5

ঠিকানা রিপোর্ট : ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের একচেটিয়া জয়লাভের পর তখন ৯২-ক ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করা হয়। তখন আর কেউ অনুধাবন না করে থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিধাহীনভাবে অনুধাবন করেন- পাকিস্তানি উর্দুভাষী জান্তার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর একত্র বসবাস কোনভাবেই সম্ভব নয়। উর্দুভাষী শাসকগোষ্ঠীর মানসিকতায় বাঙালিদের জন্য কোনো রকম শ্রদ্ধা-সম্মান বা সহমর্মিতা নেই। বাঙালিদের তারা শুধু শাসিত এবং প্রজা ছাড়া নাগরিক ভাবে না।
এই অনুভবের ধারা বাঙালিদের কাছে যতো স্পষ্ট হতে থাকে, বঙ্গবন্ধু মুজিবও ততো বাঙালিদের একক নেতায় পরিণত হতে থাকেন। আসলে বৃটিশ সরকারের শাসন-শোষণ থেকে মুক্তিলাভের আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা থাকলেও স্বাধীন পাকিস্তানে শাসকগোষ্ঠীর সামান্যতম স্বীকৃতিও মেলে না বাঙালিদের। উল্টো বরং বাঙালিদের শোষণ-শাসনের মধ্য দিয়ে তারা পাকিস্তান নামক স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের ষোল আনা মুনাফা ভোগ করতে শুরু করে। ভারতবর্ষ যেমন বৃটিশের উপনিবেশ ছিলো, তেমনি পূর্ব এবং পশ্চিম দুই ডানা মিলে এক পাকিস্তান, এক রাষ্ট্র হওয়া সত্তে¡ও পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের চারণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্র দ্বারা সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হতে থাকে।

পশ্চিমা শাসন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালিরাও প্রতিবাদ-প্রতিরোধে পিছিয়ে থাকে না। এর নেতৃত্বে তখন সবাইকে পেছনে ফেলে সামনের ভাগের তালিকার শীর্ষে শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালিরা তখন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একচেটিয়া আন্দোলনের স্তর পার হয়ে স্পষ্টতই স্বাধীনতাকামী।

আইউব বিরোধী আন্দোলন, কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টির (কপ) মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে নির্বাচন, হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন সব কিছুই লক্ষ্য ছিলো, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুক্তি।

বাঙালিদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে আরো বেশি করে উস্কে দেয় ১৯৬৫ সালে পাক-ভারতের মধ্যকার যুদ্ধ। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে পাকিস্তানের জেনারেলরা পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করা নিয়েই সব শক্তি নিয়োগ করে পশ্চিম সীমান্তে। সে সময় ভারত যদি পররাজ্য গ্রাসের সামান্যতম আকাক্সক্ষাও পোষণ করতো, তবে একরকম বিনা প্রতিরোধেই পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করে নিতে পারতো।

না, ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখল করেনি বটে, তবে পূর্ব পাকিস্তান নিজের অসহায়ত্ব যেমন বুঝতে পারে, তেমনি বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতা। আর উপলব্ধি করতে থাকে নিজেদের জন্য পৃথক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের গুরুত্ব। সেই গুরুত্ব বুঝেই শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পক্ষে লাহোর সম্মেলনে উত্থাপন করেন ৬ দফা। যা রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে সর্বপ্রথম যুক্ত করে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সর্বাত্মক স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি, যার অন্তর্নিহিত অর্থ ছিলো, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here