রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করাই উত্তম

3

বাংলার ইতিহাসে যত বড় বড় সফল আন্দোলন হয়েছে, তার মূলে ছিল রাজনীতি, জাতীয় ঐক্য। আর সাধারণ মানুষের সমর্থন বাঙালির বৃহত্তর সমঝোতা গড়ে ওঠে সেই ঐক্যে। রাজনীতিই ছিল সেসবের মূল উপাদান। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ, যে যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা বাংলাদেশ পাই, সেই জয়ের পেছনেও ছিল বৃহত্তর রাজনীতি এবং জাতীয় ঐক্য। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে বাঙালি নিধনে এবং মা-বোনের সম্ভ্রমহানিতে পশ্চিম পাকিস্তানের জংলি শাসকদের মদদ দিলেও প্রকৃত মুক্তিকামী বাঙালি সবাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।

৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। প্রায় ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে পাকিস্তানি জেনারেল আত্মসমর্পণ করে। প্রায় ৩০ লাখ বাঙালি শহীদ হন। ২ লক্ষাধিক মা-বোনের শ্লীলতাহানি করে পাকিস্তানি বাহিনী। সাড়ে ৩ বছরের মাথায় দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তখন থেকেই কোনো এক জাদুমন্ত্রে বাঙালিদের ঐক্য উধাও হয়। বিভক্তি ও বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে যায় দেশময়। জনে জনে বিভক্তি, ঘরে ঘরে বিভক্তি, স্বাধীন বাংলাদেশে যা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত ছিল না এবং সময়ের সঙ্গে এই পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং আরও অবনতির দিকেই ধাবমান।

সব কার্যেরই একটি কারণ থাকে। কারণ ছাড়া কোনো কার্যই সংঘটিত হয় না। আমাদের এই বিভাজনের পেছনেও অবশ্যই যৌক্তিক কারণ রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে, অবকাঠামোগত প্রশ্নে অনেক উন্নতি, অনেক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে বাংলাদেশে, এ কথা কারও অস্বীকার করার কোনো পরিস্থিতি নেই। এসব উন্নয়ন দৃশ্যমান। অতি উজ্জ্বল এবং বাস্তব। এ জন্য বর্তমান সরকার দেশের জনগণ এবং বাইরের মানুষেরও প্রশংসা পাচ্ছে। বলা হচ্ছে, উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ বলছে বিশ্ববাসী। বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের জন্য এসবই আনন্দের সংবাদ।

কিন্তু এসবই স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিকদের জন্য সবকিছু নয়। এর বাইরেও আরও কিছু কাম্য থাকে। মানুষ যেমন তার পেটের ক্ষুধা মেটার পর স্বাধীন মানুষের মনের ক্ষুধা অনুভব করে এবং সেই ক্ষুধা নিবৃত্তির দাবি জানায়। সে দাবি মেটানোর উদ্যোগও গ্রহণ করে। বাংলাদেশ এক মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই মার্চ মাস স্বাধীনতা অর্জনের মাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সে সময়ের রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে বাঙালিদের স্বাধীনতার জন্য যার যা ছিল তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। অতঃপর ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে বাঙালি নিধনে পাকস্তানি হানাদার বাহিনী সর্বাত্মক হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালিরাও চ‚ড়ান্ত স্বাধীনতার সংগ্রামে দলে দলে কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৯ মাস মরণপণ লড়াই করে ৩০ লাখ মানুষ স্বাধীনতার বেদীমূলে আত্মোৎসর্গ করে এবং ২ লক্ষাধিক মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠতম কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অর্জন করে।

কেন স্বাধীনতার জন্য মানুষ সব পিছুটান ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে? কেন জীবন দেয়? স্বাধীনতাহীনতায় মানুষ কেন বাঁচতে চায় না? এই আত্মদানের পেছনে স্বপ্ন থাকে সবারই। সেই স্বপ্ন ধরার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বর্তমান সভ্য এবং আধুনিক সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতি। মানুষের বিশ্বাস, মানুষের চাওয়া-পাওয়া প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে সেই রাজনীতির মাধ্যমে, যে রাজনীতি মানুষের পক্ষে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা সহজ হয় যে রাজনীতিতে, সেই রাজনীতির প্রতিষ্ঠা। গণতন্ত্রই পারে সেই রাজনীতি সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিতে।

বাঙালিদের কাছে স্বাধীনতার যে মূল শর্ত ছিল, তার শীর্ষে ছিল গণতন্ত্র এবং সম্পদ বণ্টনে সাম্য। ধনবাদী সমাজে শ্রেণিবৈষম্য থাকলেও কেউ খাবে, আর কেউ খাবে না-তেমনটা চলতে পারে না ভেবেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার যে ৪টি প্রধান শর্ত ঘোষণা করেছিলেন, তার মধ্যে গণতন্ত্র, সাম্য এবং অসাম্প্রদায়িকতাকে অন্যতম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন মানুষ। বঙ্গবন্ধু মানুষের রাজনীতি করতেন। মানুষের অন্তর্গত আকাক্সক্ষাকে অনুভব করতে পারতেন। পারতেন বলেই স্বাধীন বাংলাদেশ একটি সমতাভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র হোক চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, গণতান্ত্রিক সমাজ ছাড়া তার এই স্বপ্ন পূরণ হবে না। এবং তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হলে কৃষিক-শ্রমিক, যারা উৎপাদন করে, তাদের স্বপ্নও বাস্তবে রূপ নেবে না। প্রকৃত গণতন্ত্রই পারে সবার স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা পূরণের ব্যবস্থা খোলা রেখে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিতে।

অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, সমাজ সংস্কারক, কল্যাণকামী সব মানুষই জানে, গণতন্ত্র ছাড়াও একটি রাষ্ট্রে উন্নয়ন দেখা যেতে পারে। তবে সে উন্নয়ন কেবলই সমাজের উঁচু স্তরের কিছু মানুষের, যারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে। যারা ক্ষমতার অংশ, যারা ক্ষমতার সুবিধাভোগী। এ রকম ব্যবস্থায় রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি শক্ত হয় না। রাষ্ট্রের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাষ্ট্রের কল্যাণকর্মে অংশ নেয় না। সবাই সমানভাবে রাষ্ট্রকে আপন ভাবতে পারে না। বরং রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অংশ রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। তারা হতাশায় ভোগে, নিজেদের আর রাষ্ট্রের অংশ ভাবতে পারে না। তাদের সে ভাবনার সুযোগও দেওয়া হয় না। হতদরিদ্র মানুষও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তারা একেবারেই অস্বীকৃতির তালিকায় পড়ে গেল। তাদের স্বপ্ন অন্তরেই রয়ে গেল। স্বীকৃতি দূরে থাক, প্রকাশও পেল না!
তৃণমূলের মানুষেরাও তাদের স্বপ্নপূরণে গণতন্ত্রকেই একমাত্র পথ বলে গণ্য করে। কিন্তু আধুনিক গণতন্ত্র বলতে যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করতেন, সেই গণতন্ত্রের দেখা তারা পায়নি। পায়নি, কেননা অনেকেই মনে করেন, রাজনীতিকে ক্ষমতায় থাকার জন্য যতটুকু ব্যবহার করা হয়েছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য করা হয়নি। তাই তৃণমূলের মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। সে কারণে এত এত জীবন ও সম্ভ্রম বিসর্জনের পরও সাধারণ মানুষের কণ্ঠে আক্ষেপ ও হতাশা উচ্চারিত হয়।

অনেকেই মনে করেন, রাজনীতিবিদদের মনোজগতে প্রকৃত গণতন্ত্রের জায়গা হয়নি বলেই এই অবস্থা। কেউ কেউ বলে থাকেন, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রকাঠামো সেই পরাধীন আমলের মতোই রয়ে গেছে! স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন থাকলেও সেদিকে কেউ মনোযোগী হননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কী পরিকল্পনা ছিল, তাও কার্যকর হতে পারেনি স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় তাকে সপরিবারে হত্যা করার কারণে। আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বাধীনতার পরও অটুট থাকার কারণে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষাও অপূর্ণ থেকে গেছে।

প্রশ্নটি উত্থাপন করা এ কারণে খুব জরুরি যে, স্বাধীনতার ৪৮ বছর কেটে গেছে। ৪৮ বছরে যদি নাও হয়ে থাকে, তবে তা যে ভবিষ্যতেও হবে না, রাষ্ট্র পরিচালনায় এ রকম মানসিকতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। রাজনীতির জায়গাটি উন্নত না হলে, গণতান্ত্রিক না হলে, মুষ্টিমেয় মানুষ ধনী থেকে আরও ধনী হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোকামনাও পূরণ হবে না। সে অবস্থায় গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশের সুযোগ না হওয়ায় স্বাধীনতার আদর্শের জায়গাটিও দুর্বল হবে। সে ক্ষেত্রে মুখে গণতন্ত্র যতটা স্থান পাবে, বাস্তবে তার জায়গা হবে না। অনুন্নত বিশ্বে অনেক কিছুর আড়ালে অর্থনীতির ভারসাম্য, সমতাভিত্তিক উন্নয়নের জমিন ঢেকে রাখা হয়। তাই তো এ সময়ে চাক্ষুষ অনেক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি দেখা গেলেও সমাজের ভেতরে ভেতরে একটা ক্ষরণ চলে। সেই ক্ষরণে ধস ক্রমাগত বাড়তে থাকে। থামানো যায় না। শীর্ষ নেতা যত সদিচ্ছা নিয়েই সমাজের নেতিবাচকতা দূর করার কথা বলুন, আর জিরো টলারেন্সের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করুন, নিচের স্তরের অসহযোগিতা কিংবা স্বার্থপরতায় তা বাস্তবায়িত হওয়ার সুযোগ পায় না।

রাজনীতি যখন গণতন্ত্রের পথে, জনগণের আকাক্সক্ষার পথ ধরে অগ্রসর না হয়ে ক‚টকৌশল বা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়, তখন এ রকম অবস্থা তৈরি হয়। তাই রাজনীতি দিয়ে রাজনীতি মোকাবিলা করার কালচার চালু করতে হবে। যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন অকাতরে, স্বপ্নপূরণের সেই পথ তৈরি করতে হবে। মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা কখনোই পূরণ হবে না ওই পথ ছাড়া। ক‚টকৌশলের পথে ক্ষমতা ধরে রাখা যাবে, তবে মানুষের স্বপ্নপূরণের গণতান্ত্রিক পথ তৈরি করা যাবে না।
মার্চ মাস চলছে। মার্চ মাস স্বাধীনতার মাস। তাই সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার কথা বলা। মার্চ মাস স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনকের জন্মদিবস। এবার শততম জন্মদিবস।

আগামী বছর শততম জন্মবার্ষিকী। আমরা যেন তার কথা একবার ভাবি এ মাসে। তার ’৭১-এ ৭ মার্চের ভাষণ, পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে তার ভাষণের কথা একবার মনে করি। তার স্বপ্নের সোনার বাংলার রূপরেখার সন্ধান পাওয়া যাবে তার ভাষণগুলোতে। ওসবে মন না দিয়ে তার সোনার বাংলার রূপায়ণ সম্ভব হবে না। এ জন্য প্রয়োজন তার রাজনীতিকেও অনুসরণ করা।
আগামী মার্চ মাসে তার শততম জন্মবার্ষিকী সামনে নিয়ে আমরা যেন ভাবিÑ তিনি কেমন বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সকলের সবকিছু তিনি ত্যাগ করতে পারেন কিন্তু দেশের কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ত্যাগ করতে পারেন না। তিনি তাদের সম্মান করে কথা বলতে বলেছেন সবাইকে। আমরা আজ যে সবাই অফিসার সাব, মাস্টার সাব, সাংবাদিক সাব-সব ওই কৃষক-শ্রমিকের জন্য। কথাটা বঙ্গবন্ধু আমাদের মনে রাখতে বলেছেন। আমরা যেন তা মনে রাখি, যদি সোনার বাংলা গড়তে চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here