সুস্বাগত, বাংলা নববর্ষ ১৪২৬

21

৩০ দিনে এক মাস। ১২ মাসে এক বছর। সব ক্যালেন্ডারেই বছরের হিসাবটা এ রকম। তবে ঋতুতে ব্যতিক্রম আছে। যেমন আমেরিকানদের ৪ ঋতু। বাঙালিদের ৬ ঋতু। গ্রীষ্ম দিয়ে শুরু, বসন্তে শেষ। মাঝখানে আমরা উপভোগ করি বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত এবং শীত ঋতুর রূপ, রসের মাধুরী। বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যে সবাই মুগ্ধ হয়। অনেক দেশেই সামার, অটাম এবং উইন্টার, স্প্রিং- মিলেমিশে একাকার। বাংলার একেক ঋতুর রূপ-রস, মাধুর্য একেক রকম। বৈচিত্র্যে ভরা।

সেই ঋতুচক্রের রথে আবার গ্রীষ্ম, অর্থাৎ নতুন আরেকটি বছর। ঋতুচক্রের সঙ্গে সঙ্গে জীবনচক্র এভাবেই আবর্তিত হয়। মানুষ এবং প্রকৃতি পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। সেভাবেই আমরা প্রবাসে থাকি আর স্বদেশে, চৈত্র মাসের শেষ দিনটিতে পুরাতন ১৪২৫ সনকে বিদায় বলে বৈশাখের প্রথম দিনটিতে নতুন বছর ১৪২৬-কে স্বাগত জানাব। মানবজীবনে এ এক এমন নিয়ম, যার কোনো ব্যতিক্রম নেই। তাই আমরা আনন্দের পাশাপাশি দুঃখকেও বরণ করে নিই। হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ-এ নিয়েই জীবন। তাই ভালো-মন্দ যা-ই আসুক, মেনে নিই সহজে।

নতুন বছর মানেই জীবনের হালখাতা। হিসাব-নিকাশ, স্বপ্ন-প্রত্যাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি। যোগ-বিয়োগ। কী পেলাম, কী পেলাম না, তার খেরো খাতা। বিগত বছরের হিসাবের যোগ-বিয়োগ সেরে সামনের দিকে তাকানো। মানুষ সবাই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। সুখস্বপ্ন। কিন্তু পেছনে না তাকিয়ে কি ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব? মানবধর্মে বলা হয়ে থাকে : যারা পেছনে না তাকিয়ে, বর্তমানকে অনুধাবন না করে, কেবল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, তাদের ‘স্বপ্নবিলাসী’ বলা যায়, কিন্তু স্বপ্ন তাদের পূরণ হয় কমই। তাদের স্বপ্ন ফ্যাকাশে এবং বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। বাস্তবে রূপ নেয় না। তারাই জীবনে সফল মানুষ, যারা বর্তমানে দাঁড়িয়ে অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনা করে এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নিয়ে অগ্রসর হয়। জীবনে সার্থকতা অর্জন করতে হলে যারা কালদর্শী তারা তিন কালকেই হিসাবে রেখে অগ্রসর হয়। যদিও মুহূর্তেই বর্তমান ভবিষ্যতের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তবু সবাইকেই বর্তমানে দাঁড়িয়েই সামনে-পেছনে তাকাতে হয়। অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতাই ভবিষ্যতের সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান রচনা করতে সাহায্য করে।
পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষকে বরণে বাঙালি মাত্রই এক নতুন আবেগে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। পহেলা বৈশাখ শুধু পান্তা-ইলিশের উৎসব নয়। পান্তা-ইলিশ অবশ্যই সামগ্রিক উৎসবের একটি অংশ। আসলে বাঙালির আদি অকৃত্রিম নিজস্ব উৎসব বর্ষবরণ। একটি অসম্প্রদায়িক, অরাজনৈতিক আয়োজন, যাতে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই মেতে ওঠে। বছরের প্রথম উৎসব বলে বাঙালির কাছে এর আকর্ষণই অন্য রকম। বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। বাঙালির আয়-উন্নতির খতিয়ান, সৌভাগ্যের সূচনা।

তাই তো বাঙালি সংস্কৃতির সূচিস্নিগ্ধ ধারায় পহেলা বৈশাখ বরণের সমারোহে মেতে ওঠে সব বাঙালি মন। ঘুচে যায় প্রবাস-স্বদেশের ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু সব ফারাক। এখন বাঙালিরা বাংলা নববর্ষকে বরণে দেশের আমেজ থেকে খুব বেশি বঞ্চিত হয় না। প্রবাসের বাঙালিরাও এখন বাংলা নববর্ষে পান্তা-ইলিশসহ দেশের আমেজ পরিপূর্ণভাবেই উপভোগ করে। কিন্তু নববর্ষ যেহেতু বর্তমানের আনন্দ-উৎসব, অতীতে পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব এবং অতীতের আলোকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচনা করে এগিয়ে যাওয়া, তাই দেশে-প্রবাসে যেসব ঘটনা আমাদের মনকে বিষাদে আচ্ছন্ন করেছে, তার দিকেও একটু দৃষ্টি ফেরানো দরকার। বিশেষ করে কষ্টের ঘটনা, যা আমাদের এই আনন্দ মুহূর্তকে বিষাদময় করে তুলছে।

যে বছরকে আমরা বিদায় জানাচ্ছি, অর্থাৎ ১৪২৫ সালের সবচেয়ে মনে রাখার মতো বড় ঘটনা ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভ‚মিধস বিজয় নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন। বিএনপির চেয়ারপারসনের দুর্নীতির দায়ে কারাবরণও বিগত বছরের একটি বড় ঘটনা। অন্যদিকে পর পর ভয়াবহ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড দেশে-প্রবাসে সবাইকেই ব্যথিত করে তুলেছে। উল্লেখযোগ্য অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে-চকবাজারের চুরিহাট্টা, বনানীর বহুতল এফ আর ভবন, গুলশানের কাঁচা বাজার, খিলগাঁওয়ের কামারপট্টি বাজারের আগুন। এসব আগুনে আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও প্রায় ১০০ প্রাণহানিও ঘটেছে। এ ছাড়া চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন, কবি আল মাহমুদের মহাপ্রয়াণ উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রায় ২৯ বছর পর বিগত বছরে ডাকসুর নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। রাজনীতির অঙ্গনে বিরোধী দল কোনো আন্দোলন করতে না পারলেও স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দুটি সফল আন্দোলন করেছে। একটি সড়ক আন্দোলনের নামে রাষ্ট্র মেরামতের আন্দোলন, অপরটি কোটা সংস্কারের আন্দোলন।
দুটি আন্দোলন থেকেই আমাদের জাতীয় জীবনে শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু আছে। আমরা যখন একটি পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন আরেকটি বছরকে আবাহণ করতে যাচ্ছি, তখন পুরনো যা কিছু থেকে শেখার আছে, আমরা যদি তা থেকে কিছু গ্রহণ করতে পারি, তবে তা সামনের দিনে আমাদের চলার পথকে অনেক সহজ করে দিতে পারে। আমরা পুরাতন বছরকে বিদায় জানাতে গিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করে বলি, ‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক…।’ জীর্ণ পুরনো জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলে নতুন করে আমরা জীবন সাজাতে চাই। নতুন পথে নামতে চাই। সেই আয়োজনই বাঙলির ঘরে ঘরে চলছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ সামনে নিয়ে। সেসব আয়োজন বাঙালির চিরায়ত বাঙালিপনায় মোড়া এবং এসব আয়োজনে মেতে বাঙালি ভুলে যাবে সব তুচ্ছতা, ক্ষুদ্রতা, হীনম্মন্যতার সকল জীর্ণতা।
বাংলা ষড়ঋতুর ধারায় কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা অনুসরণ করে প্রায় সোয়া ১৪০০ বছর আগে বাংলা পঞ্জিকার প্রবর্তন অবশ্য কোনো বাঙালি রাজা-বাদশাহ করেননি, করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। নববর্ষ সামনে রেখে বাঙালি নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা নিয়ে বুক বাঁধে। দেশের মতো এবারও প্রবাসে বাংলাদেশ সোসাইটিসহ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা সংগঠন নানা কর্মসূচিতে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হয়েছে। স্বদেশ থেকে আমেরিকা হাজার হাজার মাইল দূরে হলেও নববর্ষ বরণের বিপুলতা, বর্ণময়তা সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে। আগে স্বদেশ নিয়ে বাঙালিদের মনে যে হাহাকার ছিল, বুকের ভেতর যে পুড়ানি ছিল, এখন আর সেই পুড়ানি নেই। এখন বর্ষবরণের উপাচারে, উপকরণে, সাজপোশাকে, নৃত্য-গীতে, বাংলা ঐতিহ্যে কোনো কমতি দেখা যায় না।

প্রবাসে সব অভিবাসী সমাজেরই জীবনযাপনে নানা সীমাবদ্ধতা এবং সংকট থাকে। আমাদেরও রয়েছে। প্রবাসের জীবনযাপনকে ‘যুদ্ধ’ বললে অত্যুক্তি হয় না। কিন্তু প্রবাসে যারা থাকেন, দেশের প্রতি তাদের মায়া বেড়ে যায়। যারা হয়তো দেশে থাকতে কোনো দিন পহেলা বৈশাখের কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার তাগিদ বোধ করেনি, প্রবাসে তারাই নববর্ষবরণে অস্থির হয়ে ওঠে। বিভিন্ন আয়োজনে সহযোগী হয়ে ভ‚মিকা রাখে। অর্থ-শ্রম-সময় ব্যয় করতে দ্বিধা করে না। প্রবাসে দেশের ঐতিহ্য- কৃষ্টি ও কালচার রক্ষায় তাদের ব্যাকুলতা সত্যি প্রশংসনীয়। সব জাতিগোষ্ঠীরই তাদের নববর্ষ নিয়ে মাতামাতি আছে, তবে বাঙালির রং আর সবাইকে ছাড়িয়ে যায়!

তবে আমেরিকায় আমরা অভিবাসী সমাজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে এক অস্থির সময় পার করছি। বৈধ-অবৈধ সবার মনেই আতঙ্ক। মুসলমানদের মধ্যে আবার একটু বেশি। তবু দেশ ভালোবেসে, দেশের সংস্কৃতিকে ভালোবেসে আমরা অভিবাসী জীবনেও বাংলার অন্যান্য সাংস্কৃতিক উৎসবের চাইতেও অনেক বেশি আবেগ, উচ্ছ্বাস এবং আনন্দ নিয়ে প্রবাসে বাংলা নববর্ষ বরণের উৎসবে মাতি। এবারও বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ সন বরণে নিউ ইয়র্কসহ সমগ্র উত্তর আমেরিকায় পান্তা-ইলিশসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দেশ থেকেও অনেক অতিথি আসবেন, শিল্পী আসবেন। নানা সাজে, নানা বর্ণে উদ্্যাপিত হবে ১৪২৬ বাংলা সনের কর্মসূচি।

এই ধরাধামকে সব গ্লানি, জীর্ণতা মুক্ত করে, সন্ত্রাস-হানাহানি মুক্ত বিশ্ব নির্মাণ এবং আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি কামনা করবে সবাই এই পবিত্র দিনে। সূচিস্নিগ্ধ মনে দেশের কল্যাণে, দেশের উন্নয়নে সবাই প্রার্থনা জানাবে। আনন্দ-বিনোদন উপভোগের পাশাপাশি দুধে-ভাতে বাঙালির ভবিষ্যৎ কামনা করা হবে। আমাদের যেন কষ্ট নিয়ে গাইতে না হয় : ‘…একদিন বাঙালি ছিলাম রে।’ আমরা যেন আমাদের কর্মে, ভাবনায়, সুখে-দুঃখে গাইতে পারি, সব সময় আমরা বাঙালি ছিলাম, বাঙালি আছি এবং থাকব।
সবার কল্যাণ এবং মঙ্গল হোক-বাংলা নববর্ষ ১৪২৬-এ সবার জন্য প্রার্থনা। ঠিকানার সব পাঠক, গ্রাহক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ী- সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here