আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শ্রমশক্তির ভবিষ্যৎ

    ছালাবত জাং চৌধুরী : প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমিটির সবুজের এই ছোট্ট সুন্দর দেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। নদীবিধৌত পলিমাটি দ্বারা গঠিত উর্বর এই জনপদে কি নেই? পাহাড়-নদী-সাগরঘেরা এ দেশের রয়েছে প্রচুর খনিজ সম্পদ ও বন-বনালী। রয়েছে অদক্ষ-আধাদক্ষ এক বিরাট শ্রম শক্তি। এরা যেমন কঠোর পরিশ্রমী, তেমনি কাজের প্রতি খুবই যত্নশীল, এ কারণেই বিদেশি শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বলেই প্রতীয়মান। যার প্রমাণ প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। যা কিনা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জিডিপি বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল বা চলমান প্রক্রিয়া। তবে দুঃখজনক এই যে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বার বার সময় বাড়ানো বা খরচ বার বার বাড়িয়ে প্রকল্প খরচ অনেক বাড়ানো বা যথাসময়ে কাজটি সম্পন্ন না করার জনভোগান্তি যেমন অনেক বেড়ে যায়, তেমনি জনগণের কাঁধে ঋণের বোঝাও অনেক বেড়ে যায়। দেশের সাধারণ মানুষকেই বছরের পর বছর ধরে এই ঋণের বোঝা বইতে হয়। বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের বোধবুদ্ধির বিচার বিবেচনার দাবি রাখে। বর্তমান সরকার দেশব্যাপী ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের এক যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বহির্বিশ্বের অনেক দেশ বা কোম্পানি বিভিন্ন শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠাকল্পে সরকারের কাছে জমি বরাদ্ধের আবেদনও জমা দিয়েছেন বলে জানা যায়। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলো। তবে এ বিষয়ে সরকারকে একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যেমন এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহজ শর্ত প্রদান করা। অন্যদিকে জমি বরাদ্ধের বিষয়েও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা। যেমন বাংলাদেশ ভূখণ্ডের কোন জমি বিদেশি কোন কোম্পানিকে স্থায়ীভাবে ইজারা না দেয়া। ১০, ২০, ৩০ বছর বা আরো অধিক বছর ইজারা দেয়া হলেও তা প্রতি ৫ বছর পরপর নবায়ন করা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানসমূহ যে নিয়মে ভূমির কর স্থানভেদে বিভিন্ন নিয়মে সরকারকে দিয়ে থাকে, সেভাবেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বাৎসরিক কর সরকারকে দিতে বাধ্য থাকবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নির্ধাপরিত সময়ে মধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু এবং শেষ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদনে যাওয়ার পর কয়েক বছর অর্থাৎ ২ থেকে ৩ বছর ট্যাক্স রিবেট বা উৎপাদন আয়কর মওকুফ করা যেতে পারে। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সমর্থ হবে। কোম্পানিগুলো নিজের আয়ের লভাংশের একটি অংশ বাংলাদেশ সরকারকে দিতে বাধ্য থাকবে। অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগে যেসব শ্রমিক, বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সাধারণ অদক্ষ বা আধা দক্ষ শ্রমিক কাজ করবেন, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিক কাজ করার সুযোগ কতটা পাবেন, তার একটা নিশ্চয়তা অবশ্যই থাকতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ৭০ শতাংশ বাংলাদেশের শ্রমিকের কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলো সফলভাবে যাত্রা শুরুর প্রয়োজনে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ সাময়িকভাবে করতে পারে। তবে ৩০ শতাংশ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিয়োগের ছাড়পত্রতো দেয়াই আছে। আর এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তি করারও কোন কারণ নেই। কেননা বাংলাদেশি শ্রমিকরা বিদেশি শ্রমিকদের চেয়ে অনেক কম পারিশ্রমিক বা বেতনে কাজ করতে সম্মত। এদের প্রয়োজনে ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে পর্যায় ভিত্তিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই সরকার কিছু ট্রেনিং স্কুল স্থাপন করেছে বলে জানা যায়। এসব স্কুল মানসম্মত ট্রেনিং দিতে সক্ষম কিনা, সেদিকে কঠোর মনোযোগী বা নজরদারি রাখা প্রয়োজন। এমন কি ট্রেনিং সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রতিটি ট্রেনিং স্কুলে থাকা বাধ্যতামূলক। প্রয়োজনে আরো বিশেষায়িত স্কুলও স্থাপন করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারকে বিশেষ অর্থ বরাদ্ধ দিয়ে শ্রমজীবী অদক্ষ শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ বরাদ্ধকৃত অর্থের সঠিক ব্যয়ও নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে সরকারি হাসপাতালের পর্দা-বালিশ, বিছানা-চাদর, বাল্ভ কেনার যে চিত্র বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম, ফেইস বুকের মাধ্যমে জানা যায়, সে ধরণের সাগর চুরির ঘটনা যেনো কোনভাবেই ভবিষ্যতে না ঘটে।
    আরো একটি বিষয়ে সরকারের অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। স্থানীয় সরকার বা লোকাল গভরমেন্ট প্রশাসনের মাধ্যমে যেসব রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট নতুনভাবে তৈরি বা সম্প্রসারণ করা হয়েছে, সেসব প্রকল্পের কাজ মানসম্মত হয়েছে কি-না, বা না হয়ে থাকলে তার কারণ চিহ্নিত করা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎকারীদের কঠের বিচারের ব্যবস্থা করাও সরকারের অবশ্য করণীয় দায়িত্ব। জনগণের অর্থ এভাবে লুটেপুটে খাওয়ার কারণেই বেশির ভাগ প্রকল্প আগামী দুই-এক বছরের মধ্যেই ধ্বংসপ্রান্ত হয়ে বর্তমান সরকারের অর্জনকে কালিমালিপ্ত করবে। প্রতিটি জেলা, উপজেলায় সরকারি যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যাপক অন্যায়ের মধ্যে ডুবে আছেন, তাদের খোঁজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ ডুবুরী পাঠিয়ে অন্যায়ের সমুদ্রের তলদেশ থেকে উদ্ধার করে জনসমক্ষে আনা হোক। জাতীয় এই মীরজাফরদের কঠোর বিচারই দেশপ্রিয় মানুষের কাম্য।