মার্চ আমাদের স্বাধীনতার মাস নতুন ভাবনা ও পথচলার মাস

24

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে গেল। আমাদের পা এখন মার্চে। মার্চ আমাদের স্বাধীনতার মাস। মুক্তির মাস। আমরা বলি-ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই স্বাধীনতা পেয়েছি। ঠিক একইভাবে ফেব্রুয়ারি শেষ করে আমরা পাই মার্চ।
স্বাধীনতার মাস মার্চ এলে আমরা শুধু স্বাধীনতার আনন্দে উদ্বেলিত হই না। উচ্ছ¡াসের বন্যায় ভেসে যাই না। স্বাধীনতার মাস মার্চ যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, একই সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায় ৩০ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রম হারানো ২ লাখ মা-বোন! আমাদের সামনে দাঁড়ায় অনেক প্রশ্ন। নতুন নতুন ভাবনা। নতুন করে পথচলার তাড়না।
অনেকেই হতাশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবস্থান নিয়ে, বাস্তবায়ন নিয়ে। যে চেতনা, যে তেজ, যে ঐক্য এবং স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করল, জীবন দিল, সম্ভ্রম হারাল লাখ লাখ পিতা-মাতা, ভাইবোন-সেই বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু প্রশ্ন একটি থেকেই গেল-স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হয়ে কী পাওয়ার কথা ছিল, আর কী পেলাম? দেশের উন্নয়ন প্রশ্নাতীত। দৃশ্যমানভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দরিদ্র, আড়ষ্ট বাংলাদেশের খোলস ছেড়ে বাংলাদেশ এখন অগ্রগতির মহাসড়কে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি সুপারসনিকের। পুঁজিবাদী সমাজে যেহেতু বণ্টনে সাম্য নেই, তাই ওই উন্নয়নের সুফল সবাই পায় না। উন্নয়নের সুফলভোগী সবাই হতে পারে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ব্যবসা একপেশে, সুফলভোগীও একপেশে।
হিসাব করে দেখার কেউ নেই- দেশটা স্বাধীন করার ক্ষেত্রে অবদান কাদের বেশি, ত্যাগ কাদের বেশি। মুক্তিযুদ্ধে শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি অংশ নিয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা। জীবনও দিল অধিকাংশ তারাই। সেই রাজনীতির সুফল তারা কেউ ভোগ করতে পারছে না। তারা সুফলভোগী বৃত্তের বাইরেই থেকে গেল আজ অবধি। দেশের গড় আয়ের শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে যা বলা হয়, তাতে বাংলাদেশে সবাই বড়লোক। একেকজনের আয় দেড় লাখের ওপরে! আসলেই কি তা-ই? আগে রাজনীতিবিদরা ফাঁকির কথা বলতেন। এখন বলেন রাজনৈতিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তাই সংগতভাবে সেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা।
হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে, মানুষের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ আছে, হতাশা আছে। কিন্তু যখন কারো কারো মুখে উচ্চারিত হতে শোনা যায়-‘স্বাধীন দেশে কী পেলাম?’ তখন এ কথার মধ্যে কেমন যেন অন্য রকম একটা সুর খুঁজে পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি রাজনৈতিক বিদ্বেষ। ভাবটি এমন যেন-এমন অবস্থা হলে কী দরকার ছিল মুক্তিযুদ্ধ করে এত লাখ লাখ মানুষের জীবন ও সম্ভ্রম বিসর্জনের? এই ‘কী পেলাম’ প্রশ্নের উত্তর একটিই- আমরা আর কিছু না পেলেও একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। প্রথম চাওয়া তো সেটিই ছিল। আমরা পাকিস্তানের শাসন-নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। আমরা স্বাধীন জন্মভ‚মি চেয়েছিলাম। আমরা স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে চাইনি। আমরা ‘জননী জন্মভ‚মি স্বর্গাদপী গরীয়সী’ একটি মাতৃভ‚মি চেয়েছিলাম এবং তা আমরা পেয়েছি। এই পাওয়ার জন্য মায়ের সন্তানেরা, বধূর স্বামীরা, বোনের ভাইয়েরা, দেশের কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে।
এবং এ কথা নিশ্চিত বলা যায়, এই আত্মত্যাগী সাধারণ মানুষের দল কখনোই কী পেলাম যুদ্ধ করে, জীবন দিয়ে, সম্ভ্রম খুইয়ে- এসব প্রশ্ন তোলেনি। এ প্রশ্ন তাদের, যারা পাকিস্তান ভেঙে যাক চায়নি। মুক্তিযুদ্ধেও যায়নি এবং স্বাধীনতার সুফলও এখন তারাই ভোগ করছে। স্বাধীন হয়ে কী পেলাম- এ প্রশ্নের উত্তর, ‘একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। নিজেদের ভাগ্য নিজেদের মতো করে গড়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্মাণের সুযোগ পেয়েছি। নিজেদের ভাবনা নিজেদের মতো করে ভাবব, আগামী প্রজন্মকে স্বাধীনভাবে মানুষ করব, আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে আমরা চলব। পরদেশি, পরভাষী কেউ আমাদের ওপর হুকুমদারি এবং মাতব্বরি করার সুযোগ পাবে না।’
আমরা সেটা পেয়েছি। বরং যারা প্রশ্ন তোলে- স্বাধীন বাংলাদেশে কী পেয়েছি? তারা অনেক বেশি পেয়েছে এবং এখনো পাচ্ছে, ভবিষ্যতেও পাবে। যারা মনে করে, দেশের কাছে পাওয়ার চেয়ে দেশকে দেওয়ার থাকে বেশি, তারা এ প্রশ্ন না তুলে নীরবে নিজের ভ‚মিকাটুকু পালন করে যায়। যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, স্বাধীনতা, আদর্শ, নৈতিক মূল্যবোধ, এসবের কথা বলে চালাকি করে, তাদের সব পেয়েও কিছু পাওয়া হবে না। আমাদের করোটিতে যদি প্রকৃত অর্থ আমরা স্বাধীনতা অর্জনের মূল চেতনা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, ন্যায়বিচার, সুশাসন, উন্নয়ন এবং জনকল্যাণকে লালন করি, তবেই কেবল ‘কী পেলাম’ প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
মতলব নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে, বীর নারীদের অবজ্ঞা করে, কোনো ‘দুরভিসন্ধি’ নিয়ে ‘কী পেলাম’ খুঁজতে গেলে মাথা কুটে মরলেও কোনো দিন ‘কী পেলামের’ উত্তর পাওয়া যাবে না। কেউ কেউ এমন অসংগত এবং অশোভন প্রশ্নও তোলে যে, সবার স্বপ্ন তো গিলে ফেলেছে একজনের স্বপ্ন! একজনের স্বপ্নে বিলীন সব স্বপ্ন? না, বিষয়টি সে রকম নয়। ৬ দফা দিয়ে বাঙালিদের স্বপ্ন তো ওই একজনই দেখিয়েছেন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে বাঙালিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখালেন! ওই স্বপ্নেই তো বাঙালির সব স্বপ্ন ছড়ানো। বাঙালির স্বপ্ন আবাদের চাষি তো সেই একজনই! তাঁর নৌকা বোঝাই মানুষের স্বপ্নে।
১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নে নেচে বেড়ায় যে বাংলাদেশ, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কারিগর তো একজনই ছিলেন। তিনিই তো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে হত্যা করে বাঙালি জাতিকে ‘স্বপ্নহীন’ করার চক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই হত্যাকারীরা সফল হয়নি। একটি জাতির স্বপ্নকে ওভাবে মাটিচাপা দেওয়া যায় না। তাই তো জাতিরই সেই স্বপ্ন ফলানোর দায় কারো না কারো ঘাড়ে চাপে। এখন পিতার সেই স্বপ্নের দায় ঘাড়ে নিয়েছেন তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পিতার স্বপ্নের বীজের ফসল ফলছে জনতার জমিনে। তার ঘাড়ে স্বপ্ন ফলানোর সব দায় চাপিয়ে নিশ্চিন্তে আছেন বাংলাদেশের তরুণ-তরুণী-আবাল বৃদ্ধ-বণিতা। তিনি যেন স্বপ্নের যৌথ খামার। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, কামার-কুমার, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, ছিন্নমূল-টোকাই, সবার সব স্বপ্ন সেই যৌথ খামারে জমা রেখে সবাই নিশ্চিন্ত, স্বপ্নের ফসল এবার সবার ঘরে উঠবেই!
তবে স্বপ্ন দেখানো এবং দেখাই শেষ কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে স্বাধীন দেশ পেয়েছি, সেই দেশের উন্নয়নে সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবারই করণীয় আছে। বাংলাদেশের সব ইতিবাচক অগ্রগতি সত্তে¡ও কিছু কিছু ভয়ংকর নেতিবাচকতা রয়েছে, যা দূর করতে না পারলে যার কাঁধেই জনগণের স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব পড়ক, পূরণ করা একটু কঠিনই হবে। দেশকে উন্নয়নের সড়কে তুলে সামনে ধাবিত হওয়ার পাশাপাশি ছোটখাটো যেসব দায়িত্ব শীর্ষ নেতার বাইরেও যাদের ওপর বর্তায়, তারা যদি সততার সঙ্গে পালন না করেন, তবে চাঁদের কলঙ্কের মতোই বাংলাদেশের কিছু কলঙ্ক অর্থাৎ স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাবে।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে গভীর হতাশার সঙ্গে লক্ষ করা যায় যে প্রধান নেত্রীর বাইরে যার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা আছে, তাদের মধ্যে মারাত্মক ‘ঢিলেঢালা’ অবস্থা। কেউ কোনো দায়িত্ব পালনে মনোযোগী না হয়ে শুধু নেত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকা, একটি স্বাধীন দেশকে সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে নেওয়া এবং সর্বাঙ্গীণ সুন্দররূপে গড়ে তোলার জন্য এ রকম একজনের ওপর নির্ভরশীলতা খুব ভালো লক্ষণ নয়। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবারই দায়িত্ব আছে, যা সুচারুরূপে দায়িত্বশীলতা, আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে সম্পন্ন করা না গেলে আমরা অনেকটা দূর পর্যন্ত যেতে পারলেও চ‚ড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। এ জন্য চাই মানসিক প্রস্তুতি। মনস্তাত্তি¡কভাবে এই জড়তা থেকে মুক্ত হতে না পারলে আগামী শতকের উপযোগী করে জাতি বিনির্মাণ সম্পন্ন করা খুব কঠিন হবে বলেই মনে হয়।
বিশেষ করে, এবারের ভাষার মাসে যে দুটি ঘটনা সমগ্র জাতির জন্য গভীর শোক এবং উদ্বেগের জন্ম দিয়ে গেল, তাতে কিছু মানুষের অন্য মানুষের জীবনকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ ভাবার মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে। একটি চকবাজারের আগুন, যাতে প্রায় ১০০ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু। আরেকটি চট্টগ্রামে পিস্তল নিয়ে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা। দুটি ঘটনাই জাতীয়ভাবে দেশের ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগজনক। দুটি ঘটনাতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার নিদর্শন বিদ্যমান।
আসুন, এ মাস স্বাধীনতার মাস। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। সবার আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় বাংলাদেশে আমাদের স্বপ্ন পূরণ হোক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here