আর কোনো অস্ত্র প্রতিযোগিতা নয় অস্ত্রমুক্ত সবুজ বিশ্ব চাই

    খবর ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন যুগ শুরু’। বিশ্ববাসীর কী দুর্ভাগ্য! তারা চায় অস্ত্রমুক্ত একটি সবুজ বিশ্ব। সেখানে পায় স্নায়ুযুদ্ধ, পায় নিত্যনতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা। মানুষের স্বপ্ন একটি শান্তিপূর্ণ বাসযোগ্য বিশ্ব। মানুষের স্বপ্ন নিয়ে, একটি বাসযোগ্য বিশ্বের আকাক্সক্ষার সঙ্গে কী নির্মম পরিহাস! নির্দিষ্ট কোনো দেশ বলি কিংবা আন্তর্জাতিক বিশ্ব বলি, বিচ্ছিন্নভাবে হোক বা সমন্বিতভাবে হোক, সবাই শান্তির কথা বলে। বলে যুদ্ধবিরোধী কথা। ক্ষুধার বিরুদ্ধে, পরিবেশদূষণের বিরুদ্ধে, দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলে। মানুষের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির কথাও বলে সবাই। কিন্তু কার্যত দেখা যায় সম্পূর্ণ উল্টো!

    বিশ শতকের বিশ্ব ভুগেছে ঠান্ডা লড়াই বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। দুই বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক পরিণতিও ভোগ করেছে। আর অবর্ণনাযোগ্য আঞ্চলিক যুদ্ধ ও সীমান্ত উত্তেজনা। সব মিলিয়ে অগণিত মানুষের মৃত্যু, সম্পদহানি, সভ্যতা ও শান্তির অগ্রযাত্রা বাধাপ্রাপ্ত। অন্যদিকে অনেক সমস্যা ও সংকটের ন্যায়সংগত সমাধানও বাধাগ্রস্ত হয়েছে দুই পরাশক্তির ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিণতিতে। এ দুই পরাশক্তিই জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য। দুই পরাশক্তিই নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেওয়ার অধিকার রাখে। দুই পরাশক্তিই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। বিশ্বকে চোখ রাঙিয়ে শাসন করার ক্ষমতা রাখে। তাদের দাপটে জাতিসংঘ সব সময়ই ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হয়ে থেকেছে। কোনো সংকটের কোনো সমাধান আনতে পারেনি।

    নব্বইয়ের দশকে এক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে বিশ্ব এক মেরুতে পরিণত হয়। এরপর এক পরাশক্তির প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের অবসান ঘটে। তবে বিশ্ব সংকটমুক্ত হতে পারে না। বিশ্ব একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকার অধীন হয়ে পড়ে। এর ফলে সব সংকটের একপাক্ষিক সমাধান প্রকৃত কোনো সমাধানই আনতে পারে না। বরং যে সংকটটি প্রকট ও বিস্তৃত ছিল না, যেমন জঙ্গিবাদ, চরমপন্থা, মৌলবাদ-এসব সংকটে বিশ্ব পর্যুদস্ত থাকে। চোরাগোপ্তা কার্যক্রম এবং চোরাগোপ্তা হামলা বাড়তে থাকে। সেই জঙ্গিবাদের অভিশাপ আফগানিস্তান, ইরাক, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমগ্র বিশ্বটাকেই গ্রাস করে শান্তি ও সভ্যতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

    এই জঙ্গিবাদের হামলা থেকে পরাশক্তি আমেরিকাও মুক্ত থাকে না। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার নিউইয়র্কে বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রখ্যাত টুইন টাওয়ার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় জঙ্গিদের বিমান হামলায়। অনুরূপ বিমান হামলায় ওয়াশিংটনে সিআইএ ভবন বিধ্বস্ত হয়। আরো একটি জঙ্গি বিমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ফিলাডেলফিয়ায় বিধ্বস্ত হলে বিমানের যাত্রী-ক্রুসহ জঙ্গিদের সবাই নিহত হয়। টুইন টাওয়ারের এক হামলাতেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা অন্তর্ঘাতমূলক কোনো হামলার যোগফলেও এত মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা সমগ্র বিশ্বের বাস্তবতা পাল্টে দেয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বাস্তবতা পাল্টে যায়। আফগানিস্তানকে শিক্ষা দিতে আমেরিকা দেশটিকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। জঙ্গিনেতা ওসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমর নিহত হয়। ওদিকে ইরাক ও লিবিয়ার দুই একনায়ক সাদ্দাম হোসেন ও মোয়ামের গাদ্দাফির পতন ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরব বসন্ত’ নামে এক নতুন আন্দোলনের সূচনা হয়।

    বিশ্ববাসী আসলে মানবসভ্যতার জন্য যেকোনো বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে চায়। জঙ্গিবাদ, যুদ্ধ, ধ্বংস, মৃত্যু, জরা আর কোনো কিছুই যেন মানুষের কান্না, হাহাকারের কারণ না হয়। সভ্যতা ও শান্তি বিপন্ন করতে না পারে। কিন্তু চাইলেই তা মেলে না। ঠান্ডা যুদ্ধ নেই বটে সেই অর্থে। তবে পত্রিকার খবরে মনে হয়, মানবসভ্যতার সামনে নতুন বিপদ, ধ্বংসের নতুন বার্তা আসছে। যা এই সম্পাদকীয়ের শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছে। ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতার নতুন যুগ

    শুরু?’Ñপ্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে শিরোনামটি রয়েছে। কিন্তু খবরটি যেসব কথা প্রকাশ করেছে, তাতে শুধুই প্রশ্ন থাকেনি। চরম শঙ্কার কারণই ব্যক্ত হয়েছে খবরটিতে। প্রথমেই প্রশ্ন রেখে বলা হয়েছে, ‘বৈশ্বিক রাজনীতির তপ্ত হাওয়া কোন দিকে বইছে? গত কয়েক বছরে রাজনীতির ভরকেন্দ্র কি নড়ে গেছে? খোলা চোখেও কিছু বিষয় বেশ নজরে আসছে। গত শতকে মার্কিন-সোভিয়েত দ্বন্দ্ব শেষ হয়েছে। এরপর ইরাককে ঘিরে শুরু হয়েছিল ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসন। তেমন কোনো সমাধান ছাড়াই সেই আগুন নিভে যেতে না যেতেই টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছিল ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’।

    ‘অনন্তকাল’ লাগেনি, দুই দশকের মাথায় সেই যুদ্ধের ‘তিক্ত’ সমাপ্তি হয়েছে। এই সময়টুকুর মধ্যেই আবার মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) তাণ্ডব বয়ে গেছে।’ সম্প্রতি বৈশ্বিক রাজনীতির অঙ্গনে চীন-মার্কিন ঘিরে নতুন উত্তেজনা শুরু হয়েছে।

    সবই গ্লোবাল ভিলেজে বাজার দখলের দ্বন্দ্ব। নতুন বোতলে পুরোনো মদ। পুরোনো নাটক। সময়ের হাত ধরে কিছু চরিত্র বদল আর কি? আবারও সেই দুই মেরুর বাজার দখলের লড়াই। তবে এবারের নাটকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। সে চরিত্রে মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে চীন। এটি সময়ের নিয়ম। চীন অনেক দিন থেকেই পরাশক্তির ভূমিকা রেখে আসছিল। বাজার দখলের কায়দাও পুরোনোই বলতে হয়। সেই ‘ঋণ’ রাজনীতি। দেশকে উন্নত করতে চাও? জগৎ শেঠের মালখানা খোলা। সুদ অল্প। অর্থ সাহায্য, কারিগরি সাহায্য। কী চাই? সব দেব। কোনো শর্ত নেই। তবে কথা একটাইÑআমি তোমার পাশে, তুমি আমার পাশে। পাশ থেকে সরা যাবে না। সরতে চাইলে ঋণের টাকা রেডি রাখতে হবে।

    আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্বের সূচনা তখন থেকে, যখন চীন বিশ্বের বাজার দখলের লড়াইয়ের ময়দানে খেলোয়াড় হিসেবে নেমেছে। সেই ঠান্ডা দ্বন্দ্ব এখন আর ঠান্ডা থাকছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, সেই লড়াই এখন অস্ত্র প্রতিযোগিতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এবং সমূহ আশঙ্কাÑএ দ্বন্দ্ব অস্ত্রের লড়াই থেকে নিশ্চিত উত্তেজনা ছড়িয়ে দেবে অতীতের সেই মার্কিন-সোভিয়েত মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের মতো। দুই পক্ষের অস্ত্রভান্ডার যত স্ফীত হবে, প্রতিযোগিতা তত তীব্র হবে এবং পৃথিবী ততই উত্তপ্ত হবে। নতুন উত্তাপে হাওয়া লাগিয়ে তাকে আরো উত্তপ্ত করে তুলেছেন মার্কিন কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত রবার্ট উড। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই চীন পানির নিচ দিয়ে কাজ করতে সক্ষম, এমন ড্রোন ও পারমাণবিক শক্তিধর ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাবে। তখন শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হবে। পরিস্থিতিও বদলে যাবে।’ রবার্ট উড এও মনে করেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে চীনের অস্ত্রভান্ডার দ্বিগুণ হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর তথ্য প্রকাশ করেছে, চীন এখনই প্রায় ২০০ পরমাণু অস্ত্রের মালিক। যার মধ্যে কোনো কোনোটি আমেরিকায় আঘাত হানতে সক্ষম।

    পেন্টাগন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে চীন অন্তত এক হাজার পারমাণবিক বোমা বানাতে সক্ষম হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবি চীন খারিজ করে এলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এ পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন-রুশ উত্তেজনার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

    এই উত্তেজনা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে তাইওয়ানকে ঘিরে। তাইওয়ানকে নিয়ে দুই পক্ষেরই রশি টানাটানি চলছে। চীন মনে করে তাইওয়ান তাদের মূল ভূখণ্ডের অংশ, যদিও তাইওয়ান নিজেদের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল মনে করে। তাইওয়ানের দাবির সমর্থনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীন কোনোভাবেই তাইওয়ানের দাবি স্বীকার করে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং সঙ্গে উত্তেজনাও বৃদ্ধি পাবে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

    কিন্তু শান্তিপ্রিয় বিশ্ব-সমাজ অতীতের আর কোনো অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিশ্ব মোড়লদের মধ্যে কোনো উত্তেজনা দেখতে চায় না। করোনা-উত্তর বিশ্বে সবাই বিশ্বাস করে নিয়েছিল, নিউ রিয়াল সত্যিকার অর্থেই নতুন এক বিশ্ব উপহার দেবে। কিন্তু বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে, যা করোনা-উত্তরকালে মানুষ কোনোভাবেই প্রত্যাশা করে না। মানুষ খুব আশা করেছিল, করোনা মানুষকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তাতে মানুষের দেহ-মন-মস্তিষ্ক থেকে মানুষকে মারার চিন্তা দূর হয়ে মানুষকে বাঁচানোর ভাবনায় সবাই উদ্বুদ্ধ হবে।