বাংলা নববর্ষ বাঙালির চেতনা ও ঐতিহ্যের প্রতীক

6

নববর্ষ উৎসব সকল দেশেই সার্বজনীন উৎসব। সেজন্যই সমাজ বিকাশের ধারায় একটা উন্নত পর্যায়েই কোন জাতির নববর্ষ উৎসব ও তার পঞ্জিকার উদ্ভব ঘটে। এর একটা ধারাবাহিক ইতিহাস থাকে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের দিক থেকে ব্যাখা করলে বাংলায় বর্ষবরণ ও বাঙালির বর্ষপঞ্জি উদ্ভাবনের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা অন্যান্য সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত প্রক্রিয়ারই পরিচয় বহন করে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার শব্দটি মূলে লাতিন শব্দজাত। যতদূর জানা যায়, এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘হিসাব বই’। অন্যদিকে ইংরেজি “আলমানাক” শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে বলে অনুমিত। “আলমানাক” যে অর্থ প্রকাশ করে তার বাংলা অর্থ করলে পঞ্জিকার বলা যেতে পারে। ক্যালেন্ডার বলি আর আলমানাক বলি – উভয়েরই জন্মস্থান মিশর। পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন পঞ্জিকার মিশরে প্রস্তুত হয়েছিল বলে পঞ্জিকাকে মিশরীয় সভ্যতার অবদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

“হালখাতা”, ব্যবসায়ীদের প্রাচীন বৈশাখী উৎসব। মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকাল থেকেই “হালখাতা” পহেলা বৈশাখের আচার- অলংকার হিসেবে বিবেচিত। হালখাতার পাশাপাশি জমিদারকে খাজনা প্রদানের পুন্যাহ প্রচলিত ছিল। নববর্ষের প্রথমদিন প্রজাসাধারণ সাধ্যমত পরিচ্ছন্ন পোষাকে সজ্জিত হয়ে জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করে মিষ্টি দ্বারা আপ্যায়িত হতো। জমিদারী প্রথা উঠে যাওয়ায় পুন্যা প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। তবে বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে হিন্দু ব্যবসায়ীরা হালখাতার সমৃদ্ধ ইতিহাস ছোট আকারে হলেও পালন করে আসছে। ইতিহাস মতে আনুমানিক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ ও ১১ মার্চ, থেকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। সম্রাট আকবরের সময়ে এই গণনা পদ্ধতি প্রচলিত হয় এবং সে সময় এই পদ্ধতির নাম ছিল “ফসলি সন”। পরবর্তীতে এটিকে “বাংলা সন” নামে নামকরণ করা হয় এবং সে থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়।

বৈশাখ আমাদের একান্ত জাতিসত্তার অনুভব। বাঙালি হিসেবে পহেলা বৈশাখ আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বছর ঘুরে বৈশাখ আসে। যাবতীয় জীর্ণ-পুরানো, অশুভ ও অসুন্দরকে পিছে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে বাঙালি বরণ করে এই দিন। বাঙালির নববর্ষ এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত উৎসব। কেননা, পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোন না কোন ধর্মের সংঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বাংলা নববর্ষের সংঙ্গে ধর্মীয় অনুসঙ্গ নেই। ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলা ভ‚খন্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এমন অসম্প্রদায়িক উৎসব সত্যিই পৃথিবীতে বিরল। বাঙালির জীবনে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে আসে পহেলা বৈশাখ । শহর বন্দর গ্রাম, টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত সারা বাংলাদেশ ভেসে যায় অনির্বচনীয় আনন্দ-উচ্ছ্বাসে। ধর্ম বর্ণ শ্রেণি পেশা বয়স নির্বিশেষে সব মানুষ শামিল হয় বৈশাখী উৎসবে। সব ভেদাবেদ ভুলে কায়োমনে বাঙালি হওয়ার প্রেরণায় দ্বীপ্ত বাঙালি বরণ করে নেয় নব বঙ্গাব্দকে। ইদানিং নাগরিক জীবনে যে সাংস্কৃতিক চেতনায় পহেলা বৈশাখের উৎসব হচ্ছে তা প্রবর্তনের কৃতিত্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনিই প্রথম শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। এর অংশ হিসেবে বৈশাখ ধরনের উৎসবের জন্য বাংলা নতুন বছরকে সম্ভাষণ জানিয়ে রচনা করেছেন বহু কালজয়ী সংগীত ও কবিতা। বাঙালির কন্ঠে ছড়িয়ে গেছে সেই চেনা সুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো . . . . ’। পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ঢাকায় জমজমাট আয়োজন রমনার বটমূলে মঙ্গল শোভাযাত্রা, শিশু পার্কের সামনে নারকেল বীতি চত্বরে ঋষিজের গানের অনুষ্ঠান, ধানমন্ডি ক্লাবে বৈশাখ ধরনের অনুষ্ঠান, শিল্পকলা একাডেমিতে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সহ বিভিন্ন জায়গায় সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বাংলা একাডেমি ও প্রেসক্লাব সহ অন্যান্য জায়গায় বর্ণাঢ্য বৈশাখী মেলা বাঙালির চেতনা ও ঐতিহ্যকে অবহ মানকাল ধারণ করে চলে।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলবাসী ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা বর্ষবরণ পালন করে। বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ তাদের নিজস্ব পোষাকে সজ্জিত হয়ে ফুল ভাসাতে আসেন রাঙ্গামাটি কাপ্তাই হ্রদে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ত্রিপুরা তরুণ-তরুণীদের গড়াইয়া নৃত্য, পিঠা উৎসব মনোমুগ্ধকর। আধুনিক জীবনযাত্রায় নাগরিক প্রয়োজনে সব ক্ষেত্রে বাংলা সনের অনুসরণ এখন আর সম্ভব না হলে ও নিজের বর্ষপঞ্জি নিয়ে বাঙালির রয়েছে বিশেষ গৌরব। পহেলা বৈশাখ নেহায়েত একটি বছরের শুরুর দিন নয় বাংলা ভাষা ভাষীদের কাছে। এটি এই জনপদের মানুষের সুদীর্ঘকালের আপন সাংস্কৃতিক চেতনা ও ঐতিহ্যের স্মারক।

একুশে পদকপ্রাপ্ত ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বাফেলো, নিউ ইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here