দেড়শ বছরে ব্যবসায় বাধার দেয়াল ভাঙা মার্কিন নারীরা

1

ঠিকানা ডেস্ক : গত ৮ মার্চ শুক্রবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে কয়েকজন উদ্যমী মার্কিন নারীর কথা স্মরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ। তারা অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে অসাধারণ অবদান রেখে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে দুজন পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘ম্যাডাম রেলরোড’ ও ‘উইচ অব দ্য ওয়াল স্ট্রিট’ হিসেবে। তারা সবাই পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছেন।
কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ পেতে নারীদের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়কে যারা অতীতের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করতে চান, তাদের জন্য একটা উদাহরণ হলো সম্প্রতি এক নারী ব্রোকার তার নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি একদিন সকালে তার ডেস্কে ‘ডাইনিদের টুপি’ (উইচ’স হ্যাট) পরে থাকতে দেখেন। তাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে এই টুপি রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওই নারী ব্রোকারের।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি অনেক পুরনো। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বিশ্বের সব জায়গায় নারীদের সমতা অর্জিত হয়নি। বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে নারীদের দেখা গেলেও প্রথমদিকে যারা এসব স্থানে আসতে চেয়েছিলেন, তাদের আপসে কেউ দিয়ে দেয়নি। অনেক সংগ্রাম করে নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছিলেন ওইসব নারী।
ম্যাগি লেনা ওয়াকার (১৮৬৪-১৯৩৪)
সাবেক এক দাসী ও আইরিশ বংশোদ্ভূত কনফেডারেট সেনার মেয়ে ছিলেন ম্যাগি লেনা ওয়াকার। তিনি ছিলেন প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান নারী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক চালু করেন। তার ব্যাংকের নাম সেন্ট লুক পেনি সেভিংস ব্যাংক। এটি ১৯০৩ সালে যাত্রা করে।
অল্প বয়সে ভার্জিনিয়ার রিচমন্ডে স্বাধীন সেন্ট লুক ধর্মীয় গোষ্ঠীতে যোগদানের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ সূচিত হয়েছিল ম্যাগির। দাস প্রথা বিলুপ্তির পর আফ্রিকান আমেরিকানদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজনে সহায়তা করত ওই সংগঠন। ১৮৯৯ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব পান, যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করেন।
আজীবন শিক্ষা, নারী অধিকার ও জাতিগত সমতার পক্ষে লড়াই করা ম্যাগি ওয়াকার ধর্মীয় সংগঠনটি শক্তিশালী করেন এবং ২৩টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়া (ডিসি) পর্যন্ত সদস্যপদ বাড়ান। সঞ্চয় ব্যাংকটির প্রথম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন এবং রিচমন্ডের কৃষ্ণাঙ্গ মালিকানাধীন অন্য দুটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হলে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ব্যাংকটি ২০০৫ সাল নাগাদ আফ্রিকান আমেরিকানদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল।
১৯০১ সালে ম্যাগি ওয়াকার এক বক্তৃতায় বলেন, ‘চলুন আমরা আমাদের অর্থ কাজে লাগাই। চলুন আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা করি এবং এর সুবিধা ভোগ করি। চলুন আমরা এমন একটি ব্যাংক করি, যা আমাদের নিকেলকে ডলারে পরিণত করে আমাদের হাতে হস্তান্তর করবে।’
ভিক্টোরিয়া উডহাল (১৮৩৮-১৯২৭) ও টেনিসি ক্ল্যাফ্লিন (১৮৪৪-১৯২৩)
কখনো উদ্যোক্তা, কখনো প্রতারক হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির ১০ সন্তানের দুজন ছিলেন ভিক্টোরিয়া উডহাল ও টেনিসি ক্ল্যাফ্লিন। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের সহায়তায় অল্প বয়সে নিজেরাও প্রতারণার কৌশল কাজে লাগিয়েছেন বলে জানা যায়।
১৮৬৮ সালে তারা নিউইয়র্ক শহরে বসবাস শুরু করেন, যেখানে বাষ্পজাহাজ ও রেলরোড টাইকুন কর্নেলিয়াস ভ্যান্ডারবিল্টের সঙ্গে পরিচিত হন। ওই ধনকুবেরকে আধ্যাত্মিক উপদেশ দেয়ার বিনিময়ে ১৮৭০ সালে নিজেদের ব্রোকারেজ হাউজ চালু করতে সহায়তা নেন দুই বোন। নারীদের দ্বারা পরিচালিত প্রথম ব্রোকারেজ কোম্পানি ছিল উডহাল, ক্ল্যাফ্লিন অ্যান্ড কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি সফলতার মুখ দেখলে সেখান থেকে অর্থ সঞ্চয় করে উডহাল অ্যান্ড ক্ল্যাফ্লিনস উইকলি নামে একটি সংবাদপত্র চালু করেন তারা।
পত্রিকাটিতে নারী ভোটাধিকার, শ্রম সংস্কার, বৈধ পতিতাবৃত্তি ও মুক্ত ভালোবাসার মতো বিতর্কিত বিষয় স্থান পায়।
হ্যাটি গ্রিন (১৮৩৪-১৯১৬)
মাত্র ছয় বছর বয়সে দাদাকে অর্থনৈতিক খবর ও শেয়ারবাজারের প্রতিবেদন পড়ে শোনানো শুরু করেছিলেন হ্যাটি গ্রিন। শেয়ারবাজারে বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা দাদা তাকে শিখিয়েছিলেন বিনিয়োগের জন্য কোনটা ভালো এবং কী কারণে ভালো। ৮২ বছর বয়সে যখন মারা যান, তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী নারী। বর্তমান অর্থমূল্যে ২০০ কোটি ডলার সম্পদ নিয়ে হয়তো বিশ্বেরও সবচেয়ে ধনী নারী ছিলেন।
১৯০৫ সালে এক সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রোফাইলে তিনি জানান, বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন ১০ লাখ ডলার। আবাসন খাতে ক্রয়-বিক্রয় করে, রেলরোড শেয়ার ক্রয় করে এবং সরকারি বন্ড ও মর্টগেজ কেনার মাধ্যমে তিনি তার সম্পদ বাড়িয়েছিলেন। বিয়ের সময় স্বামীর সঙ্গে একটি বিয়ে-পূর্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন হ্যাটি গ্রিন। কোয়েকা ধর্মীয় গোষ্ঠীর অনুসারী হিসেবে বেড়ে ওঠা হ্যাটি গ্রিন সবসময় কালো রঙের পোশাক পরতেন। তার পোশাক ও মিতব্যয়িতার কারণে ‘উইচ অব দ্য ওয়াল স্ট্রিট’ (ওয়াল স্ট্রিটের ডাইনি) হিসেবে খ্যাতি পান। তিনি একটি ব্যাংকের এক ডেস্কে দীর্ঘদিন অফিস করেছিলেন, যেখানে বড় বিনিয়োগকারীদের একজন ছিলেন। একটি গরম করার যন্ত্রে এক টুকরো ওটমিল দিয়ে দুপুরের খাবার সারতেন বলে জানা গেছে। ময়লা হলে তার স্কার্টের পার্শ্বের অংশটাই কেবল ধুতেন।
ওই সময়ের বেশির ভাগ ধনকুবেরের মতো তাকেও বেশ কাঠখোট্টা ও কঠোর মানুষ হিসেবে সমালোচনা করা হয়। কিন্তু তিনি যখন মারা যান, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রথম পৃষ্ঠায় তার ওপর শোক সংবাদ ছাপা হয়েছিল।
ছবি ও সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস, নিউ ইংল্যান্ড হিস্ট্রিক্যাল সোসাইটি, ন্যাশনাল ম্যাগাজিন, গেটি ইমেজেস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here