print

ডিপোর্টেশনের খড়্গ : আমেরিকান সন্তান থাকা সত্ত্বেও চলে যেতে হলো বাংলাদেশি আমিনুলকে

632

ঠিকানা রিপোর্ট: আমেরিকায় ইমিগ্র্যান্ট কম্যুনিটির সবচেয়ে খারাপ সময় ছিলো ৯/১১ এর সময়। এখন আরেকবার দু:সময় শুরু হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান শাসনামলে। ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলার পর ইমিগ্র্যান্ট কম্যুনিটির উপর নেমে আসে নানা ধরনের খড়গ। সেই সময় প্রেসিডেন্ট বুশ বিশ্বের ৩১টি দেশের অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের বিশেষ রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন, আবার কেউবা ভয়ে নীরবে বাংলাদেশসহ নিজ নিজ দেশে চলে গিয়েছেন। অনেক চেনা মুখ হারিয়ে গেছেন। তারা এখনো বাংলাদেশে বসবাস করছেন। কেউ ভাল আছেন, কেউবা খারাপ সময় অতিবাহিত করছেন।
২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আবারো অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের জীবনে নেসে আসে চরম দুর্দশা। বিশেষ করে অবৈধ ইমিগ্র্যান্টরা স্বস্তিতে নেই। সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। কখনো বাসায় বা কাজের জায়গায় হানা দেয় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। প্রতিদিনই হোমল্যান্ড সিকিউরিটির লোকজন হানা দিয়ে অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের গ্রেফতার করছে। গ্রেফতার করার পর অধিকাংশ লোকজনকেই তাদের নিজস্ব দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই ডিপোর্টেশন রয়েছে তাদের কোন সুযোগই দেয়া হচ্ছে না। আর যাদের ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে তাদের বেলায়তো কথাই নেই। গ্রেফতার হবার পর তাদের একমাত্র গন্তব্য হচ্ছে নিজ দেশ। এমন কি যাদের কোন ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই তাদেরও পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমেরিকায় জন্ম নেয়া সন্তান থাকা স্বত্তে¡ও তাদের ডিপোর্ট করে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ডিপোর্টেশন থাকা অনেকেই বাংলাদেশে চলে গিয়েছেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লিটনসহ অনেক পরিচিত মুখ হারিয়ে গেছেন।
৪৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী আমিনুল হক স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় এসেছিলেন কয়েক বছর আগে। নারায়ণগঞ্জের সন্তান আমিনুল হক পরিবার পরিজন নিয়ে নিউজার্সির এলিজাবেথে থাকতেন। সাথে ছিলেন স্ত্রী রোজিনা আক্তার, একমাত্র পুত্র সন্তান ইশান এবং একমাত্র কন্যা সন্তান ইভানা। ২০ বছর বয়সী কলেজ পড়–য়া ইভানার জন্ম আফ্রিকাতে হলেও ইশানের জন্ম হয়েছিলো নিউজার্সিতে। আমিনুল হকের বড় বোন ঠিকানাকে জানান, আজ থেকে ১২ বছর আগে তার ভাই আমিনুল স্ত্রী এবং কন্যা সন্তানকে নিয়ে উন্নত জীবন এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন। আমেরিকায় এসে এক মাসের মত নিউইয়র্কে ছিলেন। তারপরই তিনি চলে যান নিউজার্সিতে। সেখানেই তিনি বসবাস করছিলেন। মেয়ে ইভানা কলেজে পড়লেও ইশান স্কুলে পড়ছিলেন। আমিনুল হক নিউজার্সিতে ক্যান্টাকি চিকেন রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন, আর তার স্ত্রী কাজ করেন ৯৯ সেন্টের একটি দোকানে। আমেরিকায় এসেই রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে মামলা করেছিলেন। তার সেই মামলা আইনজীবীর ভুলের কারণে টেকেনি। মাননীয় বিচারক তার বিরুদ্ধে ডিপোর্টেশনের আদেশ দেন। সেই ডিপোর্টেশনের বিরুদ্ধে আপিল করে তিনি বসবাস করে আসছিলেন। যদিও এর মধ্যে তিনি একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। গ্রেফতারের কয়েক মাস পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। সেইভাবে চলছিলো তার দিনকাল। তার বড় বোন জানান, এরই মধ্যে হঠাৎ করেই ২৮ দিন আগে কাজের জায়গা থেকে আমিনুল হককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তিনি ২৮ দিন জেলে ছিলেন। গত ১৫ ফেব্রæয়ারি ছিলো তার মামলার শুনানীর দিন। ঐ দিন কোর্টের সামনে বাংলাদেশী কম্যুনিটির লোকজন ছাড়াও মূলধারার কয়েকটি সংগঠন এবং রাজনীতিবিদ উপ¯িত ছিলেন। বাংলাদেশী কম্যুনিটির লোকজনের মধ্যে উপ¯িত ছিলেন বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী, সিনিয়র সহ সভাপতি আব্দুর রহিম হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী, মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতির সভাপতি শাহাদত হোসেন প্রমুখ।
তার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জেলখানার মধ্যেই আমিনুল হক হোমল্যান্ড সিকিউরিটির লোকজনকে জানায় সে বাংলাদেশে চলে যাবে। যে কারণে তাকে ১৯ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে তার পরিবারকে ৮ মাসের সময় দেয়া হয়েছে। ৮ মাস পর তার পরিবারও এখান থেকে বাংলাদেশে চলে যাবে। তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমেরিকায় জন্ম নেয়া সন্তান থাকা সত্তে¡ও আমিনুল হককে কেন দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে? আইনজীবী কি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন? না কি হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কঠোরতার কারণে আমিনুলকে দেশে চলে যেতে হয়েছে? আমিনুলের বড় বোন জানান, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে। আমিও চিন্তা করিনি আমার ভাইয়ের এই অব¯া হবে। আমি যদি চিন্তা করতাম এই অব¯া হবে তাহলে আমি নিজেই তার জন্য আবেদন করতাম। কারণ আমি ১৯৯৬ সালে আমেরিকান পাসপোর্ট পেয়েছি।
অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, চলাফেরায় এখন সবাইকে সতর্ক হতে হবে। তা না হলে ট্রাম্পের নিষ্ঠুরতায় অনেকেরই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here