দুয়ারে বৈশাখ

7

যেসব দিনকে আমরা আনন্দ নিয়ে বরণ করার জন্য অপেক্ষায় থাকি তার মধ্যে একটি হলো বাঙলা নতুন বছরের বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি। বাঙালির প্রাণের উৎসব এ বর্ষবরণ। আসন্ন নববর্ষের এ দিনটি তাই রঙে রঙে আনন্দময় করতে নতুন পোশাক আর সাজে নিজেকে অনন্য করে তোলার চেষ্টা থাকে সবারই।-হাবীবাহ নাসরীন

পোশাক : বৈশাখে সুতি শাড়ি বেছে নেয়া ভালো। আগে সাদা-লাল পাড়ের শাড়ি পরা হতো; কিন্তু এখন নানা রঙের শাড়ি পরা হয় বৈশাখে। বৈশাখে নানা রঙের শাড়ি পরে মেয়েরা। একরঙা সুতি শাড়িতে চিকন পাড় ভালো লাগে। যেহেতু গরম তাই হাফহাতা বা সিøভলেস ব্লাউজ পরতে পারেন। আবার শাড়ির সঙ্গে মিল রেখে বাটিকের ব্লাউজ পরতে পারেন। এ দিনে শাড়ি বাঙালি স্টাইলে পরলেই ভালো লাগবে। অনেকেই শাড়ির বদলে গরমের জন্য সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া পরতে পছন্দ করেন। যেহেতু উৎসবটি একেবারে দেশীয় সংস্কৃতির তাই মেয়েদের জন্য শাড়ি, আর ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবিটাই বেশি মানানসই।

ফ্যাশনহাউজ অঞ্জনসের কর্ণধার শাহীন আহমেদ বলেন, বর্ষবরণের রীতি প্রায় সব দেশেই রয়েছে। আমাদের দেশেও এ রীতি বেশ পুরনো। তবে আগে এ উৎসব গ্রামকেন্দ্রিক হলেও বিগত একযুগেরও বেশি সময় ধরে শহরেও পালন করা হচ্ছে বর্ষবরণ। সবাই আনন্দ নিয়ে বরণ করে নেয় বাংলা নববর্ষকে। আমাদের ফ্যাশন হাউজ অঞ্জনস প্রতি বছরই ক্রেতা চাহিদা ও ফ্যাশনের দিকে নজর রাখে।
আমরা তাই প্রতি বছর নতুন কোনো থিম নিয়ে কাজ করি। এবার কাজ করেছি জামদানি, নকশিকাঁথা ও বিভিন্ন রকম ফুলের থিম নিয়ে। যেহেতু এখন গরমের সময় তাই কাপড় হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছি কটন, এন্ডিকটন, ভয়েল এবং লিলেনকে। রঙের ক্ষেত্রে বৈশাখ মানেই লাল-সাদা। অন্যান্য রঙ যে পরা যাবে না, এমন নয়। তাই লাল-সাদার পাশাপাশি রেখেছি হলুদ, লেমন, পার্পেল, বাসন্তির মতো রঙও। সব বয়সী নারীর জন্য শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া; ছেলেদের জন্য পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া এবং মেয়েশিশুদের জন্য ফ্রক কিংবা কামিজের পাশাপাশি ডিজাইন করেছি বেশ কিছু শাড়িও।


মেকআপ : নিজেকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তুলতে মেকআপ করাটা জরুরি। প্রধান করণীয়গুলোর মধ্যে হলোÑ পরিচ্ছন্ন থাকা এবং উৎসবের কয়েকদিন আগে থেকে ত্বকের যতœ নিয়ে রাখা। মেকআপ করার আগে মুখে বরফ টুকরা ঘষে নিন এতে মেকআপ ত্বকের ভেতরে যাবে না আর ঘাম কম হবে। এ সময় গরম যেহেতু বেশি থাকে, তাই ভারী সাজ না দিয়ে হালকা সাজ দেয়া ভালো। চোখের শ্যাডো হালকা ব্রাউনিশ বা গ্রিনিশ থাকবে। আইব্রো টাচআপ অবশ্যই দেবেন। আমরা অনেক সময় এটি দিতে ভুলে যাই। চোখে কাজল, আইলাইনার ব্যবহার করতে পারেন। এরপর আইল্যাশ লাগাবেন। লিপস্টিকের ক্ষেত্রে লাল রঙ বেছে নিতে পারেন। আই মেকআপ হালকা নিতে পারেন।
পহেলা বৈশাখ যেহেতু সাদা-লালে আটকে নেই, তাই ঠোঁট সাজাতে পারেন গোলাপি, কমলা, বাদামি, হালকা গোলাপি রঙ দিয়ে। আর চোখের মেকআপ ভারী হলে লিপস্টিকের ক্ষেত্রে নুড কালার ভালো মানাবে।

চুলের সাজ : এ দিনটিতে চুল কেমন করে বাঁধবেন তা নিয়েই অনেকে চিন্তায় থাকেন। চুল না ছেড়ে হালকা বেঁধে দিতে পারেন। করতে পারেন সাধারণ বেণী বা ফ্রান্স বেণী বা বান। আবার সামনে একটু মেসি স্টাইল করে, পেছনটা খোঁপা করা যেতে পারে। সামনের দিকে ফ্রেন্স বেণী করে পেছনে খোঁপাও করা যেতে পারে। এ ছাড়া ডাচ বেণীও করতে পারেন। মাঝখানে একটি সিঁথি করে খোঁপা করতে পারেন। এরপর ছোট বা বড় টিপ পরতে পারেন। কানে-গলায় পরতে পারেন মাটির অলংকার। খোঁপা বা বেণীতে ফুল লাগাতে ভুলবেন না যেন। খোঁপা বা বেণী ফুল দিলে সাজে পরিপূর্ণতা আসবে, আকর্ষণীয় লাগবে।

চুলের সাজে ফুল
বাঙালি নারীর সাজ যেন ফুলের মাঝেই পূর্ণতা পায়। আজকাল তো ফুলের সাজ শাড়ি পেরিয়ে সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, টপস, গাউনেও জায়গা করে নিয়েছে। রূপবিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন বলেন, “বৈশাখ বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। তাই নববর্ষ উদযাপনে সংস্কৃতি এবং আনন্দের জায়গা থেকে সবাই চায় এ দিন নিজেকে বাঙালিয়ানা সাজে সাজাতে। আর এই সাজ সবচেয়ে সুন্দর ফুটিয়ে তোলা যায় ফুলের মাধ্যমে। নারীর সৌন্দর্যও সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠে ফুলের সাজে। চুলে ফুলের সাজ নিয়ে আজকাল নানা নিরীক্ষা হচ্ছে। খোঁপা, বেণী, এমনকি খোলা চুলও এখন নতুন নতুন ধারায় ফুলের সাজে সাজানো যায়।”
খোঁপার বাঁধনে ফুল : চুল পাফ করা পরিপাটি খোঁপা তো অনেক হলো। এবার বৈশাখে হোক না ভিন্ন কিছু স্টাইল রূপ বিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন জানালেন, খোঁপায় কানের পেছনে, খোঁপার ফুলের মালা জড়িয়ে, খোঁপার ভেতরে ভেতরে ফুল গুঁজেÑ এক খোঁপাতেই ফুল সাজাতে পারেন নানাভাবে। এই যেমনÑ
সামনের চুলগুলো একটু কোঁকড়া করে মাঝ বরাবর সিঁথি কেটে এক পাশে বা পেছনে খোঁপা করা যেতে পারে। একপাশ খোঁপা বেঁধে মুখের অন্যপাশে কোঁকড়ানো কিছু চুল ছেড়ে দিলে ভালো লাগবে। এবার খোঁপার একপাশে পরে নিন ডালিয়া, লিলি, জারবারার মতো বড় আকারের কোনো ফুল। বৈশাখের সান্ধ্য সাজে এমন খোঁপায় চাঁপা ফুলের ছড়াছড়ি ছড়িয়ে দেবে মনমাতানো সুবাস।
পুরো মাথার চুল ভাগ করে ছয়টা ফ্রেঞ্চ বেণী করে ফেলুন। তারপর নিচের দিকে সবক’টি বেণী মিলিয়ে বড় একটা খোঁপা করে নিন। এরপর খোঁপার একপাশে গুঁজে দিন জিনিয়া।
ফ্রন্টসাইট টুইস্ট করে পেছনে হাতখোঁপা করুন। এরপর পুরো খোঁপাটি জড়িয়ে ফেলুন বাগানবিলাস, বেলি কিংবা রঙ্গন ফুলের মালায়। একইভাবে খোঁপা করে খোঁপার চারপাশে পর পর বসিয়ে দিতে পারেন লাল এবং কমলা চন্দ্রমল্লিকা। দারুণ নজর কাড়বে ফুলের এই সাজ।
পেছনের চুলগুলোকে উঁচু করে খোঁপা করে নিন। একটা চিকন বেণী করে পুরো খোঁপা ঘিরে দিন। এবার চুলের এক দিকে দোলনচাঁপা কিংবা কাঠগোলাপ আর সামনের দিকে কয়েকটি বেলি ফুলের কলি বসিয়ে সাজিয়ে তুলুন খোঁপা।

খোলা চুলে ফুলের বাঁধন : চুলে ফুল পরতে হলে চুল বাঁধতেই হবে এমন ধারণার পরিবর্তন এসেছে। পিঠজুড়ে খোলা চুলেও হতে পারেন অনন্যা।
চুল কার্ল করে ছেড়ে রাখুন। এবার কার্লের ভাঁজে ভাঁজে আটকে দিন ছোট আকারের ঘাস ফুল, কারেনশন কিংবা জিনিয়া। ছোটচুল কার্ল করে কানের পাশে অনেকগুলো ফুল আটকে দিলেও সুন্দর লাগবে।
কোঁকড়া চুল কিংবা চুল হালকা কার্ল চুলে জিপসি, রঙ্গন কিংবা বেলি ফুলের মালার বেণীতে সাজতে পারেন রাজকন্যা।
বিনুনিতে ফুল : আফরোজা পারভীন বলেন, এ সময়ের দারুণ বৈচিত্র্যময় চুলের সাজ হলো বেণী। বৈশাখে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা, টপসসহ সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই মানিয়ে যাবে বেণী। ফ্রেঞ্চ বেণী, খেঁজুর বেণী, টুইস্ট বেণী, মেসি বেণীসহ নতুন নতুন নানা নামে, নানা স্টাইলে এখন বেণী করতে পারেন। যেমন-
লম্বা খেঁজুর বেণী করে পুরো বেণীতে যেকোনো ফুলের মালা পেঁচিয়ে দিলে ট্রেডিশনাল লুক আসবে। আবার যেকোনো ফিউশন বেণীর ভাঁজে ভাঁজে কাঠবেলির মালা পেঁচিয়ে দিলে ড্রামাটিক লুক আসবে।
সামনে দুই পাশ থেকে চুল টুইস্ট করে টেনে পেছনে নিয়ে আটকে একটা খেঁজুর বেণী করে ফেলুন। আর সামনের টুইস্ট করা চুলের ভাঁজে ভাঁজে একটা একটা করে বেলি, রঙ্গন কিংবা ছোট আকারের বুনো কোনো ফুল গুঁজে দিন।

মাঝে সিঁথি করে দুইপাশের চুল টুইস্ট করে পেছনে আটকে দিন। তারপর চুলের মাঝ থেকে কার্ল করুন। এবার মাথার মাঝে কয়েকটি হলুদ-সাদা গোলাপ কিংবা জিপসি বসিয়ে দিন। স্নিগ্ধ, রাজকীয় লুক আসবে।
সামনের চুল মাঝে সিঁথি করে দুই পাশে দুইটি টুইস্ট করুন। এবার মাথার মাঝখানে কিছুটা চুল ফুলিয়ে পাফ করে নিন। পেছনের চুল দুই বেণী করুন। এরপর দুই বেণীর শুধু গোড়ায় চন্দ্রমল্লিকা কিংবা জিনিয়া ফুলের মালা পেঁচিয়ে দিলে নতুন লুক আসবে। বৈশাখে সালোয়ার-কামিজ কিংবা টপসের সঙ্গে এই হেয়ারস্টাইলটি ভালো লাগবে।
ফুলের গহনায় অনন্যা : বৈশাখে চুল ছাড়াও সাজতে পারেন ফুলের গহনায়। এ দিন খুব ছোট আকারের গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, কসমস টিকলির মতো পরতে পারেন। হাতে পেঁচিয়ে নিতে পারেন বেলি ফুলের মালা। কোমরে থাকতে পারে গাঁদা ফুলের বিছা আর হাতে চন্দ মল্লিকার বাজু।
গয়না : বৈশাখে শাড়ির সঙ্গে গয়না না হলে সাজটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে মাটির গয়না বেছে নেয়া ভালো। মাটির মালা হতে হবে লম্বা। আবার কাঠ, রুপা, মুক্তা বা তামার মালা পরতে পারেন। ভারী গয়না পরতে না চাইলে ফুলের মালা বেছে নিন। বাঙালি নারী গয়না না পরলেও দু’হাত ভর্তি চুড়ি সাজ পূর্ণ করে দেয়। শাড়ির পাড়ের সঙ্গে মিলিয়ে রেশমি চুড়ি পরতে পারেন। মাটির বা কাঠের চুড়িও কিন্তু বেশ মানিয়ে যায়। পোশাকের রঙের প্রাধান্য যেটাই থাকুক না কেন, হাতে থাকা চাই রেশমি চুড়ি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here