এগিয়ে চলো বাংলাদেশ

6

আমিনুর রশীদ পিন্টু: জাতীয়তাবাদ, বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। কেউ বলছেন দেশজ উৎপাদন এবং সম্পদের সুষম বণ্টন অথবা নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতির পরিপূর্ণ লালন। অবশ্য ভৌগলিক সীমারেখার ব্যাপারটিও রয়ে গেছে। তবুও অনেক সুপণ্ডিত (?) এবং রাজনীতিবিদ আস্ফালন করেন- পতাকা, গান বা স্লোগান সবকিছুই অন্যের কাছ থেকে ধার নেয়া। সেগুলির পরিবর্তন প্রয়োজন। তারা ভুলে যান- পরিবর্তন যা হবার, সেটি হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন পরিবর্ধন, সামনে এগিয়ে চলার জন্য যুগোপযোগী কর্মধারা পরিকল্পনা। এসব বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাঝ দিয়েই একটি দেশ ও রাষ্ট্র তার নিজস্ব সীমারেখায় সুষ্ঠু জীবনযাপন নিশ্চিত করবে।

জাতীয়তাবোধ গড়ে ওঠে সেইসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য, যারা তাদের প্রতিদিনের কায়িক পরিশ্রম আর মেহনত দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখেন। কৃষিজ ক্ষেত্র থেকে শিল্প-কারখানায় যে উৎপাদন- সেটাই রাষ্ট্রীয় জীবনধারাকে সচল রাখে। এই সচলতাই হচ্ছে প্রবৃদ্ধি। জাতীয়তাবোধের জাগরণ সেখান থেকেই।

আমেরিকার জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব ড্যানিয়েল ওয়েবস্টার তার এক সুচিন্তিত বাণীতে বলেছিলেন- হতে পারে আমাদেরও ভাষা ইংরেজি। যে ব্রিটিশরাজকে বিতাড়িত করেছি আমরা, তাদেরও ভাষা ইংরেজি। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনপ্রণালী হবে তাদের থেকে আলাদা। আমাদের উচ্চারণ এবং ব্যক্তিত্ব হবে তাদের থেকে ভিন্ন।

এ মতবাদটি বাংলাদেশের জাতীয়তাবোধ আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানি উপনিবেশের ভাষা আমরা কেনো রপ্ত করবো? কেনো আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনের জোয়াল কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে? কেনোইবা আমাদের দেহ-ঘাম ঝরা মেহনতের ফসলকে তুলে দেবো বেনিয়া শক্তির কাছে? এসব বিষয়বস্তুর সামগ্রিক রূপ হচ্ছে- জাতীয়তাবোধ। এই বোধ হচ্ছে একটি মুক্তি। মানুষ চায় দুঃশাসনের কষাঘাত থেকে মুক্তি। এই বোধ থেকেই উন্মেষ হয়েছিলো মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের। যার জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। শূন্য হয়েছে মেধা, শূন্য হয়েছে মায়ের কোল। কিন্তু সংকল্প থেকেছে অটুট। এই মননশক্তিতে যেনো কোনো দ্বিমত না হয়, সেটাই প্রাধান্য পাওয়া উচিৎ প্রতিটি নাগরিকের প্রতিদিনের চিন্তাধারায়।
পরম করুণাময় রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন- মানুষকে আমি সৃষ্টি করেছি সত্যি, কিন্তু তাদের শক্তি যে এতো অপরিসীম, তাতে আমিও বিস্মিত।

সুতরাং প্রতিটি মানুষ যেমন সৃষ্টি হয়েছে একটি বিশেষ কারণে, তেমনি তাদের সৃষ্টি শক্তিকেও প্রয়োগ করতে হবে মানবজাতির কল্যাণে। এই হীতব্রত যতোদিন না আমরা মনেপ্রাণে ধারণ করতে পারবো, ততোদিন পর্যন্ত হিংসা-দ্বেষ-ঘৃণা থেকে আমাদের মুক্তি নেই। এসব সংকীর্ণতা এবং হীনতাও আরেক বন্ধ শৃঙ্খল। মানুষই পারে তাদের বোধশক্তি দিয়ে, বিবেক ও চিন্তা দিয়ে আরেকটি বোধকে জাগ্রত করতে। সেই বোধটিই হচ্ছে মানবতার কল্যাণ। এই মঙ্গলকল্পে যুগে যুগে মানুষ তার প্রাণশক্তিকে নিবেদন করেছে। আমরাও তাহলে কেনো পারবো না? ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো প্রতিক‚লতা দানব হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আরো একটি বিষয় এখানে প্রাধান্য পায়, সেটি হচ্ছে- সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে বিস্তৃত করা। সংস্কৃতিই হচ্ছে জাগরণের প্রথম সূর্য। আর সংস্কৃতি শুধু বাদ্য-বাজনার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের জীবনের আচার-আচরণও একটি সংস্কৃতির পরিচায়ক। সেটির সুসংরক্ষণও জাতীয়তাবোধের নীতিমালাতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দীর্ঘ নয়টি মাসের অপরিসীম ত্যাগ, রক্তক্ষয় আর নিঃশঙ্ক সংগ্রামের মাঝ দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। দেশটি এখন আর বিদেশিদের ধারণা মতো BASKET CASE নয়। পত্র-পত্রিকায় বলা হচ্ছে উন্নয়নমুখী একটি দেশ। এই সাফল্য দেখে গোটা পৃথিবী আজ বিস্মিত।
ধনীদেশগুলি এখন তাই বিনিয়োগে উদ্যোগী। এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের উৎপাদন ক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করবে। এতে অর্থনীতি হবে সুদৃঢ়। যার ফলে উপার্জন বাড়বে। এবং সরকারি প্রশাসন দারিদ্র্য-অশিক্ষা ও অপুষ্টি নিরোধ করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন একাত্মতা। প্রয়োজন বৈরীশক্তির বিরুদ্ধে আরো একটি সুশৃঙ্খল সংগ্রাম। কথায় বলে- যখন শতকোটি মাকড়শা একটি জাল বুনে, তখন হিংস্র বাঘও তাকে ছিঁড়তে পারে না।
যে সমস্ত অপশক্তি এখনো আমাদের স্বাধীনতার গর্বকে খর্ব করতে চায়, তাদেরকেও সমূলে বিনষ্ট করতে হবে, সেই সামগ্রিক আত্মশক্তির অহঙ্কার দিয়ে।

মনে রাখা প্রয়োজন- আজ যে মুক্ত বায়ু এবং মুক্ত স্বদেশের বিজয়ের আনন্দে গোটা দেশ উৎফুল্ল, তার জন্য অগণিত প্রাণের বিনিময় হয়েছে। নিজের ভাইকেও হারিয়েছি (শহীদ মনসুরুর রহমান)। দুঃখ-শোকের ক্ষতচিহ্ন বুকে লেগে আছে এখনো। তবু বলি- এ দেশ আমার গর্ব। এ দেশ আমার অহঙ্কার। এই মাটিকে ঘিরেই আমাদের প্রতিদিনের জীবন-সংগ্রাম আর জীবন ক্ষয়। জয় বাংলা।
-নিউ জার্সি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here