পাক-ভারত যুদ্ধ উন্মাদনা

4

বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারত এবং দূরবর্তী আঞ্চলিক প্রতিবেশী পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের যে দামামা বেজে উঠেছিল হামলা-পাল্টা হামলার কারণে, সেই দামামা আপাতত শান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানে আটক ভারতীয় বিমান সেনা উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে ভারতের কাছে ফেরত দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
হ্যাঁ, দুই শত্রুপ্রতিম দেশের মধ্যে উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমেছে, তবে একেবারে অবসান ঘটেছে, এমনটা বলা যাবে না, ভাবাও যাবে না। উত্তেজনা সাময়িক থেমেছে, আশঙ্কা এবং আতঙ্ক দূর হয়নি। দুই দেশের মধ্যে সাময়িকভাবে শুভবুদ্ধির উদয় হলেও আবারও গোলাগুলিতে উভয় পক্ষে ইতিমধ্যেই কয়েকজন হতাহত হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল নেতাই আলোচনার মধ্য দিয়ে ভারত-পাকিস্তানকে তাদের সংকটমুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান কতটা ফল দেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তান দুটি দেশই স্বাধীনতা অর্জন করে ব্রিটিশ বেনিয়াদের ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে। পাকিস্তান স্বাধীনতা পায় এক দিন আগে ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট। ভারত স্বাধীন হয় এক দিন পর ১৫ আগস্ট। তখন সবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধের আতঙ্ক কাটেনি। জনজীবনে যুদ্ধের ছাপ। যুদ্ধ চলাকালেই ব্রিটেনের পক্ষ থেকে বলা হয়, যুদ্ধে তাদের সহায়তা করলে যুদ্ধ শেষে ভারতবর্ষ থেকে তারা তাদের শাসন গুটিয়ে নেবে। ভারতবর্ষ একটি রাষ্ট্র হবেÑএমন ভাবনা অনেকের থাকলেও শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জেদ ধরেন মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের। তার দাবিতে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়Ñভারত ও পাকিস্তান।
এরপর ভারত-পাকিস্তান দুটি দেশের নেতারা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়লেও স্বাধীনতা পাওয়ার পর পারস্পরিক মিত্র হতে পারেননি। স্বাধীনতার মুহূর্ত থেকেই সেই যে হিন্দু-মুসলমানে কাটাকাটি, রক্তারক্তি, জীবন নেওয়ার হোলিখেলা শুরু হয়, তা আর থামে না। যদিও পাকিস্তানে হিন্দুর তুলনায় ভারতে বিপুলসংখ্যক মুসলমান থেকে যায়, তবুও পাকিস্তান-ভারত কেউই সংযত আচরণ করতে পারেনি। দুই দেশের মধ্যে ১৯৬৫ সালে এবং ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছাড়াও সীমান্ত সংঘর্ষ লেগেই আছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটেছে ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীর নিয়ে। এসব সংঘর্ষে কমবেশি জীবনহানিও লেগেই আছে। কাশ্মীরের একটি অংশ ভারতের দখলে। আরেক অংশকে বলা হয় পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর। জাতিসংঘের প্রস্তাব ছিল কাশ্মীরের জনগণের ভোটেই নির্ধারিত হবে কাশ্মীরের ভাগ্য।
সে প্রস্তাব জাতিসংঘের নথিতেই আছে। বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। সংঘর্ষও দুই দেশের মধ্যে চালু রয়েছে। সর্বশেষ যে সংঘাত নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা, সেটাও ওই কাশ্মীর। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে একটি জঙ্গিগোষ্ঠী ভারতের আধা সেনা সিআরপিএফের একটি কনভয়ে আত্মঘাতী হামলা চালায়। ভারতের দাবি, ওই হামলায় ৪৯ জন আধা সেনা জওয়ান নিহত হয়। এ ঘটনায় ভারত তার সেনাবাহিনীকে প্রত্যাঘাত হানার হুকুম দেয়। এর মধ্যে কেটে যায় ১২ দিন।
কিন্তু ভারত প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে ১২ দিনের মাথায় ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানে। পাকিস্তান হামলার কথা স্বীকার করে, ক্ষয়ক্ষতির কথা অস্বীকার করে। এই হামলার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই মোহাম্মদের প্রশিক্ষণ ঘাঁটি উড়িয়ে দিতে ভারতীয় বিমানসেনারা পাকিস্তানের বালাকোটের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর হামলা চালায়। তাদের অন্য আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তবে এই আক্রমণকালে ভারতের উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান পাকিস্তানে আটক হন। পাকিস্তান তাকে ফেরত দিয়ে উত্তেজনা প্রশমন ও আলোচনার সূত্রপাত ঘটানোর উদ্যোগ নেয়। সে লক্ষ্যে ১ মার্চ তাকে পাঞ্জাবের একটি সীমান্তচৌকিতে হস্তান্তর করা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও অভিনন্দনের বাবা-মা তাকে গ্রহণ করে।
পাকিস্তানের এই উদ্যোগ কিছুটা কার্যকর বলে প্রতীয়মান হলেও তা কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে প্রশ্ন ও সংশয় দূর হবে না। দূর হবে না অনেকগুলো কারণে। তার দুটি প্রধান কারণ হলো ভারত ও পাকিস্তানের জন্মের মধ্যেই রয়েছে শত্রুতার বীজ। হিন্দু নেতারা এক হিন্দুস্তান চেয়েছেন। চেয়েছেন এক মহান ভারত। জিন্নাহর কারণে তাদের সে আকাক্সক্ষা পূরণ হতে পারেনি। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হয়, ভারত নাকি এখনো তাদের সেই ‘মহান’ এক ভারতের আকাক্সক্ষা থেকে সরে আসেনি। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নকশা তারা নাকি আজও পোষণ করে। তাদের বিভিন্ন প্রপাগান্ডার মধ্যে সেটা প্রকাশ পায়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চেয়েছেন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ। যার প্রধান উপাদান ধর্ম। জিন্নাহ একসময় সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। তার রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা থেকে তিনি মনে করতেন, এক হিন্দুস্তানের মধ্যে তার রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা পূরণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে কথা ব্যক্ত না করে রাজনৈতিক স্বপ্ন পূরণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালনে আগ্রহী না হলেও ধর্মকে উপজীব্য করে মুসলিম লীগ গঠন করেন। এমনও শোনা যায়, ‘জিন্নাহ মনে করতেন, তার একার জন্য হলেও তিনি পাকিস্তান চান।’ যা হোক, তিনি দাবি তোলেন, মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র চাই। হয়তো ব্রিটিশও চেয়েছে শক্তিশালী এক ভারত না হোক। দুটি রাষ্ট্র হলে বৈরিতা হবে, শত্রুতা হবে। সংঘর্ষ-সংঘাত লেগেই থাকবে। ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গেলেও ডিভাইড অ্যান্ড রুলের সুফল তারা ভোগ করতে পারবে। সে কারণে তারা সীমান্ত নির্ধারণেও কিছু অসংগতি রেখে দেয়। আর দুই দেশের মধ্যে বিষফোড়ার মতো অমীমাংসিত রেখে যায় কাশ্মীর।
এসব কারণে পাকিস্তান ও ভারত দুটি স্বাধীন দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে বৈরিতা, শত্রুতা ও সংঘাত অবধারিত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত আরও একটি কারণে প্রায়ই ঘটে থাকে। তাদের নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ সংকট দেখা দিলে নাগরিক সমাজের দৃষ্টি অন্যদিকে নিবিষ্ট করার লক্ষ্যে সংঘাতে প্রবৃত্ত হয়। এবারও অনেকে সে রকম ভারতের শাসকদলের একটি বিশেষ দায়মুক্তির লক্ষ্যে এই সংঘাতের সূত্রপাত বলে ভাবছে। সেই দায় হচ্ছে সামনে ভারতের নির্বাচন এবং সে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপির অবস্থা খুব সুবিধাজনক বলে মনে করা হচ্ছে না। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে জনমত বিজেপির পক্ষে টানার অভিসন্ধি।
কিন্তু বিজেপির এই চালাকি এবার ফল দিচ্ছে বলে মনে হয় না। প্রথমত, নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে এবার কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসসহ প্রায় সব বিরোধী দল এককাট্টা হয়েছে। তারা ভারতের সেনাবাহিনীর পক্ষে থাকলেও এই হামলায় মোদি সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে না। অন্যদিকে পাকিস্তানও অভিনন্দনকে ফেরত পাঠিয়ে শান্তির পথে হাঁটতে চাচ্ছে তাদের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণেই। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ পারমিট করছে না। পাকিস্তানে ক্ষমতায় যে পার্টি যে নেতাই থাক, সুতার নাটাই থাকে জেনারেলদের হাতে। কিন্তু দেশটি এখন প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সবকিছুর নাজুক অবস্থা। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে সামনে রেখে জেনারেলরা দেশটাকে সেই সংকট থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছেন বলে মনে করা হচ্ছে। সে কারণে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সময়ের বাস্তবতাতেই পাকিস্তান শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে এবার উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে বা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পাকিস্তানের যে অনাগ্রহ, তা যে কারণেই হোকÑশান্তি ও সভ্যতার লক্ষ্যে স্থিতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য যুদ্ধকে মানবিক বিশ্ব কখনো সমর্থন করে না। যুদ্ধ সব সময় শান্তি, সভ্যতা ও মানবতাবিরোধী। তাই কেউ চায় না পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ বাধুক। কোনো দেশ, গোষ্ঠী বা দলের স্বার্থে যুদ্ধে কারও কারও সমর্থন ও মদদ থাকলেও যুদ্ধ সব সময় ধ্বংসই ডেকে আনে। তাই তো দেখা যায়, যাদের মধ্যেই যুদ্ধ হোক, স্বার্থ ছাড়া সব প্রতিবেশী দেশ উদ্বিগ্ন হয় এবং বিরোধিতা করে। কোনো প্রতিবেশী দেশে গোলা আঘাত না হানলেও যুদ্ধে বিপর্যস্ত হতে হয় প্রতিবেশীদের। আগুনে এক ঘর পুড়লে যেমন পাশের ঘরেও আঁচ লাগে, যুদ্ধও তেমনই। কোনো দেশ ধ্বংস হয়, কোনো দেশ ধ্বংস না হলেও বিপর্যস্ত হয়। সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জন্য, সমৃদ্ধি-অগ্রগতি ও প্রগতির জন্য শান্তির বিকল্প নেই।
তাই তো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আতঙ্ক থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বেগের আরও কারণÑদুটি দেশই পরমাণু শক্তির দেশ। তাই তাদের মধ্যে সৃষ্ট যেকোনো উত্তেজনা ওই অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়ায়। সাম্প্রতিক এই হামলা-পাল্টা হামলায় সবাই আতঙ্কিত।
আমরা মনে করি, পাকিস্তান-ভারত সংঘাত নিরসনে দুই দেশের যুদ্ধবিরোধী শান্তিপ্রিয় নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সংকীর্ণ কোনো স্বার্থে যেন আমরা যুদ্ধ সমর্থন না করি। জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি, বিশ্ব নেতৃবৃন্দও যেন এগিয়ে আসেন পাক-ভারতের নেতাদেরকে সংযত আচরণে বাধ্য করতে। আমাদেরও অবস্থান হোক যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তির সপক্ষে।
আমাদের সবারই যুদ্ধের বিষয়ে একটা কথা মনে রাখা দরকার, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় এ কোনো জাতির মুক্তিযুদ্ধ নয়, কিংবা মানবকল্যাণে সমাজ বদলের লক্ষ্যে এ কোনো সামাজিক বিপ্লব নয়, যা সমর্থনযোগ্য। এ রকম যুদ্ধে এক অস্ত্র বেনিয়ারা ছাড়া কেউ লাভবান হয় না। অস্ত্র বেনিয়াদের লক্ষ্য কেবলই মুনাফা। দুনিয়া গোল্লায় যাক, কিছু যায় আসে না। যুদ্ধে মানুষ মরে, সভ্যতা ধ্বংস হয়, শান্তি নষ্ট হয় এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধকে হ্যাঁ বলার পক্ষে একটি কারণও নেই।
তাই আসুন, সবাই আমরা যুদ্ধকে ঘৃণা করি, যুদ্ধকে না বলি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here