অগ্নিঝরা মার্চ এবং ভারত-পাকিস্তান সংকট

9

অগ্নিঝরা মার্চ। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত মাস মার্চ। ৭ই মার্চ, সেই অমোঘ ভাষণ, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২৫মার্চ কালরাত্রি। ১৭ই মার্চ জাতির জনকের ৯৯তম জন্মজয়ন্তী। ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু‘র স্বাধীনতা ঘোষণা। স্বাধীনতার এ মাসে জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। এটিও সত্য যে, বঙ্গবন্ধু বাংলার মাটিতে নৃশংসভাবে সপরিবারে নিহত হয়েছেন, কতিপয় বেঈমান বাঙ্গালী তাকে হত্যা করেছে। বাংলাদেশের মাটিতে সবচেয়ে যে ভারী লাশ শায়িত আছেন, তিনি বঙ্গবন্ধু।

ঠিক এই সময়েই বই প্রেমিক পলান সরকার মারা গেলেন। প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব, রাষ্ট্রপতির সাবেক প্রেস সচিব মুক্তিযোদ্ধা রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী চলে গেলেন। তার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য হয়েছে। দু’জনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। চকবাজারের আগুন নিভেছে, নিউজ নিভুনিভু। তবে কাওরান বাজারে আবার আগুন লেগেছে। বিমান ছিনতাই নাটকের যবনিকা ঘটেছে, আর কখনো জানা যাবেনা, আসলে কী ঘটেছিলো। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা সবকিছু ছাপিয়ে মিডিয়ায় জায়গা করে নিয়েছে।
ওবায়দুল কাদের অসুস্থ। তার হার্টে তিনটি ব্লক ধরা পড়েছে। তাকে সিঙ্গাপুর নেয়া হয়েছে।
তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে হয়তো অনেক কথা বলা যায়, আপাততঃ থাক। বন্ধু-সহকর্মী পিআইবি’র শাহ আলমগীর মারা গেছেন, আমরা জানলামই না। কখন অসুস্থ হলেন, কখন কী ঘটলো যখন জানলাম, তখন সবকিছু শেষ? যেখানেই থাকো, ভালো থেকো বন্ধু। ক’দিন আগে আমানুল্লা কবির মারা গেলেন, তাঁর আত্মা শান্তিতে থাক, মিটিংয়ে বসে একটু ঝিমিয়ে নেয়া তার অভ্যাসের কথা অবশ্য ভোলার নয়।
বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমে নাকি পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন ভারী। কেউ কেউ জেনারেল নিয়াজির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অন্যরা বলেছেন, সমর্থনটা পাকিস্তানকে নয়, মুসলিম উন্মাহ ও ধর্মীয় কারণে। হতে পারে, কিন্তু ভারত-পাকিস্তান সঙ্কটে আমাদের পাকিস্তানের পক্ষে থাকার কোন যৌক্তিক কারণ নেই? এই মার্চ মাসে আমরা পাকিস্তানকে সমর্থন করি কি করে? বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে চুপচাপ থাকতে পছন্দ করছেন। অবস্থা এমন নয় যে, আগ-বাড়িয়ে কথা বলতে হবে? সুখের বিষয়, উত্তেজনা হয়তো প্রশমিত হচ্ছে। যুদ্ধ কেউ চায়না, ভারতের ওপর এই যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো।

রোববার ৩রা মার্চ ২০১৯ জাতিসংঘের সামনে ভারতীয়দের একটি সমাবেশ ছিলো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। বেশকিছু বাঙ্গালী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমি সেখানে বলেছি, একজন বাংলাদেশী আমেরিকান হিসাবে আমরা এই সঙ্কটে ভারতের পক্ষে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। ভারত আমাদের ১৯৭১-এ সর্বতোভাবে সাহায্য করেছে স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে, আমরা কৃতজ্ঞ। পাকিস্তান জঙ্গী রাষ্ট্র, আমরা জঙ্গিবাদের বিপক্ষে এবং তাই ভারতের পক্ষে। পুরো বিশ্বের উচিত পাকিস্তানকে নিন্দা জানানো এবং একঘরে করা যাতে পাকিস্তান সন্ত্রাসে মদদ দেয়া বন্ধ করে।

এবার ভারত-পাকিস্তান সংকটের কারণ পুলওয়ামায় আত্মঘাতী বোমায় ভারতের ৪০জন আধা-সামরিক জোয়ানের মৃত্যু। জৈশ-ই-মোস্তফা এর দায়িত্ব স্বীকার করেছে। শোনা যাচ্ছে, এই সংগঠনের প্রধান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী মাওলানা মাসুদ আজাহার মারা গেছেন বা তাকে বন্দী অবস্থায় মেরে ফেলা হয়েছে। হিন্দুস্থান টাইমস বলছে, মাসুদ পারভেজ মৃত্যু’র গুজব আছে, নিশ্চিয়তা নেই? পত্রিকার মতে, ভারতীয় বোমায় তিনি আহত হ’ন, পরে তার মৃত্যু ঘটে। বিন লাদেন পাকিস্তানের আশ্রয়ে ছিলেন, আমেরিকা গিয়ে মেরে এসেছে। ভারত সম্ভবত: একই কাজ করতো। পাকিস্তান এতকাল মাওলানা মাসুদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী চাপ ছিলো তাকে ফেরত দেয়ার জন্যে। তাকে মেরে পাকিস্তান চাপ মুক্ত হলো? মাওলানা মাসুদ পাকিস্তান সরকার এবং আইএসআই এর কাছে বোঝা হয়ে গিয়েছিলেন, তাই তার মৃত্যু অবধারিত হয়ে উঠেছিলো।

তবে পাকিস্তান একজন ভারতীয় বৈমানিককে ফেরত দিয়েছে, পাক-প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বারবার মোদির কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, ‘শান্তিকে আর একবার সুযোগ দেয়া হোক’। এগুলো ভালো। এজন্যে ইমরান খানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ার জন্যে কিছু লোক প্রচারণা চালাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মাটি থেকে ৯৩০০০ পাকিস্তানী সৈন্যকে ফেরত দেয়া হলো, সেজন্যে ‘বাংলাদেশ-ভারত’ বা ‘বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা গান্ধী’-কে যৌথ নোবেল দেয়া যেতে পারতো, তা দেয়া হয়নি, দাবিও ওঠেনি, এখনো নয়? পাকিস্তান প্রেমিকদের জন্যে দুঃসংবাদ হচ্ছে, মোদির আলটিমেটামের প্রেক্ষিতে ক্রিকেটার ইমরান খানের আর কোন উপায় ছিলোনা। যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে যেতো। ফলাফল কি হতো সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু একাত্তরের পর এই প্রথম বিশ্ব দেখলো, পাকিস্তান ভীত-সন্ত্রস্ত।

-নিউ ইয়র্ক, ৩ মার্চ ২০১৯।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here