আমাদের আঁতলামি

1

চিররঞ্জন সরকার : বাঙালির কিছু কিছু সহজাত প্রবৃত্তি আছেÑ এই যেমন, বাঁশ দেওয়া, কাঁকড়াপনা, অন্যের ভালো দেখলে চুলকানি, আঁতলামি। ইদানীং আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেড়েছে আঁতলামি আর মাতলামি। মাতলামি বাড়ার পেছনের কারণটা না হয় বোঝা যায়, কিন্তু আঁতলামির কারণ কি? সবাই সব ব্যাপারে শেষ কথা বলে দিচ্ছেন, মূল্যায়ন ও বিশেষণ করছেন। নানা ধরনের দর্শন ঝেড়ে দিচ্ছেন। নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিচারকে একমাত্র ধ্রুবজ্ঞান করে অন্য সবার সব মতকে বাতিল করে দিচ্ছেন। অপরকে তুলাধুনা করছেন। নতুন নতুন মতো গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল আর ফেসবুকের কল্যাণে আঁতলামির প্রবণতাটা ক্রমেই বাড়ছে। কেন এই প্রবণতা? বিষয়টি একটু সবিস্তারে আলোচনা করা যাক।
প্রথমেই আঁতেল বা আঁতলামি শব্দের মানেটা একটু জেনে নেওয়া যাক। ফরাসি ঘ্রাণমিশ্রিত এই শব্দটির উৎপত্তি সম্ভবত : ‘ইন্টেলেকচুয়্যাল’ থেকে। সাধারণত সেই ব্যক্তিকে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলা হয় যে কি না কোনো বিষয়ে একই সঙ্গে ‘জ্ঞানী ও পারদর্শী’। তবে কথ্য ভাষায় আঁতেল শব্দটি নেতিবাচক বা নিন্দার্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ একজন আঁতেল যে-বিষয়ে সে জানে না সে-বিষয়েও সে তার পাণ্ডিত্য জাহির করতে চায়। আঁতেল-এর কাজকে বলে আঁতলামি। আঁতেল শব্দটি নাম-বিশেষণ আর এর ক্রিয়ারূপ হলো আঁতলামি।

আঁতেল শব্দটি মূলত বিশেষণ হলেও এর সঠিক ও সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা এখনও নির্ণয় করা যায়নি। কিন্তু এর লক্ষণগুলো বিশ্লেষণ করলে এই বিশেষণটি নিন্দাবাচক না প্রশংসাবাচক সেই বিষয়েই প্রাথমিকভাবে একটি সংশয়ের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও (আপাতদৃষ্টিতে) একেবারেই নির্দোষ কিছু বিষয়ও ক্ষেত্রবিশেষে আঁতেলের লক্ষণ বলে গণ্য হয়। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্বচ্ছ হবে। দেখা গেছে কোনো ব্যক্তি অল্পবয়সে চশমা ধারণ করলে এবং সেই চশমার দরুন তার চেহারায় একটি বিশেষ মাত্রা যুক্ত হলে পারিপার্শ্বিক জনগণের চোখে সেই ব্যক্তি অনেক সময়ই আঁতেল নামে চিহ্নিত হয়ে থাকেন। যেহেতু দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই কোনো ব্যক্তি চশমা ধারণ করে থাকেন এবং চশমা ব্যবহার করা একেবারেই একটি নিরপরাধ বিষয়, তাই চশমাধারীকে আঁতেল নামে অভিহিত করার কোনো যথার্থ কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

আবার কিছু বিশেষ পোশাক যেমন খদ্দরের পাঞ্জাবি, শান্তিনিকেতনি ঝোলা (পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য), পুরুষের লম্বা চুল ও দাড়ি প্রায়শই আঁতেলের লক্ষণরূপে গণ্য হয়। তবে পোশাক ও সাজসজ্জা সম্পর্কিত এইসব বাহ্যিক লক্ষণগুলো আঁতেলশ্রেণিকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্র একেবারেই গৌণ। একজন ব্যক্তির আচরণ ও ব্যক্তিত্বের কিছু বৈশিষ্ট্যই তাকে আঁতেল হিসেবে চিহ্নিত করে। অতিমাত্রায় বুদ্ধিহীন ব্যক্তি কখনোই আঁতেল শ্রেণিভুক্ত হতে পারেন না। বরং আঁতেলরা অতিবিজ্ঞতার অভিযোগেই অভিযুক্ত হয়ে থাকেন। অর্থাৎ সর্বসাধারণের পক্ষে বোধগম্য নয় এমন বিষয় আঁতেলদের কাছে অত্যন্ত উপাদেয় বলে গৃহীত হয়। পক্ষান্তরে সাধারণভাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় কোনো বস্তু ও বিষয় আঁতেলগোষ্ঠীর কাছে নিতান্ত আকর্ষণহীন ও অপাংক্তেয় হিসেবে বিবেচিত হয়। সংক্ষেপে বলা যায় আপাত কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়ে সবিশেষ আগ্রহ ও জ্ঞান এবং সেই জ্ঞানের উদ্দেশ্যমূলক প্রদর্শন আঁতেলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য হয়ে থাকে। যেহেতু বোধগম্যতার পরিধি অনুসারে ‘দুর্বোধ্যতা’র সংজ্ঞা মানুষে মানুষে পরিবর্তিত হয়, তাই কোনো ব্যক্তির আঁতেল পদবাচ্য হওয়াও একটি নেহাৎই আপেক্ষিক ঘটনা।

সেই বিবেচনায় কোনো ব্যক্তির আঁতেল হিসেবে অভিহিত হওয়া একটি উভয়মুখী প্রক্রিয়া যা দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। সাহিত্যিকের কাছে সাহিত্য সমালোচকরা আঁতেল। কৃষক-শ্রমিকের চোখে বুদ্ধিজীবীরা আঁতেল। রাজনীতিবিদদের কাছে টকশোজীবীরা আঁতেল। ফেসবুকে যে আপনার পোস্টে লাইক-কমেন্ট না দিয়ে সমালোচনা করে সে আঁতেল বুদ্ধিজীবী বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ শব্দটির অপভ্রংশ এই আঁতেল শব্দটি আমাদের সমাজে আমদানি হয় পঞ্চাশের দশকে একদল শহুরে বুদ্ধিজীবীর মাধ্যমে। এরা নিয়মিত বিভিন্ন স্থানে আড্ডায় মিলিত হতেন, পাঞ্জাবি পরতেন, নিজেদের মনে করতেন ‘আমরাই সেরা’। এইসব বুদ্ধিজীবীকে দেখে অন্যদের বিদ্রুপ এবং প্রতিক্রিয়াতেই ‘আঁতেল’ শব্দটির প্রয়োগ শুরু।

অনেকে এই আঁতেল বিশেষণটা উপভোগও করেন। আঁতেল ট্যাগের সংরক্ষণ করতে অনেকে ‘আঁতেল মার্কা’ কথাও বলেন।” স্ট্যাটাস আপডেটের মতো ট্যাগও আপডেটেড রাখেন। তবে শুধু বর্তমানেই নয়, মহাভারতের সময়ও আঁতেলরা ছিলেন। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি কর্ণকে আঁতেল বলেছেন। কর্ণের ‘আমি সব পারি’ মানসিকতাকে তিনি বলেছেন আঁতলামি। কর্ণের আচরণে অহংবোধ প্রকাশ পায়। যুদ্ধক্ষেত্রে দুঃশাসনের মৃত্যু হয়েছে, কর্ণ কিন্তু কিছুই করতে পারেন না। অথচ দুর্যোধনকে অভয় দেন চিন্তা না করতে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির মতে, আজকের দিনে দাঁড়িয়েও বোঝা যায়, জ্ঞান পরিপূর্ণ নয় যেখানে, সেখানেই থাকে ওপরচালাকির প্রবণতা। তাই ধীরে ধীরে আঁতেল শব্দটির অর্থও আমাদের কাছে বদলে গেছে।

আমাদের সকলেরই তো ‘ইনটেলেক্ট’ আছে। তাই সবাই আঁতেল। নিজেকে আঁতেল ভাবলেই আঁতেল। না ভাবলে নয়। আমরা অনেকেই সাহিত্য চর্চা করি। সিনেমা দেখি। নাটক দেখি। তা নিয়ে আলোচনাও করি। আমাদেরও কেউ আঁতেল বললে, বলতে পারে। না বললেও কিছু যায় আসে না।

আঁতেল কথাটি সাধারণভাবে নিন্দার্থে ব্যবহৃত হলেও এটি ঠিক সর্বাঙ্গীনভাবে নিন্দাবাচক বিশেষণ নয়। যেসব গুণাবলি থাকলে একজন ব্যক্তি আঁতেল হয়ে ওঠেন, সেগুলো আসলে ক্ষতিকর বা অন্যায় কিছু নয়, নির্দোষ রুচি, অভ্যাস বা আচরণমাত্র। তাই একজনকে মিথ্যাবাদী বা বিশ্বাসঘাতক বললে যেরকম নিন্দা বোঝায়, আঁতেল বললে ঠিক সেই পর্যায়ের নিন্দা বোঝায় না। কাউকে আঁতেল বলে উল্লেখ করার মধ্যে বক্তার একটি সূক্ষ¥ অসূয়াবোধ বা অপারগতা প্রকাশ পায়। কোনো অপরূপ সুন্দরী নারীর সৌন্দর্যের গৌরবকে খর্ব করার জন্য যেমন তার আচরণের মধ্যে দম্ভ বা অহমিকার পরিচয় খোঁজা হয়, তেমনি যখন কোনো ব্যক্তির কথা যুক্তি দ্বারা খণ্ডন করা যায় না, আবার গ্রহণ করাও যায় না, এবং মনে হয় ওই ব্যক্তি যোগ্যতার অধিক গুরুত্ব পেয়ে যাচ্ছেন, তখনই তাকে আঁতেল অভিধাযুক্ত করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে বক্তার এক ধরনের অহমিকার তৃপ্তি হয়ে থাকে। ইংরেজি বাক্যালাপে অপটু ব্যক্তির কাছে অনর্গল ইংরেজিতে কথাবার্তা চালানো যেমন আঁতেলের লক্ষণ, আবার কেউ অনর্গল শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে চললেও তা আঁতলামির পরিচয় বলে প্রতিভাত হতে পারে। অথচ শুদ্ধ বাংলা বা ইংরেজিতে বাক্যালাপ কখনোই দূষণীয় বা নির্দনীয় কোনো অভ্যাস নয়। দেখা গেছে, কোনো ব্যক্তি পরিস্থিতি বিশেষে কোনো অভ্যাসকে আঁতলামি বলে চিহ্নিত করলেও সুযোগ পাওয়া মাত্রই সেই গুণটি আয়ত্ত করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। এসব দিক বিচার করে বলা যায় আঁতেল কথাটি এমন একটি নিন্দাবাচক শব্দ যা যিনি আরোপ করেন তিনি নিন্দার্থে ব্যবহার করলেও যার উদ্দেশ্য ব্যবহার করেন, তিনি ততটা নিন্দিত বোধ করেন না বা বিশেষ লজ্জিত হয়ে ওঠেন না।

তবে বর্তমানে আমাদের সমাজে আঁতেল শব্দটি শ্লেষ বা বিদ্রুপার্থেই প্রয়োগ হয় বেশি। কারও কারও মতে, আঁতেলরা কোনো কাজ করে না। সমাজের আলোড়িত মুহূর্তগুলো তারা ঘরের কোণে কাটায়, বিপ্লবের মুহূর্তগুলো ঘুমিয়ে কাটায়। এবং বিপ্লব ও আলোড়ন সমাপ্ত হলে তারা নাক উঁচু করে বিভিন্ন তত্ত¡ কপচায় আর বিশ্লেষণের নামে দুর্বোধ্য-অবোধ্য সব যুক্তির আবর্জনা তৈরি করে।

একটা সময় পর্যন্ত বিউটি বোর্ডিং, বেইলি রোড, বইমেলা, শাহবাগ ছিল আঁতেলদের আড্ডার জায়গা। এরপর হরেক রকমের পানশালা ও কফিশপ তার জায়গা নিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। তুমুল তর্ক-বিতর্ক। দেশ, সমাজ, শিক্ষা, রাজনীতি, বাজেট, অস্কার, সিরিয়া, পাক-ভারত, ওয়াল স্ট্রিট, ট্রাম্প, আফগানিস্তান, কিছুই বাদ থাকে না। সব বয়সীরাই আড্ডায় আসতে পারে। সময়ের কোনো সীমা নেই। কতক্ষণ আড্ডা চলবে কে জানে।

এখন এসব আড্ডা এসে ভিড় করেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, ফেসবুকে। সবাই সব-জান্তা শমসের হয়ে বসে আছে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা বছরের ৫২ সপ্তাহে নিরন্তর মত প্রদান চলছে। কেউ কারো মতের তোয়াক্কা করছে না। প্রত্যেকে প্রত্যেকের চেয়ে ভালো বুঝছে এবং বেশি বুঝছে। যত মাথা তত মত। এই যে ভিন্নতা এবং আলাদা আলাদা মত-এটাই এখন আঁতলামি পুনশ্চ আঁতলামি সম্পর্কে একজন নতুন এক তত্ত¡ দিয়েছেন। তত্ত¡টি বেশ মজার।

তত্ত্বটি হচ্ছে :
যদি আমিও জানি/পারি, তুমিও জান/পার : তা ভালো
যদি আমিও জানি না/পারি না, তুমিও জান না/পার না : তাও ভালো
যদি আমি জানি/পারি, তুমি জান না/পার না : তা সবচেয়ে ভালো
যদি আমি জানি না/পারি না, কিন্তু তুমি জান/ পার : তাহলেই তুমি আঁতেল

লেখক : রম্যরচয়িতা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here