ঠিকানা : গৌরবের ৩০ বছরে

13


২১ ফেব্রুয়ারি সকলের প্রিয় পত্রিকা ঠিকানার জন্মদিন। সেই সূত্রে ঠিকানা একুশের জাতক। ঠিকানা এবার ৩০ বছরে পদার্পণ করল। প্রবাসের সংগ্রামী জীবন পেছনে ফেলে সাফল্য লাভের বিপুল সম্ভাবনা যখন হাতছানি দিচ্ছে, তখন সেসব রেখে কমিউনিটির কল্যাণে স্বদেশ-প্রবাসের মধ্যে সুদূর এক সেতুবন্ধ রচনা, বিশ্বশান্তি ও সভ্যতা রক্ষার ব্রত নিয়ে মায়ের মুখের ভাষা বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমতা ও ভালোবাসায় ১৯৯০ সালে একটি পত্রিকা প্রকাশে এগিয়ে এলেন দুরন্ত সাহসী এক যুবক এম এম শাহীন। তাকে সকল প্রকার সহযোগিতা, মায়া ও মমতা দিয়ে পাশে দাঁড়ালেন তারই অগ্রজ জাতীয় অ্যাথলেট সাঈদ-উর-রব।
সেটা ছিল প্রবাসে বাঙালি কমিউনিটির জন্য ভয়ংকর এক জীবনসংগ্রামের কাল। তারাও অনুভব করলেন এ রকম একটি পত্রিকা তাদের প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পাশে পাওয়া কতটা জরুরি। এই অনুভব থেকে অনেকেই পৃষ্ঠপোষক হয়ে, সহযোগী-শুভানুধ্যায়ী হয়ে ভালোবাসার ডালি ভরে ঠিকানার অংশ হয়ে গেলেন। এভাবেই পথচলা। ২৯টি বছরে ঠিকানাও তার সুখ-দুঃখের সাথি কাউকে ভোলেনি। কাউকে পাশ থেকে সরে যেতে তো দেয়ইনি, বরং স্বজন ও সুহৃদের সংখ্যা আরও বাড়িয়েছে। এবং যে অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি ও লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু ঠিকানার, সে পথ থেকেও ঠিকানা সরে আসেনি। তাই এ শুভ মুহূর্তে ঠিকানা সবাইকে গভীর শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছে।
আমরা মানুষ যেমন নিয়ম বানাই, সে নিয়ম ভাঙিও অহরহ। কেউ কেউ যুক্তি দিয়ে বলে থাকেন, নিয়ম-কানুন তৈরিই হয় ভাঙার জন্য। মানুষ বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে চলে তাই হয়তো নিজেদের তৈরি আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ভাঙলে কিছু যায়-আসে না। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম প্রকৃতি ভাঙে না। পাতা ঝরার সময় পাতা ঝরে। গ্রীষ্মে গরম, শীতে ঠান্ডা। ঝড়-বৃষ্টি, খরা, সুনামি-জলোচ্ছ্বাস সবই নিয়ম মেনে হয়। কখনো কখনো প্রকৃতির আচরণে যে ব্যত্যয় লক্ষ করি, প্রকৃতির যে আচরণ আমাদের শঙ্কিত ও চিন্তিত করে তোলে, তার দায়ও দেখা যায় মানুষের ওপরই বর্তায়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ যে অন্যায় আচরণ করে, প্রকৃতি তার প্রতিশোধ হিসেবেই ফিরিয়ে দেয় মানুষের নানারূপ দুর্ভোগ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।
বলছিলাম প্রকৃতির নিয়মানুবর্তিতার কথা। সেই নিয়মেই মানুষের জীবনে পুরনো বছর বিদায় নিয়ে নতুন বছর আসে। মানুষ সব হতাশা ঝেড়ে ফেলে নতুন আশায় বুক বাঁধে। নতুন স্বপ্ন দেখে। কবি কবিতা রচনা করেন ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক…’। গান রচিত হয় ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে, আগুন জ্বালো…।’ নবজাতকের বাসযোগ্য নতুন বিশ্ব গড়ার কথা শোনা যায়। পাতা ঝরার কালে যেমন পত্রপল্লবে সুশোভিত বৃক্ষরাজি চোখের পলকে শুকনো শাখা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মানুষের চোখে অবিশ্বাস্য মনে হয় পত্র-পল্লবহীন এই ন্যাড়া গাছটিই দুদিন আগে দৃষ্টিনন্দন ছিল। মানুষকে ছায়া দিয়েছে, প্রাণ জুড়িয়েছে।
বৃক্ষের সেই পাতা ঝরার মতো ক্যালেন্ডার থেকে যখন ১২টি পাতা ঝরে যায়, পুরাতন বছর বিদায় নিয়ে নতুন বছরের নতুন ক্যালেন্ডারের প্রথম পাতায় চোখ পড়ে, তখন মানুষের মনে একটি বছর জীবন থেকে ঝরে পড়ার আফসোস দেখা দিলেও, মনে নতুন করে স্বপ্নও জাগে। জীবনগাঙে নতুন জোয়ার আসে। পেছনে ফিরে চাইলে সবকিছু মনে হয় এই তো সেদিন। স্মৃতির পাতায় বাস্তবের দূরত্ব ঘুচে যায়। স্মৃতির ফিতায় শত-সহস্র ঘণ্টার দূরত্ব নিমেষে বিন্দুতে মিশে চোখের তারায় নাচানাচি করে।
বাঙালির রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা আদায়ের মাস ফেব্রুয়ারির ইতিহাসও স্মৃতির সেলুলয়েডে মনে হয় এই তো সেদিন। অথচ ৬৭ বছরের অতীত। ছাত্র আন্দোলন, দেশজুড়ে জনতার রুদ্ররোষ। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বরকত, রফিক, শফিক, সালাম, জব্বারের ‘রক্তে রাজপথ রঞ্জিত’। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গাইতে গাইতে জীবন দানের উৎসবে হাসতে হাসতে যোগদানÑকিছুই খুব দূরের মনে হয় না।
মাতৃভাষাকে রক্ষার চেতনা বুকে নিয়ে একুশের পথ ধরে প্রবাসের এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে জন্ম নিল যে ‘ঠিকানা’Ñতাও কি খুব বেশি দিনের কথা? অথচ কেটে গেল ২৯ বছর। প্রায় তিন দশক। অথচ মনে হয় এই তো, সে দিন। এক বেপরোয়া যুবক। তারুণ্যের তেজে ‘কোনো বাধা মানব না’ প্রতিজ্ঞায় অটল। সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাধা মানে কে? একুশ মানে না কোনো বাধা। জানে না মাথা নোয়াতে। প্রবাসে স্বদেশি কমিউনিটি হাঁটি হাঁটি পা। স্বদেশ আমার। কমিউনিটি আমার। ভাই আমার। স্বজন আমার। ওদের ঠিকানা নেই। গন্তব্য অনিশ্চিত। ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ওদের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঠিকানা দিতে হবে। আলো দেখাতে হবে অন্ধকারের যাত্রীদের। বল ভরসা একুশ আর একাত্তর।
‘ঠিকানা’ এল একাত্তরের মশাল হাতে একুশের জাতক হয়ে। ’৯০-এর একুশে ফেব্রুয়ারি জন্ম নিল ঠিকানা। প্রথম সন্তানের মতো সবার ভালোবাসায় সিক্ত। কমিউনিটির বয়স বাড়তে লাগল। সবার ভালোবাসা, সহযোগিতা আর সহমর্মিতায় ঠিকানা এগিয়ে যেতে লাগল। সেই ভালোবাসা নিয়ে ৩০ বছরে পা রাখছে ঠিকানা। আজও কমিউনিটির ভালোবাসায় ধন্য ঠিকানা। ১৯৫২ সালে যেমন ছাত্র-জনতার মিলিত রক্তের দামে কেনা একুশ, তেমনি পরবাসী স্বজনের ভালোবাসার দামে ঠিকানার আজকের এই অবস্থান। সময় পাল্টেছে। প্রবাসের পরিবেশ-পরিস্থিতি পাল্টেছে। মানুষের মন-মানসিকতা, মূল্যবোধ পাল্টেছে। কিন্তু ঠিকানার প্রতি মানুষের ভালোবাসা পাল্টায়নি। বিনা মূল্যের পত্রিকার ভিড়ে সয়লাব চারদিক, দিশেহারা অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে কমিউনিটির মানুষের ঠিকানাকে মানুষ পরম আদরে, গভীর বিশ্বাসে মূল্য দিয়েই গ্রহণ করছে। এ জন্য ঠিকানা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ প্রবাসী কমিউনিটির কাছে।
তবু এর মাঝখানে ছোট্ট একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন? ঠিকানার প্রতি মানুষের কেন এই ভালোবাসা, কেন এই আস্থা! এই কেন’র উত্তরে অনেক কথা বলা যাবে। তবে প্রথম ও প্রধান কথা ঠিকানা এই ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জন করেছে কমিউনিটিকে ভালোবেসে। কমিউনিটিকে বিশ্বাস করে এবং আস্থায় নিয়ে। কমিউনিটির কল্যাণ ভাবনা থেকেই ঠিকানার জন্ম। সেই ভাবনা থেকে একটুও বিচ্যুত হয়নি আজও। সব পরিস্থিতিতে কমিউনিটির সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী ঠিকানা আজও।
ঠিকানার যত অঙ্গীকার তার পাঠকের কাছে, শুভানুধ্যায়ী সহযোগীদের প্রতি যারা শীতে, গ্রীষ্মে, বর্ষা-বাদল, তুষারপাত মহাদুর্যোগেও ঠিকানাকে ছেড়ে যায়নি। আর এই চেতনার উৎসমুখ একুশের শিক্ষা। ঠিকানা যেহেতু একুশের জাতক, তাই ঠিকানার বুকে সব সময় দেশ ও মানুষ। মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালোবেসেই ঠিকানার যাত্রা। ঠিকানা বাঙালির মহত্তম অর্জন ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত গৌরবের উত্তরাধিকার। ঠিকানা তাই সাদাকে সাদা, কালোকে কালো, সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে কোনো রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা করে না। সত্য, সুন্দর ও মানুষের ভালোবাসা ও প্রশ্রয়ে ধন্য ঠিকানা কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না। সত্য প্রকাশে সর্বদা অকুতোভয়। কোনো অপশক্তির কাছে পরাভব মানে না।
ঠিকানা ২৯ বছর অতিক্রম করে ৩০ বছরে পা রাখল। ৩০ বছর তিনটি যুগ। কত স্মৃতি, কত লড়াই-সংগ্রাম, কত হীনম্মন্য মানুষের হিংসা-পরশ্রীকাতরতা মোকাবেলা করে কত মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অকৃত্রিম আন্তরিকতা, সহযোগিতা নিয়ে বলিষ্ঠ। সবই ঠিকানার অমূল্য সম্পদ। ঠিকানাকে আরও বহু বহু দূর যেতে হবে। অসীমের পথে যাত্রা ঠিকানার। এই যাত্রায় ঠিকানা গভীরভাবে বিশ্বাস করেÑসামনে যত বাধাই আসুক, তাও অতিক্রম করে যাবে অতীতের মতোই মানুষের ভালোবাসা আর সহমর্মিতা নিয়ে। ঠিকানা হচ্ছে এই প্রবাস কমিউনিটির সব মানুষের সম্মিলিত মেধা, শ্রম আর ভালোবাসার ফসল। ঠিকানায় যারা কাজ করেছেন এবং এখনো যারা করে যাচ্ছেন তাদেরও কাজের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা কমিউনিটির সব শ্রেণির মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা।
তবে কমিউনিটির এই ভালোবাসা ঠিকানা অর্জন করতে পেরেছে কমিউনিটিকে বুঝতে পারা এবং অনুভবে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। নিরন্তর লড়াই-সংগ্রাম, নিরন্তর বোঝাপড়া, দেবে আর নেবে, নিত্য এই আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে কমিউনিটির সঙ্গে ঠিকানার সেই বোঝাপড়া আরও প্রগাঢ়, আরও গভীর এবং আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কমিউনিটির এগিয়ে চলা, সমৃদ্ধি অর্জন, সকল প্রয়াসের সঙ্গে থেকেছে এবং আজও আছে ঠিকানা। শুধু সমকালীন সময়ে নয়, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাতেও ঠিকানা বিশ্বস্ততার সঙ্গে তার জন্মের অঙ্গীকার রক্ষা করে চলেছে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষা, কমিউনিটির মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, মূলধারায় অবদান রাখাÑসব ব্যাপারেই ঠিকানা তার সহযোগিতারই হাত বাড়িয়ে দেয়। কমিউনিটিকে সব দিক থেকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালনে ঠিকানা একটুও পিছু হটে না।
সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে শুধু বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করা নয়, সত্যের মাপকাঠিতে ঠিকানা তার শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করে থাকে। ঠিকানার সাংবাদিকতায় ব্যক্তিগত রাগ-অনুরাগ, বিদ্বেষ-ভালোবাসার কোনো স্থান নেই। কোনো অপশক্তির সঙ্গে, কমিউনিটির যারা অমঙ্গল চায় তাদের সঙ্গে এক কদমে চলে না। কূপম-ূকতা, প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করে না ঠিকানা। ঠিকানা কেবল স্থানীয় বা দেশীয় সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে না। বিশ্ব পরিম-লে যেসব ঘটনা ঘটছে, যা বিশ্ব মানবতাবিরোধী, যা মানুষের শান্তি ও স্বস্তি বিনষ্ট করে, যা সভ্যতা বিনাশীÑসেসব ঘটনাবলিও মানুষকে অবহিত করে, সচেতন করে। ঠিকানা যুদ্ধকে না বলে। ঠিকানা শান্তির সপক্ষে।
এক কথায় ঠিকানা মানুষের পক্ষে, প্রকৃতির পক্ষে, সভ্যতার পক্ষে। ঠিকানা এই অঙ্গীকার থেকে কখনো এক চুল সরে যায়নি। তাই তো প্রিন্ট মিডিয়ার বিরুদ্ধে এত বড়-ঝাপ্টা, বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে বিনা মূল্যের পত্রিকার ভিড়ে ঠিকানা তার পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসার গৌরববোধ নিয়েই টিকে আছে। এবং আগামী দিনেও টিকে থাকবে বিশ্বাস রাখে। আজকের আমরা আগামী দিনের সংগ্রামে কেউ থাকি না থাকি, ঠিকানা থাকবে এবং আরও সমৃদ্ধ হবে।
ঠিকানার শুভ জন্মক্ষণে তার সব শুভাকাক্সক্ষী, শুভানুধ্যায়ী যারা ঠিকানার পাশে ছিল, আছে এবং আগামী দিনেও থাকবেÑতাদের সবাইকে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা। সবাই মিলে ভালো থাকি, সবাই মিলে এগিয়ে যাই-এটাই হোক আজকের দিনে আমাদের মিলিত প্রার্থনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here