আধেক আনন্দ আর আধেক বেদনায় স্বাধীনতা দিবস

7

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবস একসঙ্গে ঘটেনি। একটা থেকে আরেকটা ৯ মাসের ব্যবধান। আবেগ, অনুভ‚তি আর মহিমাতেও ব্যবধান অনেক। অন্য রকম। স্বাধীনতা আনন্দের, উল্লাসের। একটি স্বাধীন দেশ পাওয়ার উচ্ছ্বাস ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। কিন্তু আমরা এই দিনে কেবলই উল্লাস এবং আনন্দে মেতে উঠতে পারি না। আনন্দের পাশাপাশি আমরা বেদনায়ও ম্রিয়মাণ হই। কান্নায় আমাদের বুক ভাসে। উদাস দুপুরের মতো আমরা বুকে কষ্টের পাথর নিয়ে চলি। তাই সমগ্র বাঙালি জাতি স্বাধীনতা দিবসে আধেক আনন্দ, আধেক বেদনা নিয়ে কাটাই।

আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা এল আসলে ৯ মাস পর-১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে। ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর- প্রায় ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে তাড়িয়ে বিজয় নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাও নিশ্চিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করি আমরা। বাঙালি জাতির ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! পাকিস্তানি শাসকচক্র ধরেই নিয়েছিল- আমরা কেবল ওদের দাসত্বই করব। ওরা, পশ্চিম পাকিস্তানিরা প্রভু আর আমরা দাস! ওরা হুকুম করবে, আমরা তা তামিল করব! কোনো ন্যায্যতা নেই। ন্যায়বিচার, সাম্য নেই। বাংলা ভাষা বিশ্বের প্রথম ৫-৬টি ভাষার একটি, কিন্তু সে ভাষায় কথা বলার অধিকার নেই। বাঙালিরা দেশের জনসংখ্যায় গরিষ্ঠ হয়েও তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার নেই। নীতি-নির্ধারণীতে অংশীদারত্ব নেই। দেশের জিডিপিতে অবদান বেশি, ভোগের অংশে শূন্য!

বাঙালিদের স্বাধীনতা পাওয়ার কথা ওই ১৯৪৭-এর আগস্টেই, ইংরেজদের কাছ থেকে ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গেই। একদিকে ব্রিটিশের চালাকি, অন্যদিকে জিন্নাহর চক্রান্ত। ব্রিটিশ-ভারতে হিন্দুর পরেই সংখ্যায় বাঙালি বেশি হওয়া সত্ত্বেও সে সময় বাঙালিদের ভাগ্যে স্বাধীনতা মিলল না। বাঙালিদের একটি অংশকে মেনে নিতে হলো ভারতের হিন্দিভাষীদের বশ্যতা, আরেক অংশকে মেনে নিতে হলো সংখ্যালঘু উর্দুভাষীদের বশ্যতা। তবে ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও পাকিস্তানে ক্ষমতার কেন্দ্রে জেঁকে বসল পাঞ্জাবি জেনারেলদের স্বৈর শাসন। পাকিস্তানি সেই জোঁয়াল টানতে হলো বাঙালিদের প্রায় ২৪ বছর। আর এ ২৪ বছর ধরেই বাঙালিদের লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলন করতে হয়েছে পাকিস্তানি একনায়ক-স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে। বাঙালিদের প্রতি তাদের বিমাতাসুলভ আচরণ আর শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে। ২৪ বছর ধরেই তিল তিল করে বাঙালিদের উপলব্ধি করতে হয়েছে, পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস করা সম্ভব নয়। পশ্চিম পাকিস্তানিদের আচরণে বাঙালিদের বারবার বুঝতে হয়েছে ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়!’ তবে বুঝতে পারা আর সেই অনুভব থেকে অঙ্কুরিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া, সহজ কোনো কাজ নয়।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে লাগে ২৪ বছর। এই ২৪ বছরে বাঙালিরা একজন নেতা পেয়েছে- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি নিজে যেমন দিনে দিনে একক নেতা হয়েছেন, নিজে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, বাঙালি জাতিকেও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। স্বাধীনতার পথে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছিল, স্বাধীনতার জন্য বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে চ‚ড়ান্ত আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত করেছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগে মুক্তির কয়েকটি সুবর্ণ সুযোগও এসে যায় বাঙালিদের হাতে। ১৯৭০-এর নভেম্বরে উপক‚লে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ মানুষ অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করে। গবাদিপশু, ফসল, ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের কোনো সহানুভূতিই লক্ষ করা যায় না। ওরা কেউ এসে বাঙালিদের এই মহাবিপদেও পাশে এসে দাঁড়ায় না। তাদের এই মানসিকতা কেবল তাদের নিষ্ঠুরতাই প্রদর্শন করে না, প্রমাণ করে যে তারা আমাদের কেউ নয়। সে কারণেই আমাদের প্রতি তাদের কোনো মায়া নেই। আমাদের সম্পদে তারা শতভাগ অংশ নিতে চায়, অথচ আমাদের বিপদে তাদের বিবেক নড়ে না। আমরা, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা, যুদ্ধে অরক্ষিত থাকি, সম্পদে বঞ্চিত হই, ন্যায়বিচার, সমবণ্টনে আমরা প্রতারিত হই, বিপদে-আপদে অবহেলিত থাকি। এরপর আসে ১৯৭০-এর নির্বাচন। তার আগে তারা বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জেল-জুলুম, এমনকি ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেও আটকাতে পারে না! বাঙালিদের সামনে তখন একটিই স্বপ্ন-স্বাধীনতা! সব পথ এসে মিলেছে স্বাধীনতার মহাসড়কে।

১৯৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান। বাঙালির রুদ্ররোষ/বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়! সবাই রাজপথে। ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক-শ্রমিক, রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী। শহীদ হন কিশোর মতিউর, ছাত্রনেতা আসাদ, শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা, সার্জেন্ট জহুরুল হক। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রমাদ গোনে। গণঅভ্যুত্থানের পথ থেকে সরিয়ে আনতে ’৭০-এ সাধারণ নির্বাচন। সফল হয় না পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র! একচেটিয়া ম্যান্ডেট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দুটি বাদে পূর্ব পাকিস্তানের সব আসন বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নৌকার। আবার পশ্চিম পাকিস্তানিদের চালাকি, ষড়যন্ত্র। বাঙালিদের ঠকানোর ফন্দি! ৩ মার্চ ঢাকায় সংসদের অধিবেশনের ডাক। কিন্তু চক্রান্তের নায়কেরা সক্রিয়। আসর লাহোরে। সেনানায়ক ইয়াহিয়া খান আর রাজনীতির চাণক্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর যৌথ প্রযোজনায় অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা মার্চের ১ তারিখে। ওই শেষ, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি শাসন কার্যত ছিন্ন! একমাত্র নেতা, একমাত্র শাসক- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার হুকুমে চলছে সব মানুষ। সব প্রতিষ্ঠান। উকিল-মোক্তার, মাস্টার-ব্যাংকার। শিশু-কিশোর, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। তার কথাই তখন আইন। তার হুকুমই সংবিধান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ২৪ বছরের বৈষম্য, বঞ্চনা, অপমান, অসম্মানের প্রতিশোধ নিতে বাঙালিরা উন্মত্ত। পাকিস্তানের সবকিছুই অস্তিত্বহীন। নতুন পতাকা, নতুন ঘোষণা। প্রতিদিনের প্রতি মুহূর্ত উত্তেজনা, উত্তপ্ত। কী হয়, কী হয়! হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তার পেছনে বাংলার সব মানুষ। গন্তব্য স্বাধীনতা। কিন্তু খুব কৌশলে!

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বিশ্ববাসীকে দেখালেন তিনি কত বড় প্রাজ্ঞ, কত বড় ক‚টনীতিবিদদের কত বড় কৌশলী রাজনীতিবিদ! তিনি মানুষের নাড়ি বোঝেন। তার স্বপ্ন, বাঙালির স্বপ্ন একাকার! তখন তার এক হাতে ‘বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ ত‚র্র্য্য।’ একবার বাঙালিকে বলছেন, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে। আরেকবার বলছেন, তোমরা আমাদের ভাই! ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে প্রমাদ গোনে ইয়াহিয়া-ভুট্টো অশুভ চক্র। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ৪ শর্ত তাদের পক্ষে মানা সম্ভব নয়- তাই তারা ষড়যন্ত্রের পথে বাঙালিদের দমনে অগ্রসর হয়। কালক্ষেপণের লক্ষ্যে তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার আড়ালে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য সমাবেশের পরিকল্পনা নেয়। এবং ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ইয়াহিয়া-ভুট্টো রাতের আঁধারে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার হুকুম দিয়ে যায় কাপুরুষের মতো!

এই অপারেশন সার্চলাইটে ২৫ মার্চ রাতেই লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায় বর্বর দখলদার বাহিনীর হাতে। দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে ‘পোড়ামাটি নীতি’ নিয়ে নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিচারে হত্যা করে। ওরা হত্যা করে সাধারণ-অসাধারণ, বুদ্ধিজীবী সব স্তরের মানুষকে। ফসলের মাঠ, ধন-সম্পদ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ১ কোটি মানুষ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেই যে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা ‘যদি হুকুম দিবার নাও পারি, যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’- বাঙালিরা সে কথা ভোলে না। যার যা কিছু ছিল, তা নিয়েই শত্রুর মোকাবিলায় নেমে পড়ে রণাঙ্গনে।
জীবনের পক্ষে, মৃত্যুর বিপক্ষে; সত্যের পক্ষে, অসত্যের বিরুদ্ধে; স্বাধীনতার কাছে পরাধীনতার পরাজয় লক্ষ করল জগৎবাসী। ইতিহাস চিরদিন যে রায় দিয়ে এসেছে, সেই রায়ই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল বিশ্বের মানুষ। জয় হলো মানুষের, সত্যের, সভ্যতার, স্বাধীনতার। দানবের বিরুদ্ধে জয় হলো মানবের। স্বাধীনতার বেদিতে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হলেন। ২ লাখ মা-বোন দানবের নখরে ক্ষত-বিক্ষত হলেন। তবে শেষ পর্যন্ত জয় মানবের, মানবতার, সভ্যতা এবং শান্তির। সবকিছুর মূলে মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, তার কৌশল, তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।

২৬ মার্চ বাংলাদেশের ৪৯তম স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে আবারও আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, ৪ জাতীয় নেতা, সব বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা মা-বোনদের।

ঠিকানার সম্মানিত পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ীকে স্বাধীনতা দিবসের অতল শ্রদ্ধা। আসুন, বিজয়ের গৌরব ও স্বাধীনতার মহিমা আমরা ছড়িয়ে দিই বিশ্বময়। বাঙালির সব অর্জন নিয়ে এই প্রবাসেও আমরা সমৃদ্ধ হই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here