চন্দ্র বিষয়ক কথামালা

4

আবু রায়হান : অন্যদেরকে যে জবাব দিই তাকেও তাই দিলাম। তবে এবারে বিরক্তিভাব নিয়ে নয়, মাটির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললাম, ‘করব’ (চব্বিশ বছর পর এখন আবার সেই ধরনের একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসের বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজনেরা বলেন, নিউইয়র্কের মানুষ মাগনা অনুষ্ঠানই দেখতে যায় না, আর আপনি টিকেট বিক্রি করে ইঙ্গবঙ্গের অনুষ্ঠান করবেন? আমি আগের মতোই অবিচল চিত্তে বলি, ‘করবো’)

সত্যি সত্যিই বিয়ে করব শুনে বন্ধুরা ছোটাছুটি শুরু করল। একজন বিয়ের খরচের জন্য পাঁচ হাজার টাকা যোগাড় করে দিল। আর একজন বিয়ের বাজার-সওদা করতে রংপুর শহরে যাবার তাগাদা দিল। মার্কেটিংয়ে বিশেষজ্ঞ অন্য একজন সঙ্গ নিল বাজেট ব্যালেন্স করতে। সে সারাদিন সাথে থাকবে শুনে মাথায় দুচিন্তা ভর করল। কারণ তার সাথে কথা বলতে হয় ভাববাচ্যে। হাই স্কুলে ভর্তির প্রথম দিনেই জেনেছিলাম তার প্রধান নাম দুটি। (১) আ.ক.ম আছাদুজ্জামান (২) মোঃ জানে আলম। তিন মাস পর একটি বন্ধুভাব তৈরি হলে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার ভালো নাম কোনটা, আর ডাক নাম কোনটা?’

সে চুপচাপ তাদের পারিবারিক ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করে জবাব দেয়, ‘দুটোই ভালো নাম। দুটোই ডাক নাম।’

অনেক দূরের রংপুর শহরে কেনার জিনিসের কমতি নেই। আমরা বাড়িতে ফেরার আগে শুধু বাস ভাড়া হাতে রেখে পাঁচ হাজার টাকার পুরোটাই বিয়ের পিছনে ইনভেস্ট করলাম। বড় বোন ও ভাগ্নী সেই বাজার পরীক্ষা করে হাসাহাসি শুরু করল। ভাগ্নী একে একে ভুলগুলো ধরিয়ে দিল। ১) পাত্রীর স্যান্ডেল কেনা বাদ পড়েছে, ২) বিয়ের শাড়ি কেনা হয় নি, ৩) তোমরা কি জানো বরের মাথায় দেবার জন্য টোপর লাগে?…

বুবুর ট্র্যাংক থেকে শাড়ি আর স্যান্ডেল ম্যানেজ হল। কিন্তু মাথার টোপরের কি হবে! মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ বন্ধু খবর যোগাড় করল। দশ মাইল দূরের থানাহাট বাজারে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আছে। সেখানে অনেকদিন আগে সাজিয়ে রাখা একটা বিয়ের টোপর সে দেখেছিল। তৎক্ষণাৎ আরেক বন্ধু ছুটল সেই দোকানের উদ্দেশ্যে। অনেকদিনের জমে থাকা ধুলোবালি মুছে অর্ধেক জরি খুলে যাওয়া টোপর ব্যবহার উপযোগী হলো। বন্ধু সেটা নিজের মাথায় মাপ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলÑসাইজ ঠিক আছে। কিন্তু তার মাথা আমার মাথার চেয়ে দুই সাইজ বড় ছিল। ফলে টোপর যখন আমার মাথায় স্থান পেল, দেখা গেল সেটা ‘লুজ ফিটিং’ হচ্ছে।

হাতে গোনা কয়েকজন সহপাঠী বন্ধু আর আতœীয় নিয়ে বরযাত্রী। কণ্যাপক্ষের বাড়ি দুই মাইল দূরে। সেখানে যাবার বাহন হিসেবে বন্ধুরা পাঁচটা রিকসা ম্যানেজ করেছে। আমাকে সম্মান জানিয়ে প্রথম রিক্সায় বসানো হলো। উঁচু নিচু মাটির কাঁচা রাস্তা। রিক্সা ক্রমাগত ঝাঁকি খায়। সেই ঝাঁকিতে লুজ ফিটিং টোপর ক্রমাগত নিচের দিকে নামে। পতন ঠেকানো না হলে নাকের উপরে নেমে বসে। কাউকে বুঝতে না দিয়ে কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়, তাই নিয়ে শুরু হলো টেনশন। সে রাতেও আকাশে ফকফকা চাঁদ উঠেছিল। ছোটবেলার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের সাথে সেই চাঁদও বরযাত্রী হয়ে রওয়ানা দিল। কিন্তু টোপর সংক্রান্ত সমস্যার কারণে তার দিকে নজর দেওয়া সম্ভব হলো না।

বিয়ের আসরে শ্যালিকারা নানা আবদার করছে। একজন দাবি জানাল, দুলাভাইকে টোপর মাথায় দিয়ে বসে থাকতে হবে; না হলে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না দুলাভাই কোনটা। আমি তার কথা না শোনার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি। সে একসময় বিরক্তি প্রকাশ করে গাল ফুলিয়ে চলে যায়। কিন্তু আরও বড় অপমানের আশঙ্কায় তার আবদার রাখা সম্ভব হয় না।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে রাত গভীর হলো। এবার ফেরার পালা। ততক্ষণে উঁচু রাস্তার চারপাশে জোছনার প্রখর্য আরো বেড়েছে। আমি একহাতে টোপর আগলে রেখেছি। অন্যহাতে নববধূর হাত ধরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি। নববধূ অনেকক্ষণ ধরেই ক্রমাগত কাঁদছে। তার কান্নার বিষয়টা আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলছে। অনেকদিন ধরেই দুজনে জানি বিয়ে করব। তাহলে এত কান্না কিসের। লোক দেখানো? আর যদি লোক দেখানো না হয়ে সত্যিকারের কান্না হয়, তাহলে এতবড় বেদনার উৎস কোথায়? আজন্ম চেনা আত্মার ¯¦জনদের ছেড়ে অন্য মানুষের সাথে জীবন শুরু নিঃসন্দেহে খুব কঠিন একটা কাজ। পুরুষেরা ভাগ্যবান। তাদেরকে এতবড় কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। আমার এই সব ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যায় নববধূর খিলখিল হাসির শব্দে। সে হঠাৎ তার পাগলামো হাসি শুরু করে। বহুবার এই হাসি শুনেছি। কিন্তু তাই বলে এখন এই পরিস্থিতিতে? চাঁদের কথা ভুলে গিয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। ‘কি হয়েছে তোমার, এভাবে হাসছ  কেন?’

জবাব দেবার মতো অবস্থা তার নেই। মাথার উপরের চাঁদটা যেমন বাঁধভাঙ্গা জোছনা ঢালছে, সেও তেমনি শরীর ভাঙ্গা হাসিতে চারপাশের নিস্তদ্ধতা গুড়িয়ে দিচ্ছে। আমার খুব অস্বস্তি বোধ হয়। পেছনের রিকসায় একমাত্র অভিভাবকÑবড় ভাই বসে আছেন। এই বিয়েতে তার মত ছিল না। আমার বেয়াড়াপনাকে মেনে নিয়ে নিমরাজি হয়েছে। এখন এই অস্বাভাবিক হাসি শুনে কি ভাবছেন কে জানে!

‘প্লিজ আর হেসো না। ভাই মাইন্ড করতে পারে। কি নিয়ে এত হাসছ?’

‘কেন হাসছি! হি হি হি। জানো! আমার পায়ে কোন স্যান্ডেল নেই। আমি না… হি হি হি… খালি পায়ে তোমাদের বাড়িতে যাচ্ছি। হি হি হি … হি হি হি…’

‘তোমার পায়ের স্যান্ডেল গেল কোথায়?’

‘ওরা যখন আমাকে বিদায় দিল, আমি খুব কাঁদছিলাম। কেউ একজন আমাকে স্যান্ডেল পরিয়ে দেবে না? সেদিকে কারোই খেয়াল নেই। আমি কি কাঁদব, নাকি স্যান্ডেল খুঁজব?’

একসময় রিকসা এসে বুবুর বাড়ির সামনে থামে। কেউ একজন ভিতরে গিয়ে নগ্নপদ নববধূর আবির্ভাবের কথা জানায়। বুবু বাইরে এসে সবাইকে অপেক্ষা করতে বলেন। তারপর ভিতরে গিয়ে তার বিখ্যাত ট্রাঙ্কের তালা খোলেন। বহুদিনের পুরোনো জং ধরা কব্জা মাঝরাতের নিস্তব্দতায় ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ তোলে। আমি মানসচোখে ট্রাঙ্কের ভিতরটা দেখতে পাই। সেখানে থরে থরে নতুন শাড়ি আর পুরাতন কিছু বই রাখা আছে। অনেকদিন ভেবেছি এই বইগুলো সম্পর্কে একদিন তার কাছে জানতে চাইব। কখনো সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় অনেকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে এই ট্রাঙ্ক থেকে খুচরো পয়সা চুরি করেছি। একদিন দুপুরবেলা আবারও পয়সার লোভে হানা দিয়েছি। সেদিন কোনো পয়সা পেলাম না। আঁতিপাতি করে খুঁজেও লাভ হলো না। একেবারে খালি হাতে ফেরত যাব? তাতে চৌর্য-ধর্মের অবমাননা হয় না! তড়িঘড়ি একটা বই তুলে নিয়ে হাফ-প্যান্টের আড়ালে লুকিয়ে ফেলি। তারপর গুরুজনদের দৃষ্টি এড়িয়ে বাড়ির দখিনের মেঠোপথে, দুর্বাঘাসের উপর বসে সেই বই শেষ করেছি। বইয়ের নাম ‘পাকিস্তানে দস্যু বনহুর’। সেই থেকে স্পাই থ্রিলার নামে একশ্রেণীর বইয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মালো। পরবর্তীতে গ্রোগাসে গিললাম দস্যু বাহরাম, কুয়াশা, মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা।

বুবু দুটো নতুন শাড়ি হাতে বেরিয়ে এলেন। তিনি পরম মমতায় নববধূর হাত জড়িয়ে ধরেন। ‘তুই আমার বড় আদরের ছোট ভাইয়ের বউ। তোকে জাঁকজমক দিয়ে বরণ করার সামর্থ আমার নেই।’

নতুন শাড়ি দু’টি নববধূর পথের উপর বিছিয়ে দেওয়া হয়। সে সেইপথে হেঁটে হেঁটে বাড়িতে ঢোকে। ভরা পূর্ণিমার চাঁদ অনেক উপর থেকে তাকিয়ে মানুষের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকে।

শহুরে জীবনের চাঁদ এবং হুমায়ূন আহমেদ: গ্রামের জীবন ছেড়ে শহরে পাড়ি জমানোর পর চাঁদ উচ্ছ¡াস ভাটা পড়ে। একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সোডিয়াম বাতির পরিধি পেরিয়ে চাঁদের আলো চোখের রেটিনায় আলাদা প্রভাব ফেলে না। এছাড়াও আছে বিজ্ঞাপনের আলোকদ্যুতি, যানবাহনের শব্দজট। এতসব বাধার কারণে অনেক দূরের চাঁদ, দূরে দূরেই রয়ে গেল।

ঢাকা শহর ছেড়ে নিয় ইয়র্কে আসার পর সমস্যা আরও প্রকট হলো। কাঁচ আর আলো দিয়ে তৈরি প্রকান্ড সব বিল্ডিং। সেইসব অট্টালিকার আলোর আভা সারাটা শহরকে সারাক্ষণ আলোকিত করে রাখে। নিকশ কালো অন্ধকারের জমাট বাধার সুযোগ নেই। অন্ধকারের অস্তিত্ব ছাড়া চাঁদের আলোর উপস্থিতিরও বুঝি তেমন গুরুত্ব নেই। হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোর সাথে লুকোচুরি খেলে এক চিলতে আলো যদিওবা সমতলে নেমে আসে, আমার মত ক্ষুদ্র অস্তিত্বের সাথে তার দেখা হয় না। ফলে এক সময়ের চাঁদের আলোর নিয়ন্ত্রাধীন জীবন পুরোপুরি বৈদ্যুতিক আলোর আয়ত্বাধীন হলো।

অনেকদিন পর, আমার ইমিগ্রান্ট শহুরে জীবনের সাথে চাঁদের আলোর যোগাযোগ ঘটিয়ে দিলেন বরেণ্য সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা ভাষার আর কোনো লেখক জোছনা নিয়ে এত বেশি ঘাটাঘাটি, মাতামাতি করেছেন বলে আমার জানা নেই।

জোছনা প্রকৃতি থেকে পাওয়া এক অমূল্য উপহার। সেই উপহারকে যেনতেন ভাবে গ্রহণ করা ঠিক না। তার জন্য দরকার বিশেষ আয়োজন। তার সৃষ্ট হিমু চরিত্রের মাধ্যমে তিনি এই বিশেষ আয়োজনগুলো জানিয়ে দিলেন।

বালির মধ্যে গলা পর্যন্ত গর্ত খুঁড়ে শরীরের কাপড়-চোপড় বিসর্জন দিয়ে সেই গর্তে নামতে হবে। তারপর গর্তে বালি ভর্তি করে নিজের চড়াচড়া করার পথ বন্ধ। শুধু মাথাটা গর্তের বাইরে থাকবে। এই অবস্থায় বসে জোছনা দেখতে হবে।

১.সারাদিন না খেয়ে থাকতে হবে। সন্ধের পর ক্ষিদেয় যখন শরীর ঝিমঝিম করবে তখন বনের ভিতর ঢুকুন। গাছপালার ভিড়ে একটি খোলা জায়গা বেছে নিয়ে অপেক্ষা করুন। পূর্ণিমার চাঁদ মাথার উপরে এসে যখন রাশি রাশি আলো ছড়াবে, তখন হাত বাড়িয়ে মুঠো ভর্তি জোছনা ধরে খেয়ে ফেলুন।

সুযোগ পেলেই তিনি বিভিন্ন জাতি ও উপজাতীয় জীবনে চাঁদের আলোর প্রভাব সম্পর্কে বলেছেন। তাদের সংস্কৃতিতে প্রচলিত নানাবিধ প্রবাদ বাক্যের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। প্রকৃতিতে চাঁদের আলোর অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন বইয়ে আলোচনা করেছেন। তার লেখা কিছু সায়েন্স ফিকশনও এই প্রভাবের বাইরে নয়। তার তৃতীয় প্রকাশিত  বইয়ের নাম ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’। এটি ছিল প্রথম সায়েন্স ফিকশন। এই বইয়ে অনেকবার চাঁদের প্রসঙ্গ এসেছে। বইয়ের প্রধান চরিত্র মহামতি ‘ফিহা’ জোছনার আলোয় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি আততায়ীর উদ্দেশ্যে শেষ বাক্যটি বলেন, ‘দেখো দেখো, কি   চমৎকার জোছনা হয়েছে।’ তারা তিনজন, ইরিনা, অনন্ত নক্ষত্র বীথিÑ বইগুলোতে ঘুরে ফিরে জোছনার প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। ‘মানবী’ নামক বইটিতে তিনি মহান গায়ক আহানের প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছেন। যার কাজ হল চন্দ্র নিয়ে বিষাদগীতি গেয়ে দুঃখী মানুষের মন তৃপ্ত করা। ‘হে চন্দ্র! তুমি আমাকে তোমার কাছে টেনে নাও। তোমার শীতল শরীর স্পর্শ করতে দাও। আমি তোমার স্পর্শের বাইরে কখনো থাকব না। তোমাকে ভিজিয়ে রাখব অশ্রæজলে।’ চাঁদ এবং চাঁদের আলো নিয়ে রচিত এইসব গানের নাম দিয়েছেন চন্দ্রগীতি। এই চন্দ্রগীতি শব্দটি আমার এত বেশি ভালো লেগে যায় যে, আমার লেখা একটি গানে শব্দটি ব্যবহার করার লোভ সামলাতে পারিনি।

ছোট বেলায় ছিল খেলা চাঁদের সনে

চাঁদ লুকাতো মাঝে মাঝে মেঘের বনে

তুমিও তখন হারিয়ে যেতে

চন্দ্রগীতে চমকে দিতে

হেথায় হোথায় সেথায় খুঁজি

কোথায় তোমায় পাই

তোমার দেখা নাই রে তোমার দেখা নাই …

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে… যৌবনে কেউ মরতে না চাইলেও একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর সবাই সেই প্রস্তুতিই নিতে থাকে। অনেকে বিভিন্ন লগ্নে মৃত্যুর আশাবাদও ব্যক্ত করে। এ পর্যন্ত যত ধরনের আশাবাদ শুনেছি, তার সবই ধর্মভিত্তিক। আল্লাহ যেন শুক্রবারে মরণ করেÑকবরের আযাব মাফ পাওয়া যাবে। কারও কারও মৃত্যুর আকাঙ্খা রমজান মাসে। শবে বরাতের রাতে, শবে কদরের রাতে। কেউ মরতে চান মক্কায় হজ্ব করতে গিয়ে। কারও বা ধর্মযুদ্ধে গিয়ে শহীদ হবার আশা … হুমায়ূন আহমেদ এর কোনোটিই চাননি। তিনি মরতে চেয়েছিলেন ফিনিক ফোঁটা জোছনা রাতে। এই নিয়ে গানও লিখেছেন-

ও কারিগর দয়ার সাগর ওগো দয়াময়

চান্নিপসর রাইতে যেন আমার মরন হয়।

সাধারন পাঠকের ক্রয় ক্ষমতা ও পড়ার ধৈর্যের প্রতি খেয়াল রেখে তিনি খুব বেশি বড় বই লিখেন নি। তার সবচেয়ে ভারী বইটির নাম জোছনা ও জননীর গল্প। জীবনের সব থেকে বড় কাজ করার সময়ও তিনি চাঁদের আলোর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেন নি। বইয়ের নামের সাথে তাকে জড়িয়ে রেখেছেন।

চান্নি পসর রাতের শেষ প্রহরে : শহীদ ভাই, সেমন্তিরা চলে গেছে অনেক আগেই। ঝুপঝুপ বৃষ্টিও থেমে গেছে। ছেঁড়া ফাড়া মেঘের খন্ড সরে গিয়ে পরিষ্কার আকাশ। সেই আকাশে প্রকান্ড থালার মতো ঝকঝকে চাঁদ উঠেছে। ইস্ট রিভারের তীরে আমার বাড়ির জানালায় জোছনার উঁকিঝুঁকি। জানালার পর্দা সরিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি। বছরের সব চেয়ে বড় চাঁদ কিনা বুঝতে পারছি না। তাতে কিছু আসে যায়ও না। আমার ছোটবেলার চাঁদটাকে এখানে, নিউ ইয়র্কের আকাশে দেখতে পেয়েই আমি খুশি। হঠাৎ ভাবনার সূতো ছিড়ে যায়। তেইশ বছর আগের ‘পূর্ণিমা রাতের নববধূ মাধুর্যহীন গলায় রাতের নিস্তব্দতা ভাঙ্গে।

‘জানালার কাছে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে কি করছ?’

‘চাঁদ দেখছি।’

‘য়্যাহ্… বুড়ো বয়সে চাঁদ দেখা! বিছানায় এসে শুয়ে পড়। সকালে কাজে যেতে হবে না?’

বুড়া বয়সে চাঁদ দেখছি! সত্যি সত্যিই বুড়া হয়ে গেলাম নাকি।  তা কি করে হয়। মানুষের একটা জীবন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়! মনে হচ্ছে এইতো সেদিন, ঘাড়ে বাজারের ব্যাগ নিয়ে প্রাণপণে ছুটছি। চাঁদটাকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবার ইচ্ছে। শেষ রাতের ধবল জোছনায় ঘুমঘুম চোখে, হাতে মায়ের আঁচল জড়িয়ে রেখে বাথরুম করছি। তারপর, একদিন ভরা পূর্ণিমায় চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকার ইচ্ছে হলো। জীবনে চাঁদমালা এল। তখন চাঁদ আর চাঁদমালাÑদুটোকেই বড় আপন মনে হতো। একদিন চাঁদমালা হারিয়ে গেল। অন্য একদিন, আমি চাঁদের কথা ভুলেই গেলাম। সে সব কতকাল আগের কথা। আজ শুনছি আমি নিজেই  ফুরিয়ে গেছি। কিন্তু চাঁদটা আগের মতোই চির যৌবনা, ঝলমলে। আগামী অনেক অনেক দিন তাকে ঘিরে স্বপ্ন রচনা হবে। জোছনায় তাড়িত হয়ে নতুন কিশোর দৌড়ের পাল্লা দেবে। চাঁদনী রাতে চাঁদমালা ফুলের পাপড়ি ঝলমলিয়ে উঠবে। যুবতী চাঁদমালা চোখের মনি নাচিয়ে আমন্ত্রণ জানাবে। আবার একদিন খুব ¯¦াভাবিকভাবে দূরেও চলে যাবে। আড়ালে বসে থেকে কোনো এক মহা কারিগর যে খেলার আয়োজন করে রেখেছে, সে খেলা চলতেই থাকবে… নিরন্তর।

‘আজকে পিতা কাল পুত্র পরশু আসবে নাতি

জীবন তাঁতের সুতোয় বোনা আমরা মানুষ জাতি

নেইতো ওগো শুরু মোদের নেইতো কোনো ক্ষয়

এ জীবনে কিছুই ওগো শুরুও নয় শেষও নয় …

(গৌরি প্রসন্ন মজুমদার)’  ।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here