ইসলামে হযরত আয়শা (রা.)-এর ভূমিকা

    ধর্ম

    শামসাদ হুসাম :

    তাঁর নাম ছিলো আয়শা সিদ্দিকা। ‘হুমায়রা’ উপনামেও ডাকতেন তার অভিভাবকেরা কেউ কেউ। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক-এর কন্যা ছিলেন তিনি। ‘সিদ্দিক’ শব্দের অর্থ ‘বিশ্বাসী’। বিশ্বাস আর ভালোবাসা দিয়ে তিনি নবী করিম (দ.)-এর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বন্ধুর মতো, অভিভাবকের মতো সঙ্গ দিয়েছেন। আগলে রাখতে চেয়েছেন শত্রুর মোকাবেলার ঢাল হয়ে। সেই সাহাবা-প্রধান আবু বকর (রা.)-এর ইচ্ছে হয়েছিলো নবীর (দ.) সাথে সম্পর্ক তৈরির একটা প্রয়াস খোঁজা। কিন্তু ঘরে তখন তার একটি মাত্র কন্যা আয়শা, নিতান্তই বালিকা মাত্র। অন্য কন্যাদের বিয়ে হয়ে গেছে। এই অবস্থায় নবীজির কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করলে আল্লাহর নবী আয়শা সিদ্দিকার বয়সের কথা তুলে বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। নবী করিম (দ.)-এর বয়স তখন বায়ান্ন বছর। বিবি খদিজা, নবীর প্রথম স্ত্রী ততোদিনে মারা গেছেন। ঘরে তখন নাবালিকা কয়েকজন কন্যা রয়েছেন। নবী (দ.) তাদের দেখাশোনার জন্য বিবি সাওদা নামক এক মহিলাকে বিয়েও করেছিলেন।

    ঐ সময়ে ওহী নাযিল হলো। মহান আল্লাহ আবু বকর (রা.)-এর ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে ঘোষণা করলেনÑ স্বয়ং আল্লাহ চাচ্ছেন বিবি আয়শার মাধ্যমে ইসলামের গতিধারা যেনো সামনের দিকে এগিয়ে যায়। হযরত খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পরে নবুয়তের দশম হিজরি সনে বিবি আয়শার সাথে নবী করিম (দ.)-এর বিয়ে হয়ে গেলো। আয়শা (রা.)-এর বয়স তখন মাত্র সাত বছর। বিয়ের দেনমোহর ছিলো ৪৮০ দিরহাম। এই বিয়ের তিন বছর পরে তিনি নবীগৃহে আগমন করেছিলেন।

    আর তার জন্ম সময় ছিলো নবীর মদিনায় হিজরতের আগে, ৬১৪ খ্রিস্টাব্দে। অবুঝ এক বালিকা থেকে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে আল্লাহর নবী তাকে বন্ধুর মতো সহযোগিতা করেছিলেন, যে কারণে তার মানসিক বিকাশ ঘটেছিলো অন্য মাত্রায়। প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন এক বালিকা থেকে উন্নত চিন্তাধারার অধিকারী মানুষ হিসেবে তাঁর উত্তরণ কালটা ছিলো বিস্ময়কর! কোরআন শরীফের দুর্বোধ্য আয়াতগুলোর অর্থ তিনি নবীজির (দ.) কাছ থেকে বুঝে নিতেন সময় সময়। যার কারণে কোরআনের ব্যাখ্যা এবং হাদিস বর্ণনায় তিনি প্রধান সাহাবাদের সমকক্ষ ছিলেন। কোরআন শরীফ ঘরে-বাইরে সব জায়গায় হযরত (দ.)-এর ওপর নাযিল হতো। কিন্তু কেবলমাত্র নবী করিম (দ.) যখন বিবি আয়শার ঘরে অবস্থান করতেন, তখন জিবরাইল ফেরেশতা ওহী নিয়ে ঐ ঘরে উপস্থিত হতেন। কথিত আছে, বিবি আয়শা নিজের কানে সেই ওহী শুনতে পেতেন এবং দু’বার তিনি নিজের চোখে বাণীবাহক ফেরেশতাকেও দেখেছিলেন। নবীজি (দ.) জুম্মার নামাজের খুতবা দিতেন না যতোক্ষণ না সেই নামাজে বিবি আয়শা উপস্থিত হতে না পারতেন। তিনি নিজে কোন দাওয়াতও গ্রহণ করতেন না, কেউ যদি বিবি আয়শাকে দাওয়াত না দিতেন। মূলত বিবি আয়শাকে ইসলামি ও শরিয়তি মাসালা সম্পর্কে অভিজ্ঞ করে তোলার লক্ষ্য নিয়েই তিনি এমনটা করতেন। যার ফলে হাদিস বর্ণনাকারীদের মধ্যে হযরত আয়েশা (রা.)-এর স্থান ছিলো সবার চেয়ে উঁচুতে। এবং এর গুরুত্বও মুহাদ্দেসদের কাছে স্বীকৃত সত্য ছিলো। হাদিসের সর্বশ্রেষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কিতাব বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফে হযরত আয়শা কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২৬৮টি এবং বাকি আরো এক হাজার ৯২০টি হাদিস অন্যান্য কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে কোরআন শরীফ নাযিল হয়েছিলো। হযরত আয়শা সিদ্দিকা কোরআন-এর বহু অংশ নিজে নিজে মুখস্থ করে রেখেছিলেন।
    কোরআনের একটি কপি বিবি হাফসার কাছে রক্ষিত ছিলো, আয়শা সিদ্দিকা (রা.) সেই কপিটি চেয়ে নিয়ে সেখান থেকে নকল আরো একটি কপি প্রস্তুতি করিয়ে নিয়েছিলেন। নবী-পরবর্তী সময়ে সাহাবাদের আমলে যখন সাহাবাদের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বহু বিষয়ে মিমাংসা করে দিতে হতো, বিবি আয়শা তখন পবিত্র কোরআন শরীফকে সামনে রেখে তার মিমাংসা করতেন। একবার এক লোক তার কাছে নবী করিম (দ.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে, তিনি উত্তর দিয়েছিলেনÑ ‘তুমি কি কোরআন পাঠ করোনি। হযরতের পুরো চরিত্রই কোরআন কর্তৃক নির্দেশিত ছিলো।’ মূলত পবিত্র কোরআন এবং রসুলুল্লাহ (দ.)-এর হাদিস ও কর্মই হচ্ছে ইসলামের মূল ভিত্তি। সাহাবাদের আমলে হাদিস শাস্ত্র সংকলনের কোন মূলনীতি নির্ধারিত হয়নি, কিন্তু হযরত আয়শা (রা.) হাদিসের মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

    তিনি বলেছেন, ‘যে হাদিস পবিত্র কোরআন শরীফের বিরুদ্ধে বলে প্রমাণিত হয়, সে হাদিস ভ্রান্ত।’ তিনি বলতেন, ‘রসুলের জীবন ও তার মুখনিস্তৃত বাণী সবকিছুই কোরআনকে অবলম্বন করেই পরিচালিত হয়েছে।’ কোরআনের মক্কী ও মদনী সুরা সম্পর্কেও তিনি সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখতেন। রসুলের (দ.) ওপর যখন ওহি নাযিল হতো, হযরত তা সাথে সাথে তেলাওয়াত করে সাহাবাদের শোনাতেন। সাহাবারা তাৎক্ষণিকভাবে তা মুখস্থ করে রাখতেন। পরে তা ভিন্ন ভিন্নভাবে লিখে রাখার ব্যবস্থা করা হতো। যেমনÑ চামড়ার ওপর, হাড়ের ওপর। কিন্তু এই চেষ্টাটা ছিলো সাময়িকভাবে, অনেকাংশে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ও ছিলো। কিন্তু নবীর (দ.) আমলেই বিবি আয়শা (রা.) জোকওয়ানি নামক একজন সাহাবার সহযোগিতায় কোরআন লিপিবদ্ধ করার প্রয়াস পান। হযরত আবু বকর (রা.)-এর সময়কালে হিজরি দ্বাদশ সনে ইয়ামামা নামক স্থানে এক যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো। সেই যুদ্ধে অনেক সাহাবা শাহাদৎবরণ করেছিলেন। যাদের মধ্যে অনেক কোরআনে হাফিজ ছিলেন। এই অপূরণীয় ক্ষতিকে সামনে এনে আয়শা সিদ্দিকা হযরত আবুবকর (রা.)-কে কোরআন লিপিবদ্ধ করানোর গুরুত্ব বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া নবী করিম (দ.)-এর সাথে বিবি আয়শার বিয়ের পরে ইসলামের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য যে ঘটনা ঘটেছিলো, তা ছিলো ‘নভোভ্রমণ’ বা মেরাজ শরিফে সশরীরে নবীর গমনের ঘটনা। নবীর (দ.) সফরসঙ্গী না হওয়া সত্ত্বেও এই অলৌকিক ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছিলেন তিনি। বিবি আয়শা (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে কোরআনে অনেকগুলো আয়াতও নাযিল হয়েছে।

    হিজরি পঞ্চম সনে বনি মুসতালিকে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। বনি মুসতালিক গোত্র মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে কোরাইশ সম্প্রদায়ের সাথে হাত মিলিয়েছেÑ এমন খবরের ভিত্তিতে নবী করিম (দ.) তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এই অভিযানের সময় বিবি আয়শা হযরতের সঙ্গী হয়েছিলেন। এমনিতে নবীজি (দ.) যখনই কোন যুদ্ধে অংশ নিতেন, তিনি তাঁর একাধিক স্ত্রীদের মধ্য থেকে কাউকে সঙ্গী করতেন। বিবি আয়শা শুধু বয়সের দিক দিয়েই সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তাই নয়, শারিরীক দিক দিয়েও ক্ষীণাঙ্গী ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আল্লাহর নবী তার মহীয়সী স্ত্রীদের জন্য আলাদা তাঁবুর ব্যবস্থা করতেন। এবং স্বতন্ত্র উটে বস্ত্রাচ্ছাদিত অবস্থায় তারা হযরতের (দ.) সফরসঙ্গীও হতেন। মুসতালিকের অভিযান শেষ করে মদিনায় ফেরৎ আসার সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে পথিমধ্যে রাত্রি যাপনের উদ্দেশ্যে তাঁবু টাঙ্গাতে হলো। ভোররাত্রে কাফেলা তার যাত্রা শুরুর আগ মুহূর্তে বিবি আয়শা (রা.) প্রাকৃতিক কাজ সারার অভিপ্রায়ে একটু দূরে গিয়েছিলেন, ফেরৎ আসার পর দেখলেন তার গলার হার ছড়াটি আর তার গলায় নেই! তিনি কাউকে কিছু না বলে হার ছড়াটি খোঁজার অভিপ্রায়ে একটু দ্রুত পায়ে আগের জায়গায় ছুটে গেলেন। কিন্তু তার উটটি পরিচালনায় যিনি দায়িত্বরত ছিলেন, তিনি বিষয়টি বুঝতে না পেরে উট নিয়ে কাফেলায় শরিক হয়ে গেলেন।

    বিবি আয়শা (রা.) হারটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে যখন নির্ধারিত জায়গায় ফেরৎ এলেন, তখন আর তার জন্য কাউকে অপেক্ষমান দেখতে না পেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন। এসব কাফেলা পথ চলার সময়ে কোথাও কিছু পড়ে থাকলো কিনাÑ তা দেখার জন্য সবসময় একজনকে দায়িত্ব দেয়া হতো। ঐদিন ‘সাকওয়ান’ নামের এক সাহাবির ওপর দায়িত্ব ছিলো ঐসব তদারকীর। তিনি নবী পত্নীকে দেখে চিনতে পেরে তার নিজের উটের ওপর বসিয়ে তাঁকে মদিনার নবীর কাছে পৌঁছে দিলেন। বিষয়টি ইসলামের শত্রুরা লুফে নিলো। তারা বিবি আয়শার সাথে সাকওয়ান নামীয় ঐ সাহাবার অবৈধ সম্পর্কের ধুয়া তুলে মুখরোচক কাহিনী ছড়িয়ে দিলো সর্বত্র। নবীর কানেও গেলো কথাটা।

    তিনি বিবি আয়শাকে (রা.) বিশ্বাস করলেও শেষ পর্যন্ত তার সামনে উপস্থিত হয়ে সবকিছু শুনতে চাইলেন। আয়শা সিদ্দিকা সবিস্তারে বললেন ঘটনা। নবী করিম (দ.) বিশ্বাস করলেন ঠিকই কিন্তু ওহি মারফত বিষয়টার মিমাংসা মহান আল্লাহ কিভাবে করেনÑ সেই অপেক্ষায় কাটিয়ে দিলেন আরো কয়েকটি দিন। কিন্তু ওহি আর নাযিল হয় না। রসুরে পাক (দ.) এক অস্বস্থিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কাফেরদের কথার জবাবে কোন উত্তর দিতে পারছেন না, অন্যদিকে বিবি আয়শার সামনেও যেতে পারছেন না! এই অবস্থায় হযরত আয়শা (রা.) তার পিতা হযরত আবু বকর (রা.)-এর গৃহে চলে এসেছেন। ক্রমশ বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। কাফেরদের ঠাট্টা-মশকরার পরিমাণ বাড়তেই আছে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নবী তার প্রধান সাহাবাদের সামনে বিষয়টা উপস্থাপন করে মিমাংসার উপায় কি জানতে চাইলে সবাই একবাক্যে বিবি আয়শার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ না করার অনুরোধ জানালেও নবীর মনে সন্দেহ ততোদিনে দাঁনা বাঁধতে শুরু করেছে। তার একটাই কারণ, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন ওহি নাযিল না হওয়া। এর আগে জিবরাঈল ফেরেশতা এতো লম্বা সময় ধরে নবীর (দ.) কাছে না আসার কোন নজিরও ছিলো না। তিনি এক পর্যায়ে বিবি আয়শার সামনে উপস্থিত হয়ে অসহিষ্ণু ভাবে বললেন, ‘আয়শা, তোমার সম্পর্কে এ পর্যন্ত যতো কথা উঠেছে, নিশ্চয় সবই তুমি শুনেছো। আমি চাই যদি কোন অন্যায় হয়েই থাকে, তবে তুমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।’ নবীর এই কথার জবাবে বিবি আয়শা (রা.) দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘ক্ষমা চাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমার আল্লাহ জানেন, আমি নির্দোষ এবং আমি সর্বতোভাবে আমার আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম’।

    এ ঘটনার পর প্রায় এক মাস সময় চলে গেলো, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর বাণীবাহক ফেরেশতা আল্লাহ পক্ষ থেকে ওহি নিয়ে উপস্থিত হলেন। বললেন, ‘মহান আল্লাহ আয়শা সিদ্দিকাকে (রা.) নির্দোষ বলে ঘোষণা দিয়েছেন’। বলেছেন, ‘নিশ্চয় যারা বিবি আয়শা সম্পর্কে এই মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছে, তারা তোমারই দলভুক্ত লোক। এই অপবাদ রটনাকারীদের প্রত্যেকে শাস্তি ভোগ করবে’। (২৫:১১)

    এছাড়া ওহির মাধ্যমে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা ঘোষণা দিলেনÑ ‘যারা সম্ভান্ত বংশের ঐ সকল মহিলাদের বিরুদ্ধে এমন কুৎসা রটনা করে থাকেন, তারা যতোক্ষণ পর্যন্ত চাক্ষুষ চারটি প্রমাণ দখিল করতে না পারে, ততোক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টাকে আমলে নেয়ার প্রয়োজন নেই। এবং তাদের স্বাক্ষ্যকে কখনো সত্য বলে মানাও ঠিক নয়। কারণ তারা সীমালঙ্ঘনকারী’। (২৪:৪)
    মহান আল্লাহতায়ালা বিবি আয়শা (রা.)-কে শুধু তাঁর হারানো সম্মানই ফিরিয়ে দিলেন না, একই সাথে অন্যান্য নারীদেরকেও, বিশেষ করে যারা মিথ্যা অপমানের মুখে পড়ে বিব্রত অবস্থায় কাল যাপন করছিলেন, তাদেরকেও তিনি মুক্তির পথ দেখালেন।
    এ ঘটনার তিন মাস পরে আবারো একই ঘটনা ঘটলো। ‘যাতুল জায়েশ’ নামক স্থানে আরো একটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো। সেই যুদ্ধে বিবি আয়শা (রা.) হযরতের সফরসঙ্গী হয়েছেন আগের মতোই। যুদ্ধে জয়লাভ করে নবীর কাফেলা মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে পথ চলা সম্ভব না হওয়ায় যথারীতি তাঁবু টাঙ্গাতে হলো এক জায়গায় এসে। বিবি আয়শা এক সময় খেয়াল করলেন তার গলার হারছড়াটি আগের মতো এবারও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। ভয়ে ভয়ে খবরটা জানালেন হযরতকে আয়শা (রা.)। খোঁজা হলো অনেক, কিন্তু পাওয়া গেলো না। এমন এক জায়গায় তখন তাঁবুর অবস্থান, আশেপাশে পানির কোন সন্ধান মিললো না। তাহাজ্জুদ নামাজের সময় শেষ হয়ে ফজরের ওয়াক্ত চলে এসেছে, সাহাবারা ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন। কাফেলায় উপস্থিত বিবি আয়েশার (রা.) পিতা হযরত আবু বকর (রা.) আয়শার সামনে উপস্থিত হয়ে তাকে তিরস্কার করলেন শিশুসূলভ এই আচরণের জন্য।

    এমন সময়ে ওহি নাযিল হলো। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের কাজকে সহজ করে দিয়ে বললেন, ‘পানির অভাব হলে মাটি বা বালু দ্বারা তাইয়্যুম করে নামাজ আদায় করার জন্য’। হযরত আয়শাকে উপলক্ষ করে এমন এক আয়াত নাযিল হলো যে তাবৎ মুসলিম সম্প্রদায়ের কষ্ট আল্লাহ লাঘব করে দিলেন। আর নামাজ শেষ হওয়া মাত্র সবাই যখন প্রস্তুত হয়েছেন, বিবি আয়শার উটটি উঠে দাঁড়াতেই তার শরীরের নিচ থেকে চাপা পড়ে থাকা হারটি উদ্ধার হলো!

    একইভাবে হজ্জের সময় হাজিদের জন্য সীমানা চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্যে মসজিদ-এ তানঈমকে হারাম এলাকার সীমানা হিসেবে ধরে ঐ মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে এহরাম বাঁধেন হাজিরা। বিদায় হজ্জের সময়কাল দশম হিজরির সময়ে নবী (দ.) তাঁর জীবনের শেষ হজ্জ আদায়ের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। ঐ সময়ে তার সব মহিয়ষী স্ত্রীগণ সঙ্গী হয়েছেন।

    কিন্তু অষ্টাদশী আয়শা (রা.) শারীরিক অসুবিধার কারণে এহরাম বাঁধতে পারছেন না, যদিও কাফেলার সাথে মক্কায় উপস্থিত হয়ছেন তিনিও। এক সময়ে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বিষয়টি জানালেন নবীজি (দ.)-কে। আর নবী করিম (দ.) বিবি আয়শাকে বললেন, তার আপন ভাই আব্দুর রহমান বিন আবু বকরকে নিয়ে গিয়ে ঐ তানঈম মসজিদ থেকে এহরাম বেঁধে আসতে। সেই থেকে ঐ মসজিদের নামকরণ হয়ে গেলো ‘আয়শা মসজিদ’। হাজিদের এহরাম বাঁধার জন্য ঐ এলাকাকে ম্বিকাত হিসেবে স্বীকৃত হয়ে গেলো কেয়ামতের আগ পর্যন্ত।

    ইসলামের ইতিহাসে চরম এক সঙ্কটময় মুহূর্ত ছিলো নবী করিম (দ.) ইন্তেকালের সময়। সেই সময়ে বিবি আয়শা (রা.) যে মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা এক অবিস্মরণীয় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কিছুদিন থেকে আল্লাহর নবী অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন। কঠিন শিরপীড়ায় আক্রান্ত। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) নবীর অনুমতি নিয়ে মদিনার উপকণ্ঠ ‘মুনহ’ নামক স্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে তার স্ত্রী উম্মে রুম্মান অবস্থান করছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো তাকে মদিনায় ফিরিয়ে আনা। নবীজি আমীরুল মোমেনীন ওমর ফারুক (রা.)-কে একটা কাগজ আর কলম আনার নির্দেশ দিলেন। ওমর জবাব দিলেন, ‘হে আল্লাহ্র নবী, আমাদের জন্য আল্লাহর কোরআন, আর আপনার আদর্শই যথেষ্ট। কোন কাগজ-কলমের দরকার নেই।’ ওমর (রা.) তখন উদভ্রান্ত অবস্থায় আছেন। বুঝতে পারছেন হযরতের (দ.) অন্তিমকাল সমাগত। কিন্তু সেটা তার পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন। তিনি দিশেহারার মতো তরবারি নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, যে বলবে নবীর ইন্তেকাল হয়েছে, তিনি তার গর্দান নেবেন! এমনি অবস্থায় সাদ ইবনে ওবাদা বনি সায়েদায়ে আনসারদের নিয়ে নিজে খলিফা হওয়ার ইচ্ছায় জোর পরামর্শ সভা বসিয়েছেন।

    সেই সময় পর্যন্ত আবু বকর (র.) মদিনার বাইরে রয়েছেন। কিন্তু চক্রান্তকারীদের জোর তৎপরতাময় সময়ে শক্ত হাতে হাল ধরলেন আয়শা সিদ্দিকা। তিনি ঘোষণা করলেন, যতোক্ষণ পর্যন্ত খলিফা নির্বাচন সম্পন্ন না হবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত নবীর দাফন সম্পন্ন করতে দেবেন না তিনি।

    কারণ মোহাজিরদের মধ্য থেকে যদি খলিফা নির্বাচন না করা হয়, তাহলে রাসুল্লাহ (দ.)-এর দাফনের সাথে সাথে ইসলামেরও দাফন হয়ে যাবে! এ অবস্থায় চব্বিশ ঘণ্টাও বেশি সময় নবীর (দ.) মরদেহ রেখে দেয়া হলো দাফনের অপেক্ষায়।
    হযরত আবু বকর ফিরে এসেছেন মদিনায়। শেষ পর্যন্ত সর্বসিদ্ধান্ত মতে আবু বকর (রা.)-কে প্রথম খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হলো।

    এছাড়াও নবী (দ.)-এর ইন্তেকালের আগে তিনি যখন চূড়ান্তভাবে অসুস্থ ছিলেন, তখন নিজে থেকেই মসজিদে নামাজে ইমামতি করার জন্য আবু বকর (রা.)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন আল্লাহর নবী (দ.)।

    কথিত আছে, হযরত (দ.) বেঁচে থাকতে আবু বকর (রা.) একাদিক্রমে ১৭ বার নামাজে ইমামতি করেছেন। এবং তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যার পিছনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নবী নামাজ আদায় করেছেন। নবীর ইন্তেকালের পর বিবি আয়শার (রা.) সাথে জীবিতাবস্থায় সে ঘরে বাস করতেন, সেই ঘরেই আল্লাহর নবীর দাফন সম্পন্ন হলো। হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকাল ছিলো মাত্র দুই বছর তিন মাস। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি চারজন ভণ্ড ও প্রতারক নবী দাবিকারীর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছিরেন। এই চারজনের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন মহিলা। এছাড়াও তাৎক্ষণিকভাবে হযরত আলীর পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন আরো এক শ্রেণির সমর্থনকারী। বিবি আয়শা তখন পিতার প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকায়, এক সংকটকাল অতিক্রমের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। একইভাবে পরবর্তী তিন খলিফার সময়েও বিবি আয়শা (রা.)-কে প্রধান উপদেষ্টার পদে সম্মানিত করেছেন একবাক্যে সবাই। কারণ নবী করিম (দ.) একবার বলেছিলেনÑ ‘শরিয়তের সব বিদ্যাই তোমরা বিবি আয়শার কাছ থেকে পাবে’।

    হযরত ওমর (রা.), হযরত ওসমান গণি (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)Ñ ইসলামের এই তিন শ্রেষ্ঠ খলিফা, তিনজই ইসলামের ঘোর শত্রু ও কুচক্রীদের হাতে শাহাদাৎবরণ করেছিরেন। কিন্তু ওসমান (রা.)-এর শাহাদাৎবরণের পর হযরত আলীর খেলাফতের সময়ে বিবি আয়শা এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে বারবার আলী (রা.)-এর উপরে চাপ প্রয়োগ করলেও আলী (রা.) দ্বিধা-বিভক্তির মধ্যে পড়েছিলেন। ঐ কারণকে সামনে রেখে আয়শা সিদ্দিকা হযরত আলীর বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধে নেতৃত্বে দিয়েছিনে, যে যুদ্ধকে বলা হয় ‘জঙ্গে জামাল’ বা ‘উষ্ট্রের যুদ্ধ’।

    নবীর ইন্তেকালের পর আরো বহু বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। তার জীবদ্দশায় পারস্য, মিশর, ইরাক, লিবিয়াসহ বহুদেশ ইসলামের ছায়াতলে এসেছে। ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বিশাল থেকে বিশালতর হয়েছে। কিন্তু বিবি আয়শা তার জীবদ্দশায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে বরাবরই কঠোর অবস্থানে বিরাজমান ছিলেন, শুধু ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণের প্রশ্নে।
    মারা গেলেন ৬৪ বছর বয়সে মদিনায়। সময়টি ছিলো ৫৮ হিজরির ১৭ রমজান। এবং ৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ জুলাই।
    মদিনার জান্নাতুল বাকি গোরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।