লুকোচুরির ‘নির্বাচনী ফুটবল একাডেমি’

1

মোজাম্মেল হক চঞ্চল : যেন ‘নির্বাচনী ফুটবল একাডেমি’ চালু করল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। গত ৫ এপ্রিল রাজধানীর বাড্ডার বেরাইদে অনেকটা গোপনেই যাত্রা শুরু হয়েছে। প্রেস রিলিজ দিয়ে বাফুফে একাডেমি শুরুর কথা জানিয়েছে। আনুষ্ঠানিক কোনো উদ্বোধন হয়নি। অথচ বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেট ফুটবল একাডেমি উদ্বোধনের জন্য পাঁচজন মন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বেরাইদে কয়েকজন ফুটবলার নিয়ে শুরু করা এই একাডেমি ক’দিন চলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ফুটবল সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সামনের বছর নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে এই একাডেমি ব্যবহার করবেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। ২০১৬ সালে তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার বাফুফে সভাপতি বলেছিলেন, একাডেমি, খেলোয়াড় তৈরির কাজ ক্লাবের, বাফুফের নয়। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আবার একাডেমিতে মনোযোগ দেয়া হয়েছে মূলত নির্বাচনী কারণে। তরফদার রুহুল আমিন বাফুফের সভাপতি প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি তরুণ ফুটবলারদের নিয়ে টুর্নামেন্ট করছেন। একাডেমি নিয়ে কাজ করছেন। রুহুল আমিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে সালাউদ্দিন এ নির্বাচনী একাডেমি তৈরি করেছেন। ২০১৬ সালে বাফুফে নির্বাচনে সালাউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত পরিষদের ইশতেহারে বলা হয়েছিল, প্রত্যেক জেলায় কমপক্ষে একটি করে একাডেমি তৈরি করা হবে।

কিন্তু নতুন একাডেমি তৈরি দূরে থাক, সিলেট বিকেএসপি ফুটবল একাডেমিই বন্ধ করে দেয় বাফুফে। একাডেমির জন্য ফিফা সাত লাখ ডলার দিয়েছিল। সেই অর্থ হিসাব বিবরণীতে দেখায়নি বাফুফে। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার ফিফা অনুদান একাডেমির পেছনে খরচ হয়নি। তৃতীয় মেয়াদে বাফুফের সভাপতি হওয়ার পর থেকেই একাডেমির স্বপ্ন দেখিয়ে চলেছেন কাজী সালাউদ্দিন। ২০০৮ সালে প্রথম মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই আয়াক্স আমস্টারডাম, চেলসি একাডেমির আদলে একাডেমি গড়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু একাডেমি নিয়ে কম নাটক করেনি বাফুফে। ২০০৯ সালে গাজীপুরে ৩০০ বিঘা জমিতে নিজস্ব অর্থায়নে একাডেমি করার ঘোষণা দেন সালাউদ্দিন। সেই ঘোষণা থেকেও সরে আসেন তিনি। ফুটবল একাডেমি পরিচালনার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিন বছরে ২৪ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছিল। তার কিছুই হয়নি। সবই ছিল বাফুফে সভাপতির স্টানবাজি। সিলেট বিকেএসপিকে ফুটবল একাডেমি করার জন্য ঘটা করে উদ্বোধনের নামে কয়েক লাখ টাকার শ্রাদ্ধ করা হয়। কিছুদিন বয়সভিত্তিক ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালিয়ে হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয় একাডেমি। অনেক তরুণের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। ফুটবল ছেড়ে তারা অন্য পেশায় চলে যান। রাশিয়ার সঙ্গে ফুটবল উন্নয়নেরও চুক্তি করেছিল বাফুফে। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলগুলোর রাশিয়ায় গিয়ে অনুশীলনের সুযোগ পাবে এবং রাশিয়া তাদের কোচ পাঠিয়ে এ দেশের ফুটবলের উন্নয়নে অবদান রাখবে। অথচ পাঁচ বছরেও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি বাফুফের ব্যর্থতায়।

একাডেমির টাকা নয়-ছয়ের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে এসেছে। সেই অভিযোগে কাজী সালাউদ্দিন, নির্বাহী সদস্য মাহফুজা আক্তার কিরণ ও বাফুফের প্রধান হিসাব কর্মকর্তা আবু হোসেনের কাছে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক। তার মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে একাডেমির জন্য ফিফার দেয়া অর্থের বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে।
সরকার যায়। সরকার আসে। কিন্তু বাফুফের চেয়ারে বসা মানুষের বদল হয় না। বদলায় না কর্মসূচিও। ক্রমেই পেছাচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবল। পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন দরকার ছিল বাফুফেতে। কিন্তু তা হয়নি। ফুটবলের ভীতিটা এখন আর নেই। উপড়ে যাওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান কমিটির ১০ বছরে সেই খাড়াবড়ি থোড় আর থোড়বড়ি খাড়ার গল্প। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ একটিও আয়োজন করেনি। হয়নি সোহরাওয়ার্দী কাপ জাতীয় যুব ফুটবল প্রতিযোগিতা। জেলা ফুটবল স্থবির।

প্রিমিয়ার ফুটবল লিগের নামে চলছে তামাশা। পাতানো ম্যাচ আর রেফারির পক্ষপাতিত্ব- দর্শকরা মাঠমুখো হন না। তার মধ্যে রয়েছে কর্মকর্তাদের একচোখা নীতি। কখনও মনজুর কাদের, কখনোবা কাজী নাবিল, বাফুফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই তোষণনীতির কারণে ফুটবলটা সেই ব্যর্থতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ৯ বছরে তিনবার কোটি টাকার সুপার কাপ করে আবার ঝিমিয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু কাপের নামে নিম্নমানের দল এনে জাতির জনককে খাটো করেছে বাফুফে। শুধু তা-ই নয়, চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপের প্রাইজমানি না দিয়ে আন্তর্জাতিকমহলেও দেশকে খাটো করেছে এই বাফুফে। তারও ধারাবাহিকতা নেই। সবকিছুই পিছিয়ে যাওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাংলাদেশের ফুটবল আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তা আর সেই অবস্থায় নেই। বাস্তবতা এটাই। যার প্রতিবিম্ব দেখা যায় ফিফা র‌্যাংকিংয়ে। এক ভুটানের কাছে হেরেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নির্বাসিত ছিল কয়েক বছর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here