জামায়াত ভেঙে নতুন দল গড়ার চেষ্টায় সংস্কারপন্থীরা

3

রাজনৈতিক ডেস্ক : নতুন দল গঠনের আলোচনা থেমে গেছে জামায়াতে ইসলামীতে। নতুন নামে দল গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি গঠিত হলেও এখনও ঘটেনি কোনো অগ্রগতি। এর মধ্যেই শোনা যাচ্ছে সংস্কারপন্থী নেতারা জামায়াত ছেড়ে নতুন দল গঠন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জামায়াত থেকে পদত্যাগ করা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ভূমিকা কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
জামায়াতে সংস্কার এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন দীর্ঘদিন নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালনকারী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। কয়েক বছর ধরে লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন তিনি।
আবদুর রাজ্জাক জামায়াত বিলুপ্ত করে একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চেয়ে নতুন নামে দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন দলের আমির মকবুল আহমাদকে। একই দিনে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। যিনি দলের মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন। তিনিও একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চেয়ে উদারপন্থী দল গঠনের পক্ষে ছিলেন।
রাজনৈতিক সূত্রের খবর, মজিবুর রহমান নতুন দল গঠনে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি নাগরিক সমাজের ব্যানারে রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে সভা-সেমিনার করে আলোচনায় রয়েছেন। তিনি নিজেও নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগের কথা অস্বীকার করেননি।
মজিবুর রহমান মঞ্জু গত ৪ এপ্রিল বলেন, প্রায় তিন দশক রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। ইসলামী আন্দোলন করেছেন। জামায়াতে না থাকলেও তিনি এখনও আন্দোলনে রয়েছেন। সংলাপ ও সেমিনার করছেন। আরও বড় পরিসরে কিছু করতে চান। কী করা যায় তা নিয়ে চিন্তা করছেন।

জামায়াতে ইসলামীর বুদ্ধিবৃত্তিক অংশের নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন মজিবুর রহমান মঞ্জু। দলটির অনেক নেতাকর্মী তার মতের সমর্থক বলে মনে করা হয়। তিনি বলেন, আমরা ভাবছি কী করা যায়। আমরা বলতে তিনি জামায়াতের নেতাকর্মীদেরও বোঝাতে চেয়েছেন কি নাÑ এ প্রশ্নে তিনি বলেন, তিনি অনেক দিন রাজনীতিতে ছিলেন। ইন্টেলেকচুয়াল ফিল্ডে কাজ করেছেন। যেখানে যেখানে কাজ করছেন, সেখানকার সহকর্মীদের নিয়েই কিছু করতে চাইছেন। শিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জু বলেন, জামায়াতে যারা তাদের মতো ভাবেন, তারাও থাকতে পারেন। তবে জামায়াত ভাঙার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে দাবি করে তিনি বলেন, তরুণদের তারা একটি প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা করছেন।
নতুন দলে আবদুর রাজ্জাক থাকবেন কি না, তা পরিষ্কার করেননি মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেছেন, তারা আবদুর রাজ্জাককে এখনও অ্যাপ্রোচ করেননি। ভবিষ্যতে করতে পারেন। ইসলামপন্থী নাকি ধর্মনিরপেক্ষ দল হবেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দল করলে তারা নিজে থেকেই গণমাধ্যমকে জানাবেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী যুদ্ধাপরাধী আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ার চার দিনের মাথায় ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ছাড়েন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। যিনি জামায়াত নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগে আইনজীবী ছিলেন। লন্ডন থেকে টেলিফোনে তিনি জানান, তিনি আর সক্রিয় রাজনীতি করবেন না। আপাতত দেশে ফেরারও ইচ্ছা নেই। আইন পেশার মাধ্যমে লন্ডনে থেকেই সমাজের কাজ করতে চান। তবে দেশে মধ্যপন্থী কোনো ইসলামী দল গঠিত হলে তাতে তার সমর্থন থাকবে। যদিও নেতৃত্বে আসবেন না।

জামায়াতের একাধিক নেতা এই ইস্যুতে কথা বললেও নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। দলটির একজন কর্মপরিষদ সদস্য বলেন, মজিবুর রহমান মঞ্জু দল গঠন করলে তা জামায়াতের জন্য ভাবনার কারণ নয়। কারণ খুব বেশি নেতাকর্মী তার সঙ্গে নেই। নতুন দল গঠন করলেও তারা হালে পানি পাবে না। রাজনীতির মাঠে এমন বহু দল রয়েছে নামসর্বস্ব। কিন্তু আবদুর রাজ্জাক সেই দলের নেতৃত্বে থাকলে জামায়াতের জন্য তা দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। কারণ, জামায়াতের তৃণমূলের তরুণ নেতাকর্মীর বড় অংশই তার সমর্থক।
এ কারণেই জামায়াত আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে এখনও বিরূপ কোনো মন্তব্য করেনি। বরং বিবৃতি দিয়ে তার অতীতের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। তার সঙ্গে সুসম্পর্ক অব্যাহত রাখার কথাও বলেছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দলের নেতাদের জন্য জারি করা নির্দেশনাতেও আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বহিষ্কার হওয়া মজিবুর রহমান মঞ্জুর বেলায় উদারতা দেখায়নি জামায়াত। তার বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দল ভাঙার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মঞ্জুও অভিযোগ করেন, তার গতিবিধি নজরদারিতে রাখতেন জামায়াতের নেতারা।

এ দিকে সংস্কারপন্থীদের নতুন দল গঠনের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও জামায়াতের নতুন নামে দল গঠনের প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দলের তৃণমূলের নেতাদের জন্য জারি করা এ নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, মজলিসে শূরার পরামর্শে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ নতুন নামে দল গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হলেও নতুন দল গঠনে অগ্রগতি নেই বলে নিশ্চিত করেছে জামায়াত সূত্র।
সূত্রটি বলেছে, অতীতেও সংস্কারপন্থীদের চাপে কমিটি করা হয়েছিল। সেবারও কিছুই করা হয়নি। এবারও কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ পরিস্থিতি ঠা-া হয়ে গেছে বলে মনে করছেন জামায়াত নেতৃত্ব। দল ভাঙার আর ঝুঁকি নেই বলেও মনে করেন তারা। কারণ কমিটির অধিকাংশ সদস্য সংস্কারের বিরোধী। সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের কারাবন্দী রয়েছেন।
এই সূত্র জানায়, জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব দলকে ভোটের রাজনীতি থেকে চিরতরে দূরে রেখে সামাজিক সংগঠন হিসেবে কাজ করতে রাজি হলেও একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে রাজি নয়; আবদুর রাজ্জাকের পরামর্শ অনুযায়ী সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত এবং নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ রয়েছে এমন একটি মধ্য ডানপন্থী দল গঠনে আগ্রহী নয়।

নতুন নামে দল গঠনের অগ্রগতি সম্পর্কে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেছেন, এখন পর্যন্ত বলার মতো কিছু নেই। দেশ, দল ও নেতাকর্মীদের জন্য ভালো হবে, এমন সিদ্ধান্তই নেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি। কোনো সিদ্ধান্ত হলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সর্বোচ্চ আদালত জামায়াতে ইসলামীকে অপরাধী দল বলেছে। সরকার একাত্তরে যুদ্ধাপরাধসহ স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতার কারণে এই দল নিষিদ্ধে আইনের কথা বলছে। বিভিন্ন সূত্র মতে, নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত নতুন নামে দল গঠনের দিকে যেতে রাজি নয় জামায়াতের রক্ষণশীল নেতৃত্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here