এরশাদের অবর্তমানে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের

2

রাজনৈতিক ডেস্ক : সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের অবর্তমানে তার ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জি এম) কাদেরই হবেন দলটির চেয়ারম্যান। গত ৬ এপ্রিল এরশাদ এক চিঠিতে দলের উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করেন।
চিঠিতে এরশাদ বলেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে পার্টির সর্বস্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখছি যে, আমার অবর্তমানে পার্টির বর্তমান কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আশা করি পার্টির জাতীয় কাউন্সিল আমার মতো তাকেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে পার্টির সার্বিক দায়িত্ব তাকে অর্পণ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে আমি যত দিন দায়িত্ব পালন করব, গোলাম মোহাম্মদ কাদের আমাকে সহযোগিতা করবেন।’

এরশাদের সম্পদ ভাগবাটোয়ারা এবার সব সম্পত্তি পেল ট্রাস্ট

রাজনৈতিক ডেস্ক : জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি একটি ট্রাস্টকে দান করেছেন। গত ৭ এপ্রিল বিকেল ৪টায় বারিধারার বাসভবনে পাঁচ সদস্যের এই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন তিনি। পরে লিখিতভাবে বোর্ডকে সম্পত্তি দান করেন। বোর্ড গঠনের সময় উপস্থিত ছিলেন পার্টির সভাপতিম-লীর সদস্য এস এম ফয়সল চিশতি। তিনি বলেন, মূলত স্যার তার অটিস্টিক ছেলে এরিকের জন্যই এই বোর্ড গঠন করলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর যেন এরিককে কারও দ্বারস্থ হতে না হয়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা স্যারের। স্যারের শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। কখন কী হয় তা বলা যায় না। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই তিনি ট্রাস্ট গঠন করে সম্পত্তি ট্রাস্টকে দিলেন। এর আগেও একবার সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারার কথা শোনা গিয়েছিল জানতে চাইলে পার্টির এই নেতা বলেন, আমরা জানি না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা বলেন, আমি খুব ব্যস্ত আছি। গত ৮ এপ্রিল কথা বলব।
ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা হলেনÑ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, তার ছেলে এরিক এরশাদ, ব্যক্তিগত সহকারী মেজর (অব.) খালেদ আখতার, চাচাতো ভাই রংপুরের মুকুল ও এরশাদের পারসোনাল স্টাফ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর।
গত কয়েক দিন ধরেই জাপায় অস্থিরতা চলছে। গত ২২ মার্চ গভীর রাতে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ও পরের দিন বিরোধী দলের উপনেতা থেকে বাদ দেন এরশাদ। উপনেতা করেন পার্টির আরেক কো-চেয়ারম্যান স্ত্রী রওশন এরশাদকে। এই নিয়ে পার্টিতে অস্থিরতা চলছিল। কিন্তু দুই সপ্তাহ না পেরুতেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে গত ৪ এপ্রিল রাতে পুনরায় কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয় জি এম কাদেরকে। গত ৬ এপ্রিল সকালে এরশাদ তার অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হবেন জি এম কাদের এমন এক সাংগঠনিক নির্দেশনাও গণমাধ্যমে পাঠান। এমন অবস্থার মধ্যেই গত ৭ এপ্রিল ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে সব সম্পত্তি দান করে আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দিলেন এরশাদ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এরশাদের ঘনিষ্ঠ পার্টির আরেক সভাপতিম-লীর সদস্য বলেন, ট্রাস্টি বোর্ডে দান করা সম্পত্তির বর্ণনা দেননি এরশাদ। শুধু দানের কথা বলা হয়েছে। ফলে এরশাদের ঠিক কী পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে, তা জানা যায়নি।

পার্টির কয়েক নেতা বলেন, গত জানুয়ারিতেও একবার এরশাদ তার সব সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা করে দিয়েছেন বলে আমরা শুনেছিলাম। তখন তার সম্পত্তির একটি বিবরণ ও কাকে কী সম্পত্তি দেওয়া হলো এমন কথাও জানতে পেরেছিলাম আমরা।
পার্টির নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এরশাদ তার বড় ছেলে আল মাহিগীর শাদ এরশাদ (রওশন এরশাদের সঙ্গে থাকেন), ছোট ছেলে শাহতা জারাব এরিক (বিদিশা এরশাদের ঘরের), পালিত কন্যা জেবিন (লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন) ও ভাই-ভাতিজার মধ্যে সম্পদের বড় অংশ ভাগ করে দেন। কিছু সম্পদ এরশাদের কয়েকজন পালিত কন্যা এবং কিছু সম্পত্তি পার্টির অফিস ও এতিমদের জন্য ট্রাস্টে দেওয়া হয়েছে বলেও তখন প্রচার পায়।
পার্টির নেতারা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ। উন্নত চিকিৎসা নিতে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং এসেই ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি হন। ওই সময় সম্পত্তি ভাগভাটোয়ারার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরশাদের কী পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে জানতে চাইলে পার্টির কয়েক নেতা বলেন, রংপুরে বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তি এবং রংপুর সদরের পদাগঞ্জে কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। গুলশান-২ এর বাড়িটি রওশন এরশাদকে দিয়েছেন এরশাদ বহু আগেই। বারিধারার ১০ নম্বর দূতাবাস রোডের ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’ যেখানে তিনি নিজে বসবাস করেন, সেটি তার সাবেক স্ত্রী বিদিশা এরশাদের একমাত্র ছেলে এরিক এরশাদের নামে দেওয়া হয়েছে। পালিত পুত্র আরমানকে দেওয়া হয়েছে গুলশানের অপর একটি ফ্ল্যাট। রংপুরের সম্পত্তি পেয়েছেন তার ভাই জি এম কাদের ও এক ভাতিজা। রংপুরের জাতীয় পার্টি অফিস দলকে দান করেছেন। কয়েক বছর আগে চলচ্চিত্র পরিচালক শফি বিক্রমপুরির কাছ থেকে কেনা ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টির প্রধান কার্যালয়টি এরশাদের ব্যক্তিগত নামে ছিল। এটি তিনি পার্টিকে দান করেছেন। এরশাদের গুলশান-বনানী এলাকায় বিভিন্ন মার্কেটে দোকান রয়েছে। এরশাদের নগদ টাকাসহ সম্পত্তি কী কী আছে তা পরিষ্কারভাবে দলীয় নেতাকর্মীরা জানেন না।
‘কী পরিমাণ সম্পত্তি এরশাদের রয়েছে, তা কেউ জানে না’ বলে জানান পার্টির এক প্রেসিডিয়াম মেম্বার। তিনি বলেন, আমরা মুখে মুখে যেটুকু শুনি, সেটুকুই। স্যার নিজেও কোনো দিন এসব নিয়ে গল্প করেন না।

পাহারায় এরশাদ

রাজনৈতিক ডেস্ক : আনপ্রেডিক্টেবল এরশাদের অবস্থা এখন গল্পের ‘মিথ্যবাদী রাখালের’ মতো। ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ দূরের কথা দলের নেতাকর্মীরাও বিশ্বাস করেন না। কখন সিদ্ধান্ত বদল করেন সে শঙ্কা সবার। সে জন্য সবশেষ সিদ্ধান্ত যাতে পরিবর্তন করতে না পারেন সে জন্য ‘পাহারা’ দিয়ে রাখা হয়েছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে। গত ৬ এপ্রিল জি এম কাদেরকে আগামীতে দলের চেয়ারম্যান পদে বসানোর সাংগঠনিক নির্দেশনার পর শতাধিক নেতাকর্মী বারিধারার দূতাবাস রোডের এরশাদের বাসা ‘প্রেসিডেন্ট পার্কে’র সামনে পাহারায় বসেন। নেতাকর্মীরা জানান, দলের ভেতরে যে সিন্ডিকেট জাপাকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বি-টিম বানিয়ে হালুয়া-রুটি খাচ্ছেন তারা জি এম কাদেরকে পছন্দ করছেন না। তাদের ধারণা জাপা সংসদে বিরোধীদলের বদলে সরকারের তোষামোদী করলে নিজেরা আয়-রোজগার কমে যাবে। সে জন্য জি এম কাদের তাদের নাপছন্দ।

সূত্র জানায়, ‘বনানী সিন্ডিকেট’ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন নেতা দীর্ঘদিন থেকে এরশাদকে ব্যবহার করে সরকারের সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। কেউ মন্ত্রী-এমপি হয়ে কেউ এরশাদের নাম ভাঙিয়ে নিয়োগ বদলি বাণিজ্য করে আয় রোজগার করছেন। এই সিন্ডিকেটে বনানী অফিসের কর্মচারী কাম প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে শুরু করে সিনিয়র কয়েকজন নেতা পর্যন্ত রয়েছেন। তারা রওশনের ওপর ভর করে এরশাদকে ফুসলিয়ে পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতা জি এম কাদেরকে সরিয়ে দেন। এবার যাতে অসুস্থ এরশাদকে ফুসলিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে না পারেন সে জন্য পাহারা বসানো হয়েছে। দিনরাত পাহারারত এক নেতা জানান, তারা সুবিধাবাদী সিন্ডিকেটের কোনো নেতাকে প্রেসিডেন্ট পার্কে ঢুকতে দেবেন না।

মূলত সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টিতে চলছে অস্থিরতা। গণবিচ্ছিন্ন দলটি এরশাদের সুবিধাবাদী কৌশলের কারণে ইতোমধ্যেই নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়ে গেছে। সারা দেশের হাজার হাজার নেতাকর্মী দলটি থেকে সরে গেছেন। এর মধ্যে একের পর এক নাটক করছেন অসুস্থ এরশাদ। গত ২২ মার্চ রাতে কো চেয়ারম্যান পদ থেকে জি এম কাদেরকে অব্যাহতি দেন। পরের দিন সংসদের উপনেতা পদ থেকেও সরিয়ে দেন। অতপর রংপুর বিভাগের নেতাদের প্রতিবাদ এবং আল্টিমেটামে ৪ এপ্রিল জি এম কাদেরকে পুনরায় কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন। গত ৬ এপ্রিল এক সাংগঠনিক নির্দেশে এরশাদ তার অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হবেন জি এম কাদের এমন নির্দেশনা গণমাধ্যমে পাঠান। এরশাদের সর্বশেষ এ নির্দেশনা যাতে আর কেউ পরিবর্তন করতে না পারে সেজন্য শতাধিক নেতাকর্মী পাহারায় বসেছেন বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্ক বাসভবনের সামনে। এমন পরিস্থিতিতে জাপার সুবিধাবাদী সিনিয়র নেতারা এরশাদের বাসভবন এড়িয়ে চলছেন বলে জানা গেছে। পাহারারত নেতা মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক বলেন, জি এম কাদেরকে নিয়ে আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে কোনো নেতা এরশাদের বাসভবনে এলে তাদের প্রতিহত করা হবে। হাসিবুল ইসলাম জয় বলেন, পার্টির মাঝে ঘাপটি মারা থাকা কুচক্রীরা পার্টিকে অস্থিতিশীল করে তোলার মচেষ্টা করছেন। তাদের প্রতিহত করা হবে। জানতে চাইলে জি এম কাদের বলেন, মুষ্টিমেয় একটা গোষ্ঠী কাজ করছে। হাতেগোনা পাঁচজন অ্যাকটিভলি আমার পেছনে লেগেছে। তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে। এদের কেউ কেউ সংসদে আছেন, কেউ বাইরে। তাদের কাছে রাজনীতি অনেকটা ব্যবসার মতো হয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বার্থটার্থ মিলিয়ে অনেক কারবার হয়েছে কয়েক বছরে। তারা যদি দলের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করতে চান, তবে এসব ছাড়ুন। না হলে দল থেকে চলে যান। আমাদের দল টিকে থাকবে। আমার বিশ্বাস, শতকরা ৯০ ভাগের উপর নেতাকর্মী আমার সঙ্গে থাকবে। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, জি এম কাদের চেয়ারম্যান হবেন, এটা আমিও চাই। তবে এই যে পরিবর্তন, সেটা সবার ভোটে হলে ওনার গ্রহণযোগ্যতা কর্মীদের মাঝে বাড়বে।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্র থেকে শুরু করে শেকড় পর্যায়ের প্রায় অর্ধশত নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা সবাই মনে করেন এরশাদের অবর্তমানে জি এম কাদের হচ্ছেন যোগ্য নেতা। তার ব্যাক্তিত্ব, পড়াশোনা, দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান এমনকি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলাফেরা সবকিছুই কর্মীদের পছন্দ। তবে জি এম কাদেরকে কর্মীমুখী হতে হবে। রওশনকে ব্যবহার করে জাপাকে সরকারের ঘরে বন্ধক রেখে যারা সুবিধা নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা কাদেরকে পছন্দ করেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নেতা বলেন, জি এম কাদের এখনো আমলাদের মতো আচরণ করেন; তাকে কর্মী বান্ধব হতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here