ড. কামালকে তারেকের সতর্কবার্তা: ধানের শীষ হারানোর ঝুঁকিতে বিএনপি

96

বিশেষ প্রতিনিধি : ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে বিএনপির দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’। সরকারের এ ধরনের আয়োজনটিতে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার হচ্ছেন ধানের শীষ প্রতীকে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে জয়ী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। সরকারের একটি অংশের যোগসাজশে নির্বাচনের আগ থেকেই এ টার্গেটে আত্মনিয়োগের ওয়াদাবদ্ধ তিনি। তথ্যটিতে ভীষণ ক্ষুব্ধ লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ধানের শীষ নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে জিতে আসা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত নেতা সুলতান মনসুরের এমন স্পর্ধায় স্তম্ভিতও তিনি। এ নিয়ে এরই মধ্যে তিনি কথা বলেছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে।

ড. কামালও বিষয়টিতে বিব্রত। লজ্জিত। তিনি ভাবতে পারেননি সুলতান এতটুকু যাবেন। ফ্রন্টের সঙ্গে বেইমানির পর এখন বিএনপির দলীয় প্রতীক নিয়েই টান দেওয়ার দুঃসাহস করবেন। তারেককে ড. কামাল জানিয়েছেন, সুলতান এখন তার নিয়ন্ত্রণে নেই। পুরোপুরিই সরকারের ক্রীড়ানক। আবার এ-ও বলেছেন, সরকারের এ মিশনে সুলতান মনসুর বিএনপিকে ডিস্টার্ব করতে পারবেন। আইনত সুবিধা করতে পারবেন না। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে এ ব্যাপারে ড. কামালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন তারেক রহমান। বলেছেন, ড. কামালের সঙ্গে পরামর্শ করে এ ব্যাপারে আগাম আইনগত প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে।

একাদশ নির্বাচনে সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান প্রার্থী হয়েছিলেন গণফোরাম থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে। তবে ঘটনাচক্রে তাদের প্রতীক ছিল ভিন্ন ভিন্ন। সুলতান বিএনপির ধানের শীষ আর মোকাব্বির গণফোরামের উদীয়মান সূর্য। সুলতান মনসুর নির্বাচনে জেতার পর থেকেই কথা পাল্টে ফেলেন। তার দাবি, তিনি গণফোরাম করতেন না। নির্বাচন করেছেন ঐক্যফ্রন্ট থেকে। আর ধানের শীষ বিএনপির প্রতীক নয়, এটি এখন ঐক্যফ্রন্টের প্রতীক, যা একসময় ছিল মওলানা ভাসানীর প্রতীক। বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে সরকারি মহলের একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তার এমন গোলমেলে বক্তব্য বলে নিশ্চিত বিএনপির শীর্ষ নেতারা। মুখে নানান কথা বলা হলেও বিএনপির এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন কমিশনে দলের নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক ধানের শীষ রক্ষা করা। কিন্তু দলের নিবন্ধনের নিশ্চয়তা মিললেও মার্কা ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।

বাংলাদেশে ভোটযুদ্ধে নৌকার বিপরীতে ভিন্ন আবেগ-আমেজ ধানের শীষের। আবার নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল সময়ের স্রোতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির অবিচ্ছেদ্য প্রতীক হলেও ইতিহাস অন্য রকম। এই তিন প্রতীকে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে সেই পাকিস্তান আমল থেকে। আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। শরিক হিসেবে যুক্তফ্রন্টে ছিল মাওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি, বামপন্থী গণতন্ত্রী দলের নেতা ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ এবং মাহমুদ আলী সিলেটি। যুক্তফ্রন্ট নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রথমে ভোটের লড়াই শুরু করে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে। সেই সময় যুক্তফ্রন্টের সবচেয়ে বড় শরিক দল ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা ২২৩টি আসনে বিজয়ী হন। এর মধ্যে ১৪৩টি পায় মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ৪৮টি শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি। নেজামী ইসলাম পার্টি জেতে ২২টি আসনে। এ ছাড়া গণতন্ত্রী দল ১৩টি এবং খেলাফত-ই-রাব্বানী দুটি আসনে জয়ী হয়।

যুক্তফ্রন্ট ভেঙে গেলে নৌকা প্রতীক কবজা করে নেয় আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে তখন নানা কথা ও সমালোচনা হলেও শক্তিতে কেউ পেরে ওঠেনি। ১৯৫৭ সালে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে জন্ম নেয় আওয়ামী লীগ এবং নৌকা প্রতীকও পায় দলটি। কিন্তু নৌকায় চড়ে নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগকে অপেক্ষা করতে হয় আরও ১৩ বছর। পাকিস্তানে ১৯৭০-এর নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে ১৬০টি আসন পায়। সেই থেকে নৌকার স্থায়ী মালিকানা পেয়ে যায় আওয়ামী লীগ। তবে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে নৌকার আগে লাঙ্গল প্রতীক চেয়েছিল যুক্তফ্রন্ট। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান নির্বাচন কমিশন লাঙ্গল প্রতীক যুক্তফ্রন্টকে দেয়নি। এর কারণ লাঙ্গল ছিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের অবিভক্ত ভারতের কৃষক প্রজা পার্টির। সে জন্য যুক্তফ্রন্ট পরে নৌকাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেয়।

এদিকে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ধানের শীষ প্রতীক ব্যবহার করা হয় ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে। দেশের দ্বিতীয় এই সংসদ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতীক ছিল এটি। তবে আরো আগে, ধানের শীষ প্রতীকে পাকিস্তান আমলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দি¦তা করে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ। পরে ধানের শীষ বেছে নেয় যুক্তফ্রন্ট থেকে বের হয়ে যাওয়া মওলানা ভাসানীর ন্যাপ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের ন্যাপের আরেকটি অংশের প্রতীক ছিল কুঁড়েঘর। ভাসানী ন্যাপের বড় একটি অংশের যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপি নেতৃত্ব পর্যায়ে ছিলেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া।

ভাসানী ন্যাপের বড় অংশ তার নেতৃত্বে বিএনপিতে মিশে গেলে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক নেয়। ১৯৭৮ সালে বিএনপিতে মুসলিম লীগের শাহ আজিজও যোগ দেন। তবে যাদু মিয়ারাই বড় অংশ ছিলেন, তারাই তাদের প্রতীক নিয়ে বিএনপিতে ঢুকে পড়লেন। জিয়াউর রহমান তখন ধানের শীষকে পছন্দ করেছিলেন ভীষণভাবে।

প্রতীকের ইতিহাসে লাঙ্গলও বেশ উল্লেখযোগ্য। উপমহাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় পড়েছিল লাঙ্গল। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের অবিভক্ত ভারতের কৃষক প্রজা পার্টির লাঙ্গল ধরে ফেলে আতাউর রহমান খানের জাতীয় লীগ। পাকিস্তানে ১৯৭০ সালে জাতীয় নির্বাচনে তার দলের প্রতীক ছিল লাঙ্গল। এইচ এম এরশাদের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন আতাউর রহমান খান। তার কাছ থেকে লাঙ্গল প্রতীকটি নিজ দলের জন্য পছন্দ করেন এরশাদ।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সব দলই নিজেদের গণমানুষের দল হিসেবে দাবি করতে গিয়ে প্রতীকের মর্ম প্রচার করতে চায়। যা করে আসছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিও তেমনই মনে করে। রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের আগে প্রতীকগুলো ওপেন ছিল। আইন ছিল আগে এলে আগে প্রতীক পাবেন। তার পরও অলিখিত নিয়ম ছিল এই দলকে ওই প্রতীক দিতে হবে। কিন্তু আইন অনুযায়ী এই প্রতীকগুলো অন্য দল চাইত, তাহলে নির্বাচন কমিশন সেটি দিতে বাধ্য থাকত। নানা ঘটনা ও পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় প্রতীক, বিশেষ করে বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে এ চর্চা রাজনীতিতে নতুন একটি উপাদান যোগ করতে যাচ্ছে কি না, পর্যবেক্ষণ করার মতো বিষয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here