গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন

5

মাহমুদ রেজা চৌধুরী

প্রথমটি একটি আদর্শ বা নীতি। অপরটি এর পরিচর্যা। বিষয়টিকে বুঝতে চেষ্টা করবো সাম্প্রতিক সময়ে সমাজের সবক্ষেত্রে গণতন্ত্র চর্চাতে আমাদের স্বরাজনীতি এবং এর কৃষ্টির আলোকে। দেখার আয়না মহান মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, উচ্চারণ, ত্যাগ ও রক্তকণিকার মধ্যে। মিথ নয়, বাস্তবতাতে।
উল্লেখ্য যে, প্রাচীন গণতন্ত্রে নাগরিকের যে প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ছিলো, আধুনিক গণতন্ত্রে সেখানে প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জোয়ার। ক্ষুদ্র শ্রেণি ও দল বা গোষ্ঠী বৃহৎ গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে রুটি ও হালুয়ার ভাগাভাগিতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শ্রেণি এবং জোটকে উপেক্ষা করছে কি- ভাবায় বৈকি! এই শিল্পায়নোত্তর গণতন্ত্র কি সমাজে বৈষম্যকে দীর্ঘ করছে কি না! এটি সাধারণ গণমানুষেরও স্বার্থে প্রতিপক্ষ কিনা। হলে এর মুক্তি কোন পথে। সম্ভাবনার একটিকে নিয়ে আলোচনা করবো।
বেইলি রোড অথবা শিল্পকলা একাডেমির সুসজ্জিত নাট্য মঞ্চে নাটক দেখছি। ধরে নেয়া যাক, নাটকটির নাম- ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়।’ যাকে বলা যায় সামাজিক বৈষম্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আওয়াজ আসছে। দারুণ একটা ম্যাসেজ! মানুষতো তা-ই চাই আমরা- অন্যায়ের শেষ ঘণ্টা বাজুক। নাটক একটি নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হলো। মঞ্চ খালি। কেউ নেই সেখানে। যে ছিলো এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে, দেখা গেলো সে নাটক শেষে বাড়ি ফিরতে গিয়ে ঐ নাটকের নায়ক চরিত্রে আর রইলো না। ভিলেন হয়ে গেলো। আর নাট্যচরিত্রের ভিলেন হলো বাস্তব চরিত্রে মানবিক।
নাটকের চরিত্রের একজন নায়ক, বাস্তব চরিত্রে হয়তো সে প্রকৃত ভিলেন। নাটকের চরিত্রে যে ভিলেন, সে হয়তো বাস্তবে সৎ মানুষ, সৎ নায়ক। এরকম হতেই পারে, হয়ও হয়তো!
এভাবে চিন্তা করতে গিয়ে সক্রেটিসের সেই কথা মনে পড়লো- ‘বিশ্ব হলো এক বিশাল নাট্যমঞ্চ মাত্র। আমরা এক একজন করে মঞ্চে আসছি, পাট শেষ, বিদায় নিচ্ছি। এর বাইরে কি আছে, বা আছে কি-না অজানাই রয়ে যায়। সেই অর্থে সমাজে অথবা ব্যক্তি জীবনে বা রাষ্ট্রে যা কষ্ট দেয়, ভাবায় অথবা বিষন্ন করে। তাও সাময়িক। তবে এই সাময়িক সময়ের পরিধি কতোটা- আমরা তা জানি না বলেই স্বপ্ন ও আশা বুনি। ভাবি এই বুঝি ‘বর্গি’ বিদায় হলো। মনের মধ্যে গুন গুন করে ছোট্টো সেই ছড়াটি- ‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে!’ তবুও খাজনা দিতে হয়। ওটা না দিলে এক সময় রাজারও রাজ্য চলতো না। এখন রাষ্ট্র চলে না। রাষ্ট্রেও যে রাজা আছেন!
চলতি সময় এই খাজনা কেবল জমির ফসল বা কড়ি দিয়ে মেটালেই রাজা ‘খুশি’ না। কথার জন্যও খাজনা দিতে হয়, যদি তা কোন রাজা মনে করেন, বা আদেশ দেন। অথবা মৃদু ইচ্ছা পোষণ করেন। আমাদের কথা বলার অধিকারকে বলি বাক্ স্বাধীনতা। এই বাক্ স্বাধীনতা নিয়ে এক সময় আফ্রিকার ইথোপিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান প্রয়াত ইদি আমিন বলেছিলেন- ‘আমি তোমার বাক্ স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করতে পারি, কিন্তু এরপর তোমার স্বাধীন অবস্থার পরিবর্তন হবে কিনা- নিশ্চয়তা দিতে পারি না। (‘There is freedom of speech, but I can not guarantee freedom after speech.’)
ঘরে বাইরে অনেকেই বলছেন (বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে) বিরোধীদের কথা বলতে দিতে হবে। কথা না বলতে দিলে সেটাকে গণতন্ত্র বলা যাবে না। গণতন্ত্রে কথা বলার বিষয়টি অনেক গুণিজনের মতে এক রকম দ্বিবাচনিকতা। মানে, গণতন্ত্র বিভিন্ন ডায়লগকে গুরুত্ব দেয়। এটিকে আমরা মানবিকী বিদ্যাও বলতে পারি। এই দেখার বা চিন্তাপ্রণালী এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা, দলীয় প্রভাব এবং বর্তমান এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ভয়ঙ্কর নির্মাণ প্রবণতার কার্যকর প্রতিষেধকও। সমাজে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থাতে অন্যায় এবং অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিটি উত্থান মানবিক, প্রতিটি প্রকাশও মানবিক প্রকাশ। বাধা-বিঘœ-রুদ্ধতা গতিহীনতা জীবনের পক্ষে প্রয়োজনীয় বিপ্রতীপতা। এসব না হলে মানুষের চিন্তা ও কাজ দ্বিবাচনিক অর্থাৎ ডায়ালগের মধ্য দিয়ে বিকশিত হতে পারে না।
গুণিজনরা অনেকেই মনে করেন, আধুনিকোত্তরকালে দ্বিবাচনিকতা সময়োপযোগী এক দাবি। মানুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সাথে অপরতার স্বাভাবিক পরিসরও যখন এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার নিয়ামক বা নিয়তি চরম উদ্ধত প্রতাপের আস্ফালনে চূর্ণ-বিচূর্ণ। এর মধ্যে ডায়ালগ বা দ্বিবাচনিকতার দর্শনকে কী করে আমরা ফিরিয়ে দেবো ব্যর্থ অভিবাদনে। বর্তমান শতাব্দীর একজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক মিখায়েল মিখায়েলোভিচ বাখতিন (১৮৯৫-১৯৭৫) মনে করেন- To be means to communicate dialogically. When the dialogue ends, everything ends.
এই ডায়লগ চালাচালি সমাজ এবং রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট শ্রেণি এবং গোষ্ঠীর ভেতরে এবং কেবলই এদের প্রেসক্রিপশনে নির্ধারিত হলে সেটাও ভুল।
দেশের সার্বিক ঘটনার জন্য ভিন্নমতকে শত্রুতা বা মতলবাজ বলে সাধারনিকরণ করা যায় না। মানুষের প্রতি ভয় বা বাধ্যতামূলক ভীতি প্রদর্শন সম্পূর্ণ প্রয়োজনহীন, যদি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আস্থা দৃঢ় থাকে। এই আস্থা দৃঢ় থাকে নিজের কাজে সততা এবং সেটা ক্ষুদ্র স্বার্থের বাইরে থাকলে। জীবনের নাট্য মঞ্চে আমরা সম্রাট/রাজা বা রানী হলেও প্রস্থান করবো সাধারণ বেশে। থাকে কেবল কাজ, যা কথা বলে।
বাংলাদেশের রাজনীতির নৈতিকতাকে কোনো অর্থেই মানবিক কিংবা অনুসরণীয় আদর্শিক কিছু বলা যাবে না। আমাদের আর্থিক উন্নতি, খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা এবং অন্যান্য কিছুতে সামাজিক যে উন্নতি বাহ্যিকভাবে অর্জন করেছি, সেটাও যে কেবল বিগত ৮/১০ বছরের ঘটনা তা কিন্তু ঠিক নয়। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, সংঘর্ষ, চ্যালেঞ্জ এবং বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার আর্থিক উৎকর্ষতাও এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই বাহ্যিক উন্নতির জন্য কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল এবং তাদের নেতৃত্ব এককভাবে এর কৃতিত্ব বা ব্যর্থতার কারণ না। পাশাপাশি এটাও বলা ভুল যে, বিগত কোনো সরকার এবং তাদের ভূমিকা ছিলো দেশকে অনুন্নত রাখা, দরিদ্র রাখা। কেবল চুরি করা। তবে রাজ্যের সম্পদ চুরি রাজা এবং প্রজা কমবেশি সবাই করে। সব সময়ই করে আসছে। বাংলাদেশের সব সরকারই যার যার দায়িত্বে থাকাকালীন ভালো কাজও করেছেন। এখনকার সরকারও করছেন। আগামীতে এই ভালোর ফলাফলটুকু অব্যাহত রাখতে এবং পদদলিত হতে না দিলে, প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের সহযোগিতা, ডায়লগ এবং ব্যক্তির মৌলিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে যে কোন বাধাবিঘেœর উপর রাখা জরুরি।
বেইলি রোড বা শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চই না, বাস্তব সমাজ ও রাষ্ট্রে আমরা চাই এর সব কলাকুশলি, নির্মাতা, পরিচালক, টি বয় সবাই যেনো সর্বত্র সুবিচার পাই আমরা।
মনে রাখতে চেষ্টা করবো, রাজনীতির সুভবিষ্যৎ বলা খুব কঠিন। তবে চেষ্টা করতে পারি সবার জন্যই একটি সুশাসন ব্যবস্থা, আইন ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে সমাজে বৈষম্যের ব্যবধানকে সংকুচিত করে আনতে। গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন বলতেও নিজেদের জন্য এর একটি সঠিক জবাব খুঁজে নিতে চেষ্টা করবো। গুণিজনেরা বলেন- গণতন্ত্রের কোনো সার্বজনীন রূপ নেই। রাষ্ট্রের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্বিক চরিত্রভেদে এরও স্বরূপ বদলাতে পারে।
বিট্রিশ সমাজবিজ্ঞানী অ্যন্থনি গিন্ডেস লিখেছেন- Democracy is not an all or nothing things. There can be different forms, as well as different levels of democracy.
বিগত কয়েক বছর থেকে সরকার বলে যাচ্ছেন- রাজনৈতিক গণতন্ত্রের আগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কবি নজরুলের কথাতে বললে শোনাবে- ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় শুধু ভাত একটু নুন।’ এই দর্শনটা আধুনিক সিঙ্গাপুরের অন্যতম আর্কিটেক্ট ‘লি কুয়ান’ অনুসরণ করেছেন। যেখানে লিকুয়ান নাগরিকের পেটের ক্ষুধা নিবারণে চেষ্টা করেছেন সর্বাগ্রে। সেখানে পিউপিল ডেমোক্রেসির চেয়ে অনেকটাই কর্তৃত্ববাদী সরকারের নীতি অনুসরণ করেছিলেন লি কুয়ান। তবে একজন আদর্শিক জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন কুয়ান। তাও সত্য।
অন্যদিকে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্মত্য সেন বলেন- গণতন্ত্র না থাকলে দুর্ভিক্ষ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। Famine has ever occurred in a democratic country…. no matter how poor.
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কোনটা আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থ হবে, সেটি নিয়ে সমাজের সব মহলে নিঃসঙ্কোচ এবং নির্ভয়ে সবারই মতামত শোনা ও জানা দরকার। এই মতামত প্রকাশে বাধা হলে বা একে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব নিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখলে, সেটা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কোন উন্নতিকেই ধরে রাখতে সফল হবে না।
যে কারণে আমাদের বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থাতে একে অন্যকে কথা বলতে কোন ধরনের কেউ কারোর প্রতি অবজ্ঞা বা সেটা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা ভুল। একতরফা উল্লাস এবং কিছুকে চিরস্থায়ী মনে করাও ভুল। পৃথিবীতে কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। জীবন ও জগতের কোন কথাই শেষ কথা নয়। কথা তাই বলতে দেয়া উচিত বাধাহীন। নাট্য মঞ্চে যে পায়ের আওয়াজ দেখি এবং শুনি, সেই আওয়াজ হঠাৎ রাজপথে নেমে আসবে না, বলা যায় কি!
সমাজ এবং রাষ্ট্রের সর্বত্রই প্রতিপক্ষের কথা বলার সমান অধিকার এবং এর মর্যাদা যেনো সুনিশ্চিত থাকে। আমাদের গণতন্ত্রের গণতান্ত্রায়ণ বলতে বুঝবো- ক্ষুধায় পেটে অন্ন জুটবে, আর স্বরাজ পাবো মাননশীলতা এবং মানবিকতার বিকাশে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক।
৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯।
ই-মেইল: mahmud315@yahoo.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here