সিইসির ফাঁস কিংবা বেফাঁস মন্তব্য উপজেলা ও ডাকসুতে হতাশা

9

মোস্তফা কামাল: নুরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই জনমনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তখন থেকেই বলা হচ্ছিল, তিনি ঝামেলা পাকাতে পারেন। তাঁর অনেক বেফাঁস কথা ইতিমধ্যেই নানা বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এরপর অনেককেই বলতে শুনেছি, সিইসির মতো গুরুত্বপূর্ণ, সাংবিধানিক পদে তাঁকে বসানোর সিদ্ধান্তই ভুল। তাঁর কোনো না কোনো ভুলের কারণে সরকারকে বিব্রত হতে হবে। বাস্তবে আমরা তা-ই দেখছি। এতেই প্রমাণিত হয়, ‘চেয়ার মানুষকে তৈরি করে না। মানুষই চেয়ার তৈরি করে।’

সিইসি নুরুল হুদা এখন আবার আলোচনার কেন্দ্রে। বলা যায়, টক অব দ্য কান্ট্রি। তাঁর ‘বিস্ফোরক মন্তব্য’ নিয়ে সর্বত্র আলোচনা-পর্যালোচনা। তুখোড় সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে বলছেন, এ কী বললেন সিইসি! তিনি নিজে েেবছেনই, সরকারকেও ডোবাচ্ছেন।

সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করতে পারছে না, সিইসির পদে থেকে এ ধরনের মন্তব্য করা যায়। তিনি বলেছেন, আগামীতে ভোটে ইভিএম শুরু করে দেব। তাহলে আর সেখানে রাতে ভোটের বাক্স ভর্তি করার সুযোগ থাকবে না।

নির্বাচন কমিশনার সাহাদাত হোসেন বলেছেন, উপজেলা নির্বাচনে আগের রাতে ভোট চলবে না।
নির্বাচন কমিশনের দুই কর্তাব্যক্তির মুখ থেকে এ ধরনের মন্তব্য শোনার পর স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তার মানে কি বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগের রাতেই ভোট হয়েছিল? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন? না নিয়ে থাকলে কেন নেননি? তখন কেন তিনি ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা পালন করেছেন?
সিইসির সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন কমিশনার সাহাদাত হোসেন। তাঁদের মন্তব্য নানা রহস্যের জন্ম দিয়েছে। দেশব্যাপী উপজেলা নির্বাচন শুরুর আগমুহৃর্তে তাঁরা সাংবাদিকদের কাছে ওই মন্তব্য করেন। তাঁদের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। আর সেই বক্তব্য নিয়ে রাজনীতির মাঠে তোলপাড় হলেও তাঁদের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তাঁরা প্রয়োজনও বোধ করেননি।

সিইসির বক্তব্যকে লুফে নিয়েছে বিএনপি। বিএনপি নেতারা বলেছেন, আমরা তো আগেই বলেছিলাম, ভোটের আগের রাতেই ভোট ডাকাতি হয়েছে। এখন সিইসির মুখ থেকে সেই বক্তব্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, ভোটের আগের রাতেই ভোট হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সিইসির পক্ষে বলতে গিয়ে বড়ই হাস্যকর যুক্তি খাড়া করেছেন। তিনি বলেছেন, সিইসি ইভিএমের গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছেন।

সিইসি নিজে কেন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করছেন না? তিনি কেন চুপচাপ বসে আছেন? তিনি কি গণমাধ্যমের খবরগুলো দেখছেন না? নিশ্চয়ই দেখছেন। তাঁর দিক থেকে যেহেতু কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, সেহেতু আমরা ধরে নিতে পারি, বিগত নির্বাচনে রাতে ভোট হয়েছিল! তাহলে সেই ভোটের দায় কে নেবে?

এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন একটি সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করতে পারে। কমিটির দায়িত্ব হবে, রাতে কোন প্রক্রিয়ায়, কিভাবে ভোট হয়েছিল তা খুঁজে বের করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা। সেটা করা কি সিইসির পক্ষে সম্ভব?
সরকারও সিইসির কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইতে পারে। সরকারের গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থেই তার ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। তা না হলে এই ইস্যুটি সরকারকে বেশ ভোগাবে।

উপজেলা নির্বাচনের এ কী হাল! : ১০ মার্চ থেকে সারা দেশে উপজেলা নির্বাচন শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের ভোটের হাল দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে উৎসবের নির্বাচনের যে সংস্কৃতি ছিল তা একেবারেই অনুপস্থিত। উপজেলা নির্বাচন বিরোধী দলগুলো বর্জন করেছে। মাঠে আছে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। তাঁরা কেন ভোটকেন্দ্রে ভোটার নিতে ব্যর্থ হলেন?
ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরই দায়িত্ব ছিল ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের জড়ো করা। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা ভোট বর্জন করল কেন? কেন নেতারা নিজেদের লোকদেরও ভোটকেন্দ্রে নিতে পারলেন না? বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থনের হিসাব অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ভোটারের সংখ্যা কমপক্ষে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকলেও ভোটারের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখলাম? ভোটকেন্দ্রগুলো ফাঁকা।

অনেক উপজেলায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি হয়েছে। কেন্দ্র দখল, সিল মারার ঘটনাও ঘটেছে। উপজেলা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যই কি একটি মহল ভীতি প্রদর্শন করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিয়েছে, নাকি ভোট দেওয়ার ব্যাপারে তাদের অনীহা তৈরি হয়েছে?
আমরা বরাবরই দেখে আসছি, উৎসব করে মানুষ ভোট দিতে যায়। সেই উৎসবের সংস্কৃতি কি নিঃশেষ হয়ে গেল!

প্রথম পর্বের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে কেউ সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আরো কয়েক পর্বের নির্বাচন হবে। তাতে আশানুরূপ লোকসমাগম এবং উৎসবের আমেজ দেখতে চাই। সেই পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও প্রার্থীদের। সরকারের ভাবমূর্তির জন্যই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অত্যাবশ্যক।

আমরা এখনো আশাবাদী, সামনের নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। আওয়ামী লীগও দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করবে এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করবে।

ডাকসুতে কলঙ্কের ছাপ: দীর্ঘ ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হলো ১১ মার্চ। বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের কারণে কলঙ্কের ছাপ পড়েছে। ভোট দিতে না দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সিল মারা ব্যালট উদ্ধারের ঘটনা আমাদের পীড়া দিচ্ছে। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

সবাই আশা করেছিল, ডাকসু নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ না জিতলে যে মহাভারত অশুদ্ধ হতো, তা নয়! এর মধ্য দিয়ে সরকারও বদল হতো না; বরং একটা চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে পারত। সেটা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য বিশেষভাবে কাজে লাগত। সরকার কেন ডাকসু নির্বাচনের পুরো দায়িত্ব ছাত্রলীগের ওপর ছেড়ে দিল, তা বোধগম্য নয়।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সাবেক ডাকসু নেতারা। তাঁরা বলেছেন, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ডাকসু কলঙ্কিত হয়েছে। আবার নির্বাচন দিতে হবে। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেছেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ডাকসু নির্বাচন উৎসবমুখর হয়েছে। আর ছাত্রলীগ বলেছে, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে।

সেই ষড়যন্ত্র মোকাবেলার জন্য ছাত্রলীগ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা তৈরি করতে ষড়যন্ত্রকারীরা তো চেষ্টা চালাবেই। সেই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো একটা নির্বাচন উপহার দেওয়ার দায়িত্ব ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রলীগসহ সব ছাত্রসংগঠনের। এ প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দিতে পারত। তাহলে ছাত্রলীগ সবার সহানুভূতি ও সমর্থন পেত। তা না করে ছাত্রলীগ জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। অবস্থাটা এমন যেন ডাকসুতে জিততে না পারলে সরকার উল্টে যাবে!

ডাকসু নির্বাচনের যে পরিবেশ আমরা দেখলাম, তাতে কোনোভাবেই এই নির্বাচন সমর্থন করা যায় না। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক ভিপি নির্বাচিত হয়েও তিনি নির্বাচনকে কলঙ্কজনক বলে মন্তব্য করেছেন। এর পরও কি ছাত্রলীগ বলবে, খুব ভালো নির্বাচন হয়েছে?

ডাকসুর ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে কী নির্দেশনা ছিল জানি না। তবে ডাকসুতে ছাড় দিলে অনেক বড় কিছু অর্জন করতে পারত সরকার। এমনিতেই বিগত নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন। উপজেলা নির্বাচনেও ভোটার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বাড়াবাড়ি না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হতো।

আফসোস হয় ভিসি আখতারুজ্জামানের জন্য। তিনি নিজের গায়ে এতটাই দলীয় প্রলেপ লাগিয়েছেন যে তার থেকে তিনি আর বের হতে পারছেন না। সবকিছুই তিনি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন। এ কারণে তিনি সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে পারছেন না। সংগত কারণেই তিন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকের অবস্থানে নেই।

নির্বাচনের পরদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আন্দোলন জমে উঠবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এর সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগের প্রশ্ন জড়িত। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেই সরকারকে সামনে পা ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে, অনেক সময় পচা শামুকেও পা কাটে!
লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here