বিএনপির নির্বাচিতরা শপথ নেয়ার চাপে

3

রাজনৈতিক ডেস্ক : স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনগণের চাপের মুখে আছেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা। সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ নেয়ার ব্যাপারে তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে কয়েকজন সদস্য অবশ্য শপথ নেয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাবও পোষণ করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত ও খালেদা জিয়ার কারাবাস প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে তারা অবশ্য সংসদে যেতে নারাজ। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় চেয়ারপারসনের প্যারোলে মুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের শপথের বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচিতরা শপথের জন্য আরও ২৩ দিন সময় পাচ্ছেন। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে এ মুহূর্তে দলের অভ্যন্তরে এ শপথ সবচেয়ে বেশি আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে শীর্ষ নেতাসহ নির্বাচিতদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে মত আছে। অনেকে মনে করেন, এত কম আসন নিয়ে সংসদে জনগণের পক্ষে তেমন কোনো ভূমিকা রাখা যাবে না। বরং জনগণ যে নির্বাচন দেখেছে তা বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের দাবি গৌণ হয়ে যাবে। এতে বিএনপির প্রতি জনগণের ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, শপথ নেয়ার সঙ্গে যদি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হয় তাতে আপত্তি থাকার কথা নয়। কেননা খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে বিএনপির রাজনীতি গতি পাবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির পাশাপাশি ২৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে করা ৯০ হাজার মামলা প্রত্যাহার ছাড়া কোনো সমঝোতা হতে পারে না। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ করেই এ ব্যাপারে দলের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে মনে করেন তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি বা দলের নির্বাচিতদের সংসদে যাওয়ার বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে দলীয়ভাবে নির্বাচিতদের শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের মো. হারুন অর রশীদ বলেন, শপথ নেয়ার বিষয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। এলাকার লোকজন তো আওয়ামী লীগের জুলুম থেকে বাঁচার জন্য শপথ নেয়ার কথা বলছেন। কিন্তু আমি ৪০ বছর ধরে বিএনপি করি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কিছু করার প্রশ্নই আসে না। নেত্রীর মুক্তি হলে সংসদে যাওয়ার একটা দরজা উন্মুক্ত হতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকার জনগণের ভীষণ চাপ রয়েছে। শপথ নিতেই হবে এমন কথাবার্তা তাদের। তবে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে নয়। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে বিজয়ী জাহিদুর রহমান বলেন, এলাকার ৯০ শতাংশ কর্মী-সমর্থক শপথ নিয়ে সংসদে যাওয়ার পক্ষে। তারা মনে করছেন, শপথ না নিলে এলাকাটি বিএনপির হাতছাড়া হয়ে যাবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া বলেন, স্থানীয় জনগণ তো চায় আমি সংসদে যাই। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার হয়তো সুযোগ আছে কিন্তু তা মানবিক হবে না। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে আমি যেতে পারি না। এ বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় কোনো নেতার সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি বলেও জানান তিনি। তবে বগুড়া-৪ আসনে বিজয়ী মোশাররফ হোসেন বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে শপথ নিয়ে বিভক্তি আছে। অনেকে মনে করেন, শপথ নিয়ে কোনো লাভ হবে না। এখন দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন তিনি।
সূত্র জানায়, শপথ নিয়ে বগুড়া-৬ আসনের দলীয় নেতাকর্মীরাও নানা বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম শাহীন বলেন, এলাকায় নেতাকর্মীরা শপথ না নেয়ার বিষয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তই সঠিক বলে মনে করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু খালেদা জিয়ার মুক্তির একটা ব্যাপার আছে। তাকে তো মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে সরকার। এর কারণে তার মুক্তির শর্তে শপথ নেয়া হলে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের সমর্থন থাকবে।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষস্থানীয় নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, শপথ না নেয়ার বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত অটুট আছে। আইন অনুযায়ী, সংসদ বসার তিন মাসের মধ্যে শপথ নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ হিসাবে আগামী ৩০ এপ্রিলের আগেই শপথ নিতে হবে ঐক্যফ্রন্টের বিজয়ী প্রার্থীদের।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের আটজন বিজয়ী হন। এর মধ্যে গণফোরামের দলীয় মনোনয়নে ও বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে নির্বাচিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ দল ও ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ৭ মার্চ শপথ নেন। এ কারণে দল ও ফ্রন্ট থেকে তাকে ওইদিনই বহিষ্কার করা হয়। সুলতান মনসুরের পথ ধরে গণফোরামের দলীয় মনোনয়নে ও নিজ দলের প্রতীক ‘উদীয়মান সূর্য’ প্রতীকে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত মোকাব্বির খানও গত ২ এপ্রিল শপথ নেন।
বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান শপথ নেয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল বলেন, তারা বেইমান। জনগণের সঙ্গে বেইমানি করেছে, প্রতারণা করেছে। এটা তার নিজের দলের সঙ্গে, জনগণের সঙ্গে এবং ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রতারণা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এ কারণে জোট থেকে নির্বাচিতদের শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিজয়ীদের মধ্যে ছয়জন বিএনপির। তারা হলেনÑ বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বগুড়া-৪ আসনে মোশাররফ হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে মো. হারুন অর রশীদ, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জাহিদুর রহমান ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here