অভিবাসী ইস্যুতে বেকায়দায় বাইডেন প্রশাসন

    কখনো কখনো খবরের আকালে সম্পাদকীয় লেখার জন্য বিষয় খুঁজে বেড়াতে হয়। খবরের কাগজে খবর তো থাকবেই। কিন্তু যেকোনো বিষয় নিয়েই তো সম্পাদকীয় লেখা যায় না। আবার কোনো কোনো সংখ্যায় সম্পাদকীয় লেখার মতো গুরুত্ব বহন করে এমন অনেক খবরাখবর থাকে। তখন কোনটা ছেড়ে কোনটা নির্বাচন করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এই যেমন ঠিকানার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ সংখ্যা। অন্য পৃষ্ঠার সংবাদ বাদ থাক। প্রথম পৃষ্ঠায় ১৫টি সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। কম-বেশি গুরুত্ব বিবেচনায় ১৫টি সংবাদই সম্পাদকীয় লেখার মতো। ১৫টি সংবাদের মধ্যে ১২টি সংবাদই বাংলাদেশ নিয়ে। অবশিষ্ট তিনটির মধ্যে একটি সার্ক নিয়ে। আর দুটি যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট।

    এর মধ্য থেকে যে সংবাদটি এ সংখ্যার সম্পাদকীয়র জন্য নির্বাচন করা হলো, সংবাদটি আমেরিকায় যারা আনডকুমেন্টেড বসবাস করছেন, তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশে সব প্রবাসীর স্বপ্ন বৈধ হওয়ার। তার জন্য কত রকম যে চেষ্টা। অর্থ ব্যয়। অনেকে সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিঃস্ব পর্যন্ত হয়ে যায়। ইমিগ্রেশন ইস্যু নিয়ে নানা সময়ে নানা রকম খবর প্রকাশিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে কোনোটা থাকে আশা জাগানিয়া, কোনোটা হতাশায় ঢাকা। কখনো ইমিগ্র্যান্টদের জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনে কোনো কোনো খবর। আবার অভিবাসীদের ইস্যু নিয়ে মার্কিন প্রশাসনও কোনো কোনো সময় বেকায়দায় পড়ে যায়। এসব থেকেই প্রতীয়মান হয়, অভিবাসী বিশেষ করে কাগজপত্রহীন অভিবাসী এবং দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ইমিগ্রেশনের নিউজ কত তাৎপর্যপূর্ণ।

    আমেরিকাকে বলা হয় ইমিগ্র্যান্ট-বান্ধব দেশ। নিজ দেশে নিপীড়নের শিকার মানুষেরা আশ্রয় খোঁজেন আমেরিকায়। আমেরিকাও গভীর মমতায় স্বদেশছাড়া আশ্রয়হীন মানুষদের বুকে টেনে নেয়। আশ্রয় দেয়। এটা অনেকটা দেওয়া-নেওয়ার প্রশ্ন। আজকের আমেরিকা গড়ে উঠেছে অনেকটা অভিবাসীদের শ্রমে-মেধায়। তাই তো আমেরিকায় ইমিগ্র্যান্টদের আশ্রয়দানের বিষয়টিকে বিবেচনা করা আমেরিকার অনেকটা কৃতজ্ঞতা স্বীকার এবং অনেকটা উদারতা প্রদর্শন।

    ‘অভিবাসী ইস্যুতে বেকায়দায় পড়তে যাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদকে সামনে রেখেই এই ভূমিকার অবতারণা। সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে ঠিকানার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায়। খবরটির শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘অভিবাসী ইস্যুতে বেকায়দায় পড়তে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। বিশেষ করে, টেক্সাস সীমান্ত জড়ো হওয়া হাইতি থেকে আসা লোকজন তার প্রশাসনের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। টেক্সাসের রিড গ্রান্ডির ডেল রিও ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজের কাছে অস্থায়ী তাঁবুতে গাদাগাদি করে থাকা শরণার্থীরা সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ই আসতে শুরু করে। অভিবাসন নিয়ে রাজনীতির সূচনা ট্রাম্পের সময় হলেও এর জের টেনে চলছে বাইডেন প্রশাসন।’

    জো বাইডেনকে ইমিগ্রেশন-বান্ধব প্রেসিডেন্ট হিসেবে জানে বিশ্ববাসী। প্রেসিডন্ট ট্রাম্প ইমিগ্র্যান্টদের জীবনে নাভিশ্বাস তুলেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেবল আনডকুমেন্টেড নন, বৈধ অভিবাসীরাও সে সময় দুর্ভাবনার মধ্যে দিন কাটাতেন। কারো মনেই স্বস্তি ছিল না। চারদিকে আনডকুমেন্টেড, যাকে বলে অবৈধ অভিবাসী, তাদের জন্য ঘোর দুর্দিন। চারদিকে অন্ধকার। সাদা-কালোর বৈষম্য। খ্রিষ্টান-মুসলমানে বৈষম্য। আমেরিকা তার মূল চেতনা থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। যে আদর্শের ভিত্তির ওপর আমেরিকা দাঁড়িয়ে, যা আমেরিকার শক্তির উৎসÑতা ধসে পড়ার অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ শাসনের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ ছিল ট্রাম্পের শাসন পরিচালনার নিয়ম। দেশের মধ্যে নিত্য কলহের সৃষ্টি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একে একে বন্ধু হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে আমেরিকা। হোয়াইট সুপ্রিমেসির প্রবল জোয়ার। কালোরা নিষ্পেষিত। মুসলমানরা ঘৃণার অনলে দগ্ধ।

    ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে আমৃত্যু ক্ষমতায় রাখার অভিলাষে গণতান্ত্রিক আমেরিকায় নিজেকে এমন এক স্বৈরশাসকের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করেন যে দেশে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা, মূল্যবোধ, ন্যায়বিচারÑএকে একে সব বন্দি হতে থাকে তার মুঠিতে। ট্রাম্প হেন কাজ করেননি, যা কোনোভাবেই আমেরিকার মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে যায়। তার প্রশাসন পরিচালনার ধারার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বা নিজেদের মানিয়ে নিতে না পারার জন্য তার ঘনিষ্ঠ অনেকে তার সঙ্গ এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব ত্যাগ করে দূরে সরে যান। নিকট অনেক স্বজনও তার সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন। তার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন ওঠে আর্থিক ও চারিত্রিক দুর্বলতা নিয়েও। তার উসকানিতে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে নিজের উগ্রবাদী সমর্থকেরা যে তাণ্ডব চালায়, তা ১৮৬২’র গৃহযুদ্ধের পর আর কোনো সহিংসতার সঙ্গে তুলনীয় নয়। ওই ঘটনায় একজন পুলিশসহ পাঁচজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।

    ২০২০ সালের নির্বাচন এগিয়ে আসতে থাকলে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়ে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের নির্মমতায় মৃত্যুবরণ করে। আমেরিকাজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আমেরিকার উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমের আকাশ-বাতাস। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জোট বাঁধে এ দেশের মুক্তবুদ্ধির সব মানুষ এবং কালো-সাদা, সব ধর্ম-বর্ণের ইমিগ্র্যান্ট সমাজ। প্রেসিডেন্ট পদে ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিসের পক্ষে সৃষ্টি হয় গণজোয়ার। জো বাইডেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার পক্ষে, বিশেষ করে আনডকুমেন্টেড ইমিগ্র্যান্টদের সামনে বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা তুলে কর্মসূচি দিলে সবাই মরিয়া হয়ে ওঠে ডেমোক্র্যান্ট প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার, যাদের বিরুদ্ধে একসময় ভোট দিতে যান না বলে দুর্নাম ছিল, তারাও সবাই ভোট দেন দল বেঁধে।

    ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প পপুলার ভোটে হেরেও ইলেক্টোরাল বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেন পপুলার ও ইলেক্টোরাল উভয় ভোটেই বিপুলভাবে বিজয়ী হন। সেই ফল উল্টে দিতেও ট্রাম্পের কত রকমের নোংরামি দেখতে পেল আমেরিকানরা, যা ইতিপূর্বে পরাজিত কোনো প্রার্থীর ক্ষেত্রে ঘটেনি। ট্রাম্প অনেকটা যেন গায়ের জোরেই সব নিয়মকানুন উল্টে দিয়ে নিজেকে ‘বিজয়ী’ ঘোষণা করতে চান। আমেরিকার ইতিহাসই পাল্টে দিতে চান। তবে সবকিছুর শেষে আমেরিকা যে আমেরিকাই, সেটাই প্রমাণিত হয়।

    জো বাইডেন ২০২১-এর ১৯ জানুয়ারি শপথ নিয়েই নির্বাহী আদেশে ট্রাম্পের অনেক আদেশ বাতিল করে দেন। বিশেষ করে, ইমিগ্র্যান্ট স্বার্থবিরোধী যেসব আদেশ ছিল। তিনি অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের বৈধ হওয়ার পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা, তা দূর করে তাদের বৈধ হওয়ার পথ সুগম করার কথাও বলেন। জো বাইডেনের উদার অভিবাসন নীতি নিয়ে বৈধ-অবৈধ সব ইমিগ্র্যান্টের মধ্যেই একটা প্রত্যাশার জন্ম নেয়। এমনকি দারিদ্র্যপীড়িত বিভিন্ন দেশের মানুষও ভাগ্যান্বেষণে যুক্তরাষ্ট্রে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রে ছুটে আসার পেছনে আরেকটা বড় কারণ বাইডেনের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভÑমানবাধিকার।

    প্রেসিডেন্ট বাইডেন বেকায়দায় পড়েছেন তার উদারনৈতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারের কারণে। বাইরের দেশ থেকে ইমিগ্র্যান্ট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অসংখ্য মানুষ আমেরিকার সীমান্তে এসে জড়ো হচ্ছেন। তারা এসে নানা দুর্ভোগ নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছেন। আর গোদের উপর বিষফোড়ার মতো বর্ডার পেট্রল এজেন্টদের অত্যাচার সইতে হচ্ছে তাদের। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাম্পযুগে বর্ডার পেট্রল এজেন্টদের যে আচরণ ছিল, এখনো তা-ই আছে, কোনো পরিবর্তন হয়নি। হোয়াইট হাউস থেকে ইমিগ্রেশনপ্রত্যাশীদের সাথে তাদের এই আচরণের সমালোচনাও করা হচ্ছে। অথচ ট্রাম্পযুগের নীতির পরিবর্তন ঘটাবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েই বাইডেন জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। সীমান্তে পেট্রল এজেন্টদের আচরণে মনে হচ্ছে, বাইডেন প্রশাসন এখনো ইমিগ্রেশন নীতিমালা বাস্তবায়নে দ্বিধান্বিত, যে কারণে সমালোচিত বাইডেন প্রশাসন। নিজ দল ডেমোক্র্যাটিক এবং বিরোধী রিপাবলিকান উভয় পার্টির দিক থেকেই।

    ইমিগ্রেশন প্রশ্নে অনেকেই বলে থাকেন, ডেমোক্র্যাটরা মুখে ইমিগ্র্যান্টবান্ধব, রিপাবলিকানরা কর্মক্ষেত্রে ইমিগ্র্যান্টবান্ধব। সে যা-ই হোক, এবার সব আমেরিকান গভীর প্রত্যাশা নিয়ে প্রতীক্ষায় আছেন, অন্তত জো বাইডেন ইমিগ্র্যান্টদের স্বপ্নপূরণে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। তিনি যদি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারেন, তবে ইমিগ্র্যান্টদের স্বপ্নভঙ্গ হয়তো হবে; তবে বাইডেন প্রশাসন শুধু বেকায়দায় পড়বে না, ভবিষ্যৎ নির্বাচনেও বেকায়দায় পড়ার আশঙ্কা থাকবে জো বাইডেন, এমনকি তার দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্যও। ইতিহাস বড়ই নির্মম!