ধ্বনিল আহ্বান

4

‘আমি জানি আমার বাড়ির মধ্যে উঠোন জুড়ে
ঘাস উঠেছে এখন’…। ( ফেরা, নির্মলেন্দু গুণ)
রণক্লান্ত কবি দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রামের শেষে দেখতে পেলেন বিজয় কেতন। সে সঙ্গে শুনতে পেলেন ভেতরের অন্তর্গত আর্তনাদ- ফিরে আয় কবি তোর ফেলে যাওয়া স্মৃতিময় সবুজ-শ্যামল মাটির চত্বরে।’ যে সংগ্রামী চেতনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শুরু হয়েছিল, তার প্রতিক্ষণেই ছিল এই নিভৃত বাসনা : ‘যেদিন থেমে যাবে এই রণদামামা, তখন ফিরে যাব সবাই আপন আলয়ে।’

ফেরার এই যে আকুলতা, তা কোনো আবেগনিঃসৃত মোহমায়া নয়। এই আকুলতা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাস্তবতার দোহাই দিয়ে এটাকে কাটাছেঁড়া করা যাবে না। কল্পনার বিশ্বাসের ভ্রণে এই আহ্বান নিয়ত লালিত।

দেশে দেখা যেত গ্রীষ্মের ছুটিতে কিংবা পূজা-পার্বণের ছুটিতে সে কি মানুষের ভিড়। ট্রেন স্টেশন-স্টিমার ঘাট-বাসের ডিপো-সবখানেই শুধু মানুষ আর মানুষ! সবাই চাইছে প্রিয়জনের একান্ত সান্নিধ্য। যদি কাউকে জিজ্ঞেস করেন, ও ভায়া এত হন্যে হয়ে ছুটছেন ক্যানে (মানে কোথায়, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত)। সবারই একই সিম্ফনি-দেশের বাড়িতে।

আমার মনে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ছিলাম নবনির্মিত (১৯৬৭ সালের কথা) মহসীন হলে। তখনো কমলাপুর রেলস্টেশন নির্মিত হয়নি। ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের লাইনটা চলে গিয়েছিল হলের পাশ দিয়ে। কত দিন মনে আছে রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম যাত্রীবোঝাই ট্রেন চলেছে হুঁশ হুঁশ। ভেতরটাও নিশপিশ করত-আহা এখন যদি ছুটি হতো, তবে একটু আমিও দেশের বাড়ি ঘুরে আসতাম। মাকে দেখি না কত দিন!!!
জীবনের আবর্তনে আজ আমাদের ঠাঁই পৃথিবীর আরেক প্রান্তরে। নীল আকাশ, মুক্ত বাতাস, সবুজের সমারোহ-সবই আছে এখানে। কিন্তু অনুভব করতে পারি কি বাংলাদেশের স্নিগ্ধ শ্যামলিমাকে? বাতাসে কি ভেসে আসে বকুল-মালতির সুবাস। দেখেছি কি কোনো উদাস দুপুরে হিজল-বটের ছায়ায় সেই রাখাল বালকটিকে, যার বাঁশির সুর আজও ধ্বনিত হৃদয়ের নিভৃতে!

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, সেদিন ছিল মাত্র তিন ঘণ্টার পথ। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ইচ্ছে হলেই তো বাড়ি ঘুরে আসা যায়! কিন্তু আজ, এখন? এত সহস্র যোজন, পাহাড়-পর্বত-মরু-গিরি-সাগর-তেপান্তর! ইচ্ছে হলেই তো এই পথ পাড়ি দেওয়া যায় না। মায়ের মুখ, বাবার স্নেহার্দ আশীর্বাদ, ভাই-বোনের সান্নিধ্য-এই আশা শুধু অন্তরে লালিত হতে থাকে নিশিদিন।

কবির ভাষায় : ‘ঘরে ফেরা কখনো হয় না।
দরোজায় পরিচিত নামগুলো মুছে যায়।
চেনা পথ লুপ্ত হয় ঝোঁপে আগাছায়।’ (ফাল্গুন-চৈত্রের কবিতা। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী)
হৃদয়ের লালিত বাসনা মুকুলিত হওয়ার আগেই খবর আসে বাবা নেই, ভাইয়ের দুর্ঘটনা, বোনের বিরহ ইত্যাদি। যে পথে এসেছিলাম, সে পথে ফিরে গেলাম ঠিকই। দেখলাম, কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাস্তুভিটে। কিন্তু সেই মানুষগুলো নেই, যাঁরা আমাদের শুধু জীবনদানই করেননি, জীবনকে করেছিলেন স্পন্দিত।
কবি বুদ্ধদেব বসু প্রবাসে থাকাকালীন ‘নস্টালজিয়া’ নাম দিয়েই একটি কবিতা লিখেছিলেন। শুধু কবিতা বললে ভুল হবে, এ যেন ছিল তার অন্তরের গুঞ্জরিত সংগীত।
কবি বলছেন :
‘সে কোন দেশে, যেখানে আমি যেতে চাই?
সে কি যাওয়া, না ফেরা? নাকি সন্ধান শুধু?
মনে হয় আমার এ বাস যেন অতীত, আর ভবিষ্যৎ
আমার পায়চারি করার বারান্দা। আর বর্তমান এক
অন্তহীন পিঁপড়ের সারি, আমার পায়ে-পায়ে মরে যাচ্ছে?’
আসলে আমরা এক সীমাবদ্ধতার মাঝে অন্তরীণ। সকাল থেকে সন্ধ্যা ছুুটছি। সোমবার থেকে শনিবার-ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা। চারদিকের বিশাল ইমারতগুলো যেন জগদ্দল পাষাণের মতো চেপে আছে। প্রতিদিনই আমরা যেন নিষ্পিষ্ট এই জনস্রোতের কল্লোলে।

আমাদের এই নির্বাসন অনিচ্ছাকৃত বললে ভুল হবে। আবার স্মৃতির সবুজ শেওলা বুকে নিয়ে ধুঁকে মরছি-তা ভাবতেও ভুল হবে। জীবনের পরিবর্তনের জন্য, পরিবর্ধনের জন্য আমরাই বেছে নিয়েছি এই পথ। ফেলে এসেছি ছোট্টবেলায় খেলাঘর। দেখছি নতুন দেশ, নতুন শহর। তবুও একটা পিছুটান যেন রয়ে যায়। দেশে ফিরে যাব, কি যাব না-সংশয়ের এই দোদুল দোলায় আমরা যে যৎসামান্য হলেও ভুগছি না, সেটা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবে না।

এ প্রসঙ্গে কবি ফরহাদ মজহারের কবিতার একটু উদ্ধৃতি দিই। (বলা বাহুল্য, প্রবাসে অনেক দিন কাটিয়ে বর্তমানে তিনি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছেন)। ‘আমার বর্তমানকার দ্বন্দ্ব-এ কবিতার শেষে তিনি লিখছেন :
‘কিন্তু শেষ রাত্তিরে একজন শ্রমিক তার
হাতুড়ি ঠুকে আমাকে জাগিয়ে দেয়।
জাগো, জেগে ওঠো ঢিলেবাড়ির ছোট্ট
খোকন, তুমি আমাদের বাড়ি আসতে
চাও তো আত্মহত্যা কেন?’
এই প্রশ্নের সঠিক জবাব আমার জ্ঞানে নেই। তবু অন্তরমাঝে নিত্য শুনি ধ্বনি, তারই কিছুটা অংশীদার হতে চাই সবার সঙ্গে। ফেরার আকুলতা-দেশ উদ্ধার নয়-এ সঙ্গে দেশের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ। দূরে থেকেও আমরা সবাই দেশের মঙ্গলকল্পে এগিয়ে আসতে পারি, চিন্তার সংযোজন করতে পারি। দেশজ ধ্যান-ধারণাকে প্রবাসে উচ্চকিত করতে পারি। কেননা আমরাই যে তার উত্তরাধিকারী।

এ কথা শুনে অনেকেই হয়তো ফোঁস করে উঠবেন এবং বলবেন, ‘যদি থাকো রোমে-তবে তাই করো-যা রোমীয়রা করবে।’ তাহলে তো ভায়া তর্কযুদ্ধে নামতে হবে! যেহেতু সেই শাস্ত্রে আমার পাণ্ডিত্য নেই, আমি সবার বিবেক, বোধ এবং বিশ্বাসকে টোকা’ দিতে বলছি। গায়ে-লেবাসে প্রবাসীর গন্ধ যা-ই থাকুক না কেন, দেখুন তো ভেতরটা স্বদেশি কি না? সারা দিন ম্যাকডোনাল্ডের হ্যামবার্গার খাওয়ার পর বাড়িতে এসে গিন্নির হাতের একটু মাগুর মাছের ঝোলের স্বাদটা কেমন লাগে, বলুন তো! তাহলেই বুঝুন-স্বদেশকাতরতা কতটুকু লোভনীয় ব্যাপার।
সবশেষে খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক শংকরের একটা উদ্ধৃতি দিয়েই এ প্রসঙ্গের ইতি টানি। কিছুদিন আগে তিনি আমেরিকা বেড়িয়ে গেলেন। গিয়ে যে বইটা লিখলেন, নাম ‘জানা দেশ-অজানা কথা’। তিনি বেশ রসিয়েই লিখেছেন, এই কথাগুলো : ‘ট্রাভেল এজেন্সির বড় মেমসাহেব, ট্যুরিজম করপোরেশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানকে তামাতুলসী স্পর্শ করে স্বীকারোক্তি করতে বলুন, তারাও চুপি চুপি মেনে নেবেন নিজের ঘরের কোণের মতন জায়গা বিশ্বভুবনে নেই। নাথিং লাইক হোম। নাথিং লাইক নিজের চৌকি, সে যত নড়বড়েই হউক।’
এসব অকাট্য যুক্তির পরও যদি জাম্বো জেটের বিমানবালাদের মোহিনী হাসি, রঙিন ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপনের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে কাউকে নীতিভ্রষ্ট হওয়ার অবকাশ দেয়, তাহলে অগতির গতি রবি ঠাকুরের শরণ নিতে হবে। তিনিও অতি চমৎকার ভাষায় অযথা বহু দেশে ঘুরে ঘরের কাছে শিশির বিন্দুকে অবহেলা না করার স্ট্রং অ্যাডভাইস দিয়েছেন!

অতএব সুধীজন, চৈতন্যের দুয়ারটা খুলে দিন। থাকুক না ঝড়-খরা-বন্যা, দারিদ্র্য, ধুলা, অর্থনীতির অবক্ষয়-চলুন তবু দেশটা ঘুরে আসি। দেখি কেমন পাখির তান, মাঝির কেমন গান, মায়ের কেমন টান। ভাই আমার, বোন আমার, চলুন না সেই দেশটাই ঘুরে দেখে আসি, যেখানে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কিষাণ-কিষাণী পুঁতে রাখে তাদেরই স্বেদবিন্দু-এক নতুন ফসলের জন্য।
শুভ বাংলা নববর্ষ।
নিউ জার্সি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here