অবাক বিস্ময়ের বাংলাদেশ

3

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, “বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তুমি দেখে যাও, তোমার আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে আজ সাত কোটি বাঙালি যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এ দেশ স্বাধীন করেছে। হে বিশ্বকবি তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালির বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।” বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ, বিদ্রোহী কবি নজরুল এবং রাজনীতির মহান কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আজ নেই। কিন্তু থেমে নেই, সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার বাংলাদেশের রচনা। বিশ্বের স্বনামধন্য নেতৃত্ব-ব্যক্তিত্ব, গবেষণা সংস্থার তথ্য-তত্ত¡, স্বীকৃতি-বিবৃতি এবং শেখ হাসিনার সম্মোহনী নেতৃত্ব অগ্রণী ভূমিকা রাখছে অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশের পঙ্ক্তিমালায়। বিশে^র মানচিত্রে বাংলাদেশের যখন অভ্যুদয় হয়, তখন ৮৫ শতাংশ মানুষ ছিল দরিদ্র। বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ (বিবিএস জরিপ ২০১৬)। ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ও ইনডিকেটর’ অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত জীবনমান ও আয়ু বেড়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থানও এগিয়েছে তিন ধাপ। গত ১০ বছরে উন্নয়নশীল দেশের মানদণ্ড পূরণ করেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতির আকারের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৪৩তম আর ক্রয়ক্ষমতায় বিশে^র ৩৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রাইসওয়াটারকুপারহাউজ (পিডব্লিওসি)-এর মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৮তম বড় অর্থনীতির দেশ; ২০৫০ সালে আরও পাঁচ ধাপ এগিয়ে আসবে ২৩ নম্বরে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চের (সিবিআর) প্রতিবেদন ২০১৯ বলছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫টি বড় অর্থনীতির দেশের একটি। অর্থনীতির মানদণ্ডে ইতোমধ্যে ১২টি দেশকে টপকে গেছে বাংলাদেশ এবং আগামী ১৫ বছরে টপকে যাবে আরও ১৭টি দেশ। ২০৩৩ সালে বাংলাদেশের পেছনে থাকবে মালয়েশিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, যদি দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যেত তা হলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হতো। জনগণের শান্তি-স্বস্তি, আদর্শ ও মূল্যবোধ আরও মজবুত হতো। নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮ ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করার কথা বলেছেন।

নির্বাচনের আগে রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে একজন তরুণের দুর্নীতিবিষয়ক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এটা আমার লক্ষ্য আছে। আমি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এরপর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি নিজ কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘যদিও কোনো দেশের পক্ষেই শতভাগ দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়, আমাদের সরকারের একটা দায়িত্ব হলো এই দুর্নীতি প্রতিরোধ করা, যাতে এটি দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে এবং আমাদের সব সাফল্য ম্লান করে না দেয়।’ ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি নির্মূল করতে পারলে জিডিপি ২ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে।’ ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দুর্নীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সর্বস্তরের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে জানিয়ে বলেছেন, ‘দুর্নীতি বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ২ থেকে ৩ শতাংশ গ্রাস করেছে।’ এক যুগ আগেও বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের প্রায় শীর্ষ স্থানে ছিল। গত এক দশকে ধীরে ধীরে সে অবস্থান থেকে কম দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ।

‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস’-এর ২০১৭ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সৎ পাঁচজন সরকারপ্রধানের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে। প্রতিবেদনে জানা যায়, ‘বাংলাদেশের বাইরে শেখ হাসিনার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। বেতন ছাড়া শেখ হাসিনার সম্পদের স্থিতিতে কোনো সংযুক্তি নেই। বাংলাদেশের ৭৮ শতাংশ মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনা সৎ এবং ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে।’ শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ করে সফলতা অর্জন করেছেন। তার উদ্যোগ, সাহস ও প্রেরণায় দেশের অর্থে নির্মিতব্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্নকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। ‘শেখ হাসিনা’র আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকারপ্রধান ‘সততার টাইটেল’ বা ‘সৎ শাসক’-এর স্বীকৃতি পাননি। বরং শেখ হাসিনার নিয়মানুবর্তিতা, জীবন-দর্শন-আদর্শ ও ব্যক্তিগত সংস্পর্শে অনেক নেতাকর্মী, আমলা সৎ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়েছেন। বিশ^সেরা পাঁচজন কর্মঠ এবং পরিশ্রমী সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের তালিকায় পঞ্চম স্থানে অবস্থানকারী শেখ হাসিনা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকারপ্রধান, চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী ও ৩৮ বছর ধরে দীর্ঘমেয়াদি দলীয়প্রধান হওয়ার অভূতপূর্ব গৌরব অর্জন করেছেন তিনি।

চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব, যেন সারাবিশ্ব বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে বাংলাদেশের দিকে। এটাই আমার চাওয়া, আর কিছু না।’ নারী শিক্ষা ও উন্নয়নে বিশেষ অবদানে ইউনেস্কো ‘শান্তিবৃক্ষ’ পুরস্কারে ভূষিত শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ঐতিহাসিক সমুদ্র জয়ের কারিগর ডা. দীপু মনিসহ অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বকে মন্ত্রিপরিষদে সহযোদ্ধা করেছেন। ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস’-এর ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে, সৎ সরকারপ্রধানের তালিকায় শেখ হাসিনা তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও তার সরকারের বিরুদ্ধে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।

আশার কথা, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের অনেক ব্যক্তিত্ব ইতোমধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। এসব কারণে ‘সৎ প্রধানমন্ত্রীর মতো’ সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার নতুন মন্ত্রিপরিষদও যদি ‘সততার সরকারের দৃষ্টান্ত’ স্থাপন করতে পারে, তা হলে ‘অবাক বিস্ময়ের বাংলাদেশ’ হবে শতভাগ পরিপূর্ণ। ইতিহাস, প্রেরণা ও চেতনায়- কায়মনোবাক্যে করি প্রার্থনা।

লেখক : জেন্ডার, স্থানীয় সরকার ও উন্নয়ন গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here