হালখাতার জীবন দোলায়

5

সম্পর্ক দু’ভাবে হয়। বন্ধন জোড়া লাগে বিয়েতে সে আপনার স্ত্রী বা স্বামী, অন্যটা রক্তীয় যেমন ভাই-বোন,বাবা-মা। অনেক সময় বাস্তবতার নিগূঢ়ে মনে হয় রক্তের চেয়ে আত্মার সম্পর্কটাই উত্তম ও কাছের, যার চাওয়া পাওয়ার স্রোত কম। ভাই- ভাই সম্পর্কটা বোধ হয় আরো তিক্ত করে ফেলছে ঘুনে ধরা এই সমাজ চাওয়া-পাওয়া ও হিংসার বায়নায়। আমার এক শিল্পপতি বন্ধু তারা চার ভাই, একে অপরের মুখ দেখা বন্ধ ,খুব আজব তাইনা, কিন্তু বাস্তব! গ্রামের অনেক নামী দামী লোক আছেন যারা নিজেদের এলিট ভাবেন তারাও এক ভাই আরেক ভাইয়ের সীমানাও মাড়ান না। তাদের সন্তানরা যখন হাই স্কুল অতিক্রম করতে পারেনি, তারাই আবার অন্য ভাইয়ের ছেলে মেয়েরা যখন ভাল করছে সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ দিচ্ছে প্রফেশনাল কাজ করছে, হিংসায় বদনাম রটায়। কি অদ্ভুত এ দুনিয়ার খেলা তাইনা? মানুষ বোধ হয় সব চেয়ে আজীব চিজ; আল্লাহর সৃষ্ট দুনিয়ায়। মানুষের ভিতরটা যে কি কালো কালিমায় লেপ্টে থাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে, ঘনিষ্ট না হলে আসলে বুঝা যায় না। মানুষ তার মুখটা ঢাকতে পারে মুখোশের আড়ালে কিন্তু আত্মার আসল রূপটা কি ঢাকা যায়? কভু না তাই বোধ হয় স্বরূপে- বেরূপে আজ নয় তো কাল নয় তো পরশু বের হয়ে পড়ে…! মানুষ বড্ড স্বার্থপর। আমরা আসলেই স্বার্থের সোনার কাঠি হাত ছাড়া করতে চাই না যার জন্য আমাদের কষ্টের মাত্রা বাড়ে কমে না…!

আমায় কে যেন কোথায় ডাকছে! সে ডাক এখনও এইতো আমি শুনতে পাচ্ছি! ফেলে আসা সেই তুমি এখনও আছো পার্থক্য শুধু আমি নেই তোমার জীবনে। অশ্রু এখনও ঝরে আঁখি বেয়ে, অশ্রুর তপ্ততা আমি আর আবেগে মুছিয়ে দেইনা। জীবন এমনি হয় ফুলেরা দেখতে কত সুন্দর অথচ যখন ঝরে পড়ে কেউ তার খবরও রাখেনা। কারণ ও আর খুশবু বিলায় না, সুন্দরতা ছড়ায় না। মনে পড়ে সেই ধূপের গল্প নিজে পুড়ে অন্যকে গন্ধ বিলানো। তুমি আমার সেই লাল গোলাপ, ধূপের গন্ধ তোমার সাথে আমার কি তুলনা হয়? জীবন এক মুহুর্মুুহু আর্তনাদের পূঞ্জীভূত স্বরূপ যা আত্মার ক্রন্দনে ঢেকে থাকে। এই তো জীবন এই সেই আমরা প্রতিদিন মরেও আবার বেঁচে থাকি। অথবা এই ভাবে বলা যায় থাকতে হয় প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে। আত্মার কষ্ট তোমার মত আমায়ও ছাড়ছে না। পার্থক্য শুধু আমি আটলান্টিকের এপাড়ে তুমি ওই পাড়ে পড়ে আছো। বুকটা যদি খুলে দেখানো যায় ক্ষতটা অবিকল একই মাপের একই রকম হবে তা হলফ করে বলা যায়…!

কয়েক দিন পর পহেলা বৈশাখ। বাংলা বাঙালির সার্বজনীন স্বতঃস্ফূর্তকতার দিন, প্রাণের আমেজের কাল। মন আবির দিয়ে রাঙানোর মাস। তুমি আর নেই পাশে কাকে নিয়ে যাই সেখানে যেখানে মন ধরে রঙের খেলায়। বকুল ফুলের মালা, মৌ মৌ গন্ধ এখানে কোথায় পাব। রেষ্ঠুরেন্টে বসে বদ্ধ ঘরে বসে ইলিশ পান্তা করে ঠান্ডা কিন্ত আমার মন ভিজে না। মন উরু উরু করে চায় তোমায় বুক ভরে। মনে পড়ে সেই রমনা পার্ক বটমূলে ছাঁয়া নটের অনুষ্ঠান আজও কি আছে তেমনটি সব, তুমি কি এখনও ঘুরে বেড়াও এ দিনটিতে। হলুদ শাড়ী, লাল বøাউজে ঢেকে রাখ উন্মাদ সেই যৌবনার স্রোতের পাগলা ঢেউ। আজও কি আমার হাতটি ধরে রমনা পার্কের বেঞ্চে বসে থাকার কথা ভাবো। তোমার সেই ঘেমে যাওয়া ছোট হাত দুটি আমায় আজও চুম্বকের মত টানে। সম্বিত ফিরে পাই দেখি পাশের টেবিলে সাদা ললনা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁকিয়ে আছে …!

বুলুর ভাইয়ের কান্ডে হতবাক সবাই। বড় ভাই সব বাবার জমি নিজের নামে লিখে নিয়েছে। বাহানায়, ঠকিয়ে অবুঝ ভেবে নাদান পেয়ে সুযোগ পেয়ে তা কাজে লাগিয়েছে। সেই বুলু আজ পৌঢ়। কিন্তু মনের ক্ষোভ আজও যাইনি। পহেলা বৈশাখের চাঁদনী রাতে ওর মন ফেরানোর জন্য ডাক্তার বাড়ির কলা গাছ কেটে কলা চুরির গল্প আজও মনে পড়ে। যেই ছুড়ি চালিয়েছি কলার কাদিতে ঝপাং করে গাছ বিকট শব্দে মাটিতে পড়ে গেল। বাড়ির লোক জনের হৈ চৈ শব্দে সবাই ভয়ে পালালো। বন্দুকের আওয়াজ আজও ভয়ে বুক কাঁপে মনে হয় মাথার খুলি বুঝি উড়ে গেল। আমি কিন্তু পাকা কলা ফেলে আসিনি। পরের দিন দুপুরে আম, মুড়ি, কলা আর কাঁচা আমের ভর্তায় স্কুল ঘরের মাঠে পহেলা বৈশাখ উদযাপন আজও কি ভুলিনি। মিনা আপার কন্ঠের সুরেলা রবীন্দ্র সঙ্গীত ” এসো হে বৈশাখ তুমি এসো” এখনও কানে বাজে সেই হিজ মাস্টার ভয়েজের কলের গানের রেকর্ডের মত।
সন্ধ্যায় মার দেওয়া তিন টাকা নিয়ে ছোট বোনের হাত ধরে কাঁচারি ঘাট বাজারে যেয়ে হাল খাতায় নিজেদের হিসাব খোলা বিনিময়ে কাটা ভাঙ্গি, নিমকি, রসগোল্লা, জিলাপির স্বাদ আজও যেন জিহ্বায় লেগে আছে। ইছামতি নদী পাড় হয়ে ঘরে ফেরা। হেঁটে পাড় হওয়ার সময় সেই ছোট বেলায় পড়া কবিতাখানি মনে পড়ে যেত” আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে”। সেই স্বচ্ছ পানি বোনের দিকে ছুড়ে মেড়ে ভিজিয়ে দিয়ে মার বকুনি খাওয়া আর হয়না। মা আর নেই চলে গেছে যাবার জায়গায় আর ফিরলো না।

বাড়িতে এসে মিষ্টির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মাড়ামাড়ি ভাই বোনেরা। মার মধ্যস্থতায় শান্তি ওম শান্তি আজও ভাবি কোথায় গেল আমার সেই নানা রঙের দিনগুলো! ওরা আজ কে কোথায় হারিয়ে গেল। জীবন কিছুটা হলেও স্বার্থপর আমি তুমি সে। তাই আমরা হারিয়ে যাচ্ছি জীবন থেকে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে। আমি নাড়ীর টানের মাটি থেকে অনেক অনেক দূর তাই বোধ হয় আমার অনুভূতির তীব্রতা আরো প্রকট বড্ড কষ্টে বুকে বাজে মিস করার অনুভূতিগুলো। দূরের তারার মত জ্বলজ্বলে আরো উজ্বল হয়ে হাত ঈশারায় বুকে টানে বলে “আয় আরো কাছে আয়…”!
নিউ ইয়র্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here