‘আমার জীবনটাই সংগ্রামমুখর’

    ঠিকানা রিপোর্ট : ‘আমার জীবনটাই দুর্ঘটনাময় ও সংগ্রামমুখর। দুর্ঘটনার পথ বেয়ে বেয়েই আমি আজ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। আমার জন্ম ফেণীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে। আমাদের পরিবারে কেউ কখনোই স্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলো না, সবাই ছিলো মাদ্রাসা লাইনে শিক্ষিত। আমার মায়ের ইচ্ছ্য়া আমিই সেই পরিবার থেকে প্রথম স্কুল শিক্ষায় যাই। কিন্তু নানা কারণে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি। সময় মতো পরীক্ষার ফি জমা দিতে না পারায় ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা আর দেয়া হয়নি। কলেজ ছাত্র থাকা অবস্থাতেই সাপ্তাহিক সংগ্রাম পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় আমার হাতেখড়ি। স্বল্পশিক্ষা নিয়ে তারপর থেকে আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আজকের অবস্থানে পৌছেছি।’
    কথাগুলো বলেছেন ঋদ্ধ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ। তার ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২১ নভেম্বর (রবিবার) বিকেল ৫টায় নিউইয়র্ক লাগোর্ডিয়া ম্যারিয়ট হোটেলে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

    অনুষ্ঠানের শুরুতেই ভিডিও বার্তায় মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চেতনায় ভাস্বর বরেণ্য সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহকে শুভেচ্ছা জানান- সরকার কবির উদ্দিন, রোকেয়া হায়দার, শারমীন আহমেদ, মোস্তফা সারোয়ার প্রমুখ।

    এরপর একে একে মঞ্চে এসে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে মো. হোসেন খান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে নঈম আজমী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে মেহের কবির, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে মিজানুর রহমান, ফেণী অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে আবদুর রব, ডা. মুজিবুল হক ও রফিক পাটোয়ারী প্রমুখ।
    সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন বিশিষ্ট সাংবাদিক বেলাল বেগ ও লেখক-সাংস্কৃতিক কর্মী মুত্তালিব বিশ্বাস।

    অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক, বিশিষ্ট কমিউনিটি লিডার, বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সেক্রেটারি ফখরুল আলম; বদিউজ্জামান খসরু, আবুল কাশেম প্রমুখ।

    এছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সুধীজন তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন গোলাম মোস্তফা ও সাবিনা শারমিন নিরু।
    সূচনা বক্তব্যে আহ্বায়ক ফখরুল আলম বলেন, এমন একজন কৃতি ও ঋদ্ধ মানুষকে সম্মাননা জানাতে পেরে আমরা নিজেরাই ধন্য এবং গর্বিত। তবে সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ’র এই সংবর্ধনাই শেষ নয়। শুরু হোক। অগ্রজ প্রজন্মকে শ্রদ্ধা জানাতে না পারলে নিজেদের বড় ক্ষুদ্র মনে হয়।

    বক্তব্যে সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহ প্রথমেই এ ধরণের আয়োজনের জন্য সংবর্ধনা কমিটি এবং উপস্থিত সুধিমণ্ডলীকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।
    তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন দেখেছি পাকিস্তানিরা কীভাবে পূর্ব বঙ্গের মানুষকে শোষণ-নিপীড়ন করছে। এর প্রতিবাদে সাংবাদিক সমাজ কলমকেই অস্ত্র বানিয়েছে। তাদের ক্ষুরধার লেখনীতে বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে সচেতন হয়েছে।

    সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর জানুয়ারি মাসে কপর্দকহীন অবস্থায় স্ত্রী ও কয়েক মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় আসি। সে সময় প্রথম আমার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন তৎকালীন বার্তা সংস্থা ইস্টার্ন নিউজের মালিক-সম্পাদক গোলাম রসুল। যার প্রতি আজও আমি কৃতজ্ঞ।

    এরপর আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছি। ১৯৭৩ সালে আমাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে অফিস থেকে সাংবাদিক হিসেবে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। ১৯৭৪ সালে কমনওয়েথ ফেলোশিপের আওতায় আমি ইল্যাণ্ডে গিয়ে সাংবাদিকতায় জ্ঞানলাভ করি। আজও আমার কাছে মনে হয়, এই যে আমার এগিয়ে যাওয়া, সবই দুর্ঘটনাবশতঃ, কারণ এ পর্যন্ত পৌছার পক্ষে আমার ততোখানি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা যোগ্যতা ছিলো না। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কাভার করার অনন্য সৌভাগ্য হয়েছে আমার।

    সাংবাদিকতা করতে গিয়ে দেশ-বিদেশে বহু জ্ঞানী-গুণী মানুষের সাথে আমার পরিচয় ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছে। জীবনের শেষ বেলায় এসে মনে হয়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খামতি, মাত্র মেট্রিক পাশ, থাকলেও আমি অন্য সবার চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে পড়িনি। বরং আজকে এমন একটি পর্যায়ে এসে পৌছেছি, যা আমার কল্পনাকেও হার মানায়।

    অনুষ্ঠানের মাঝে সঙ্গীত পরিবেশন করেন, শহীদ হাসান, রথীন্দ্রনাথ রায়, শাহ মাহবুব। একক নৃত্য পরিবেশন করে, জেরিন মাইশা, লিওনা মুহিত। দলীয় নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন অন্তরা সাহা, মেঘা সরকার, আনিশা মির্জা, অবণী প্রমুখ। এই সংবর্ধনা উপলক্ষে একটি রঙিন ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়।
    নৈশভোজের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।