাছে আবেদন করেছিলেন ছাত্রদের ওপর যেন অত্যাচার না করা হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর লোকেরা নির্মমভাবে তাকে হত্যা করে। এভাবেই আন্দোলনে চরম আকার ধারণ করে। এক সময় আইয়ুব খান আগড়তলা ষড়যন্ত্রে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২১ ফেব্রুয়ারির পরে অর্থাৎ ২২ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হয় মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। শেখ মুজিবসহ সকল আসামিকে বিনাশর্তে মুক্তি দেয়া হবে।
তারপরে আসে সেই ২৩ ফেব্রুয়ারি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ মুজিবসহ সকল আসামিকে রেইস কোর্স মাঠে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেই জনসভায় ডাকসুর তৎকালীন ভিপি ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমদ কর্তৃক শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সে দিন থেকে শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারিখ স্থগিত ঘোষণা। ১৯৭১ এর ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বাধীনতা রূপরেখা ঘোষণা। সবিশেষ ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা। তারই যোগ্য উত্তরসূরী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা করেছি।
আসুন আজ আমরা সকল শহীদের প্রতি সম্মান জানাই। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬ দফা আন্দোলন। ’৬৯-এর গণআন্দোলন স্বাধীনতা, সংগ্রামে সকল শহীদের জন্য প্রার্থনা করি পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা যেন তাদেরকে পরজগতে শান্তিতে রাখেন। আমরা যারা বেঁচে আছি আমরাও যেন আল্লাহ ও রাসুলের পথ অনুসরণ করে জীবন চালিত করতে পারি এই দোয়া করছি। আমিন!
-পোকিপসী, নিউইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here