ঢাকাকে নিরাপদ করার কিছু প্রস্তাবনা

11

ঢাকায় প্রায়শ অগ্নিকাণ্ড কিংবা কখনো ভবন ধসের ঘটনায় অনেক দূরে থেকেও খুব মর্মাহত হই। ভীষণ কষ্ট লাগে। বিশেষ করে যখন ভাবি, কিছু সংখ্যক মানুষের দুর্নীতি এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে একের পর মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। আমার প্রাণের প্রিয় মাতৃভূমির রাজধানী এমনি একটি জায়গা যেখানে ১৯ তলার পরিকল্পনা নিয়ে ২১ তলা ভবন তৈরি করা যায় অনায়াসে। অগ্নি নির্বাপনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকা, পরিকল্পনা না মেনে ভবন তৈরি কিংবা গলি ঘুপচির পুরানো ঢাকায় রাসায়নিক কারখানা গড়ে তোলা, যার যা খুশি করছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক এখানে কি করছে? তাদের কোন ধারণাই নেই কিভাবে একটি শহর কিংবা ভবনগুলোকে নিরাপদ করা যায়।
আমি যেহেতু উত্তর আমেরিকায় থাকি, নিউইয়র্ক শহরের কিছু উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। দেখুন নিউইয়র্ককে বলা হয় পৃথিবীর রাজধানী। একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহর এটি। ফলে কোন অবস্থাতেই ঢাকার সঙ্গে মিলিয়ে সেভাবে আলোচনাটি করতে চাই না। তবে কেবলমাত্র সততা এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আমার আলোচনার জায়গাটি সেখানেই।

নিউইয়র্ক ঢাকার মতোই বড় একটি শহর। অনেকটাই ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে পাঁচটি বোরো রয়েছে। প্রত্যেকটিতে রয়েছে আলাদা বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট। আবার ছোট ছোট বিভাগে ভাগ করা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার বিল্ডিং ইন্সপেক্টর কয়েকটি লেয়ারে কাজ করে। একেবারে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করে, তাদের শরীরের সঙ্গে জিপিএস এবং বডিক্যামেরাযুক্ত থাকে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কিভাবে কাজ করছে সেটা তদারকি করার জন্যে। যেন কোন অবস্থাতেই অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে না পারে এসব কর্মকর্তা। প্রতি পাঁচজনে তাদের একজন সুপার ভাইজার থাকে। তারা সারাদিন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ তদারকি করে। কিভাবে কাজটি হচ্ছে, সেটা পর্যালোচনা করে। যেন ঘুষ কিংবা অপরাধের সঙ্গে কেউ জড়িয়ে পড়তে না পারে। সকালে মাঠ পর্যায়ের লোকেরা কোথায় যাবে, এমনকি আগের রাতেও তারা জানতে পারে না। যখন সকালে তারা টাইম পাঞ্চ করে তখন তার জন্যে অটোমেটিক একটি রুট তৈরি হয় এবং তিনি সেখানে যান। অনেক ধরনের অভিযোগ জমা হয়। সেইসব অভিযোগ কিংবা নতুন ভবনের পরিস্থিতি দেখতে তারা সেখানে যান। এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি। আবার ফিল্ড কর্মকর্তা যে বাড়িগুলোতে যাচ্ছে, তার মধ্য থেকে কোন একটিতে সুপার ভাইজার আবারো গিয়ে হাজির। মিলিয়ে দেখার জন্যে অর্থাৎ মাঠ কর্মকর্তা যে রিপোর্ট দিচ্ছে, সেটা ঠিক আছে কিনা। আবার নির্দিষ্ট সময় পর পর সুপার ভাইজারও পরিবর্তন করা হয়। কারণ দীর্ঘ সময় একসাথে থেকে অনেক সময় একটি টিমের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়, এতে অনিয়ম দেখা দিতে পারে।

আবার যখন ভবন নির্মাণ হচ্ছে, তখন আলাদা টিম কাজ করছে। কোন একটি ভবনের ২৫ ভাগ কাজ শেষ হলে মাঠ পর্যায়ের অফিসাররা সেটা ইন্সপেকশনে যান। আবার ৫০ ভাগ শেষে আবারো যান। এভাবে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পর বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট একদফা ইন্সপেকশন করে। পরে যায় ফায়ার ডিপার্টমেন্ট। কেবল আর্কিটেক্ট সার্টিফাই করলেই হবে না। প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্ট নিজেদের মতো করে কাজ করে। আবার কেউ চাইলেই নিজের স্থাপনায় পরিবর্তন আনতে পারে না। তার জন্যে অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদন ছাড়া কিছু করলে, তা যদি ধরা পড়ে বিরাট জরিমানা গুণতে হয়। তাতে হয়তো গোটা ভবনটাও হারাতে হতে পারে। আইন এবং নিয়ম এখানে সবার জন্যেই সমান।
বাংলাদেশে সবক্ষেত্রেই দায়সারা কাজ হচ্ছে। সেখানে লেয়ারিংটা নাই। এতবড় একটা ঢাকা শহরে কিভাবে ৫০ জন কর্মকর্তা দিয়ে ইন্সপেকশন করা সম্ভব? আমরা কেন এই সংখ্যাটা বাড়াচ্ছি না। এখানে যদি ৫ হাজার ইন্সপেকটর নিয়োগ দেয়া যেত, তাহলে তো জবও তৈরি হতো। অনেকেই হয়তো আশংকা করবেন, আমরা হয়তো আরও দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা তৈরি করবো এতে। আমি মনে করি, সবকিছু একটা সিস্টেমে নিয়ে আসতে পারলে, দক্ষতা বাড়াতে পারলে দুর্নীতি কমবে। কাজ হবে। ডিজিটাল দেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রাজউককেও ঢেলে সাজাতে হবে। তাহলে পাঁচ হাজার লোকের নিয়োগ ও তাদের বেতন নিয়ে ভাবতে হবে না। সেই প্রক্রিয়াই অর্থের যোগান দেবে। সব কাজের আলাদা ডিপার্টমেন্ট থাকবে। যাদের কাজ রাস্তা ম্যানেজমেন্ট করা, তারা তাই করবে। একদল ভবনের দেখভাল করবে। সবকিছু কেন প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে হবে? একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কেন চলবে না?
এটি হবে প্রতিদিনকার রুটিন কাজ। অনিয়ম দূর করতে হবে। দেশপ্রেম বাড়াতে হবে। কেবল দুই একটি দুর্ঘটনার সময় এসব নিয়ে হৈচৈ করে লাভ হবে না। কাজটা করেই ফেলতে হবে। সেজন্যে গোড়াতে থাকা গলদ উপরে ফেলতে হবে। দেশটা আমাদের। দেশকে ভালোবেসে, দেশের প্রয়োজনেই কাজটা করতে হবে। উন্নত দেশের মতো হতে বলছি না, কেবল ভালো উদাহরণগুলো গ্রহণ করতে বলছি। আর দেশের সাধারণ নাগরিকদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। মনে রাখবেন, আপনার একটি অনিয়ম আপনিসহ অন্যদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। নিজে অনিয়ম করবেন না, অন্য কেউ যেন সেটা করতে না পারে, তার দিকেও চোখ রাখবেন। আমরা সবাই চাইলেই প্রাণের ঢাকাকে অনেকটাই নিরাপদ করতে পারি।
-নিউইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here