উন্মাতাল অক্টোবর উদ্‌ভ্রান্ত ইতিহাস

    শামসুল আরেফিন খান :

    আশা ও হতাশার নাগরদোলায় মানবেতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণের সূচনা ও সংযোজনা ঘটেছিল বিশ শতকের অক্টোবর মাসে। সারা পৃথিবীর গরিব মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন শুক্লপক্ষের জোছনার সাথে তাদের ভগ্নজীর্ণ আবাসনে শতচ্ছিন্ন ছেড়া কাঁথায় আছড়ে পড়ল। আফ্রো-এশিয়া, লাতিন আমেরিকার পরাধীন দেশের মুক্তিকামী মানুষের লড়াই-সংগ্রাম নতুন প্রেরণা পেয়ে উজ্জীবিত হলো।

    রোমানভ রাজপরিবার ছিল রুশ সাম্রাজ্যের শেষ শাসক। ১৬১৩ সালে রোমানভরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। তিন শতকব্যাপী পিটার দ্য গ্রেট, ক্যাথেরি দ্য গ্রেট ও আলেকজান্ডার-১ এবং নিকোলাস-২ সহ ১৮টি রোমানভ রাজবংশ রাশিয়ার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিল।

    জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৪-২৫ অক্টোবর ১৯১৭, ভøাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে আচমকা বলশেভিক বিপ্লবের দমকা হাওয়ায় রাশিয়ার রোমানভ সাম্রাজ্যের শেষ বংশধর জার নিকোলাস-২ এর পতন হলো, যেভাবে ফরাসি বিপ্লবে (৫ মে ১৭৮৯Ñ৭ নভেম্বর ১৭৯৯), গণনির্যাতক সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের বাস্তিল দুর্গ চূর্ণ হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই মহান অক্টোবর বিপ্লবের সূচনায় সেন্ট পিটার্সবার্গের ৩০০ বছরের রুশ রাজপ্রাসাদ উইন্টার প্যালেস গুঁড়িয়ে গেল জাগ্রত জনতার রুদ্ররোষে।
    সমাজবাদের জনক কার্ল মার্কস বলেছিলেন, পৃথিবীর কয়েক শ কোটি মানুষের মধ্যে সংখ্যানুপাতে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। গতর খাটিয়ে শ্রম বেচে রোজ আনা রোজ খাওয়া মেহনতি মানুষের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে তার দুটি বাহু। আর শক্তি হচ্ছে অনতিক্রম্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যেদিন শ্রমজীবী মানুষ নানা কুসংস্কার ও আসমানি ভয়ভীতির মায়াজাল ছিঁড়ে শোষকের তৈরি আতঙ্কের আবরণ ভেঙে জেগে উঠবে এবং সবাই মিলে একসাথে হুঙ্কার ছাড়বে ক্রুদ্ধ সিংহের মতো, সেদিনই ভেঙে পড়বে সংখ্যালঘু শোষকদের সব দুর্গপ্রাচীর। রাশিয়ার শোষিত, নিরন্ন জনগণ ক্ষুধার্ত বাঘের মতো গর্জে উঠেছিল।

    নয়াচীনের বিপ্লব সফল হয়েছিল ১ অক্টোবর ১৯৪৯-এ। এদিন চীন বিপ্লবের রূপকার চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা কমরেড মাও সে তুং, অধুনা মাও জে দঙ, পিকিংয়ের (বেইজিং) তিয়েনমিয়েন স্কয়ারে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে ঘোষণা করেন, ‘চীন আজ নিজের পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।’ চিয়াং কাইশেকের কুমিংটাং বাহিনী সেদিনই রণে ভঙ্গ দেয় এবং পিছু হটে ফরমুজা দ্বীপে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট জাতীয়তাবাদী চীনের পত্তন ঘটায়। নয়াচীন আরও ছয় দিন যোগ করে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী স্বাধীনতা ও দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবী যুদ্ধজয়ের সোনালি উৎসব পালন করে থাকে। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া ও মুক্ত স্বাধীন নয়াচীনের কার্যকর সহযোগিতায় কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস ও কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাফল্য অর্জন করল। এসব দেশ সহস্র বছরের রাজতন্ত্র চূর্ণ করে লোকতন্ত্রে উত্তীর্ণ হলো। রাজা, মহারাজা ও সম্রাটশাসিত রাজ্য বিপ্লবোত্তর প্রজাতন্ত্রে জনগণ-শাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হলো। রাষ্ট্রের মালিক ও সকল ক্ষমতার উৎস যেখানে জনগণ, রাজা বা খলিফা নন।

    অক্টোবর ১৯১৭ সামন্তবাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। রাজন্যবর্গ-শাসিত ব্রিটিশ ইউরোপ এবং পুঁজিবাদ-নিয়ন্ত্রিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখন চলছিল ধনবাদ বিকাশের জন্য অষ্টপ্রহর সাধনা। আধুনিক সভ্যতার আলোবঞ্চিত অভুক্ত, পুষ্টিহীন, ক্ষুধার্ত গ্রামীণ মানুষ উঠে এসেছিল শহরে। জারের কাছে অন্ন চেয়ে প্রাসাদরক্ষীদের গুলি খেয়ে লোকান্তরিত হয়েছিল হাজার হাজার রুশ শ্রমিক। চমকে উঠেছিল উদীয়মান পুঁজিবাদ। থমকে গিয়েছিল বলবান উপনিবেশবাদ। কেঁপে উঠেছিল ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদ। সারা পৃথিবীর রিক্ত, নিঃস্ব মানুষ একইভাবে সামন্তবাদী শোষণের তপ্ত কড়াই থেকে পুঁজিবাদী শোষণের গনগনে চুলায় লাফিয়ে পড়ে তখন কানকো কাটা ‘বাঙালি কই মাছের’ মতো করুণ দশায় ছটফট করছিল। শিল্পবিপ্লব বাস্তবায়নে ব্যস্ত পুঁজিবাদ বিশ্বময় তোলপাড় করছিল তখন বাজার সন্ধানে। পাশাপশি ছিল কাঁচামাল জোগানো উপনিবেশগুলো আগলে রাখার বলবান প্রয়াস। তৎকালীন বিশ্বমোড়ল ব্রিটিশ ভারতবর্ষে তার উপনিবেশবাদী স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে গণজাগরণ ও বিপ্লবের সমস্ত স্ফুলিঙ্গ অবদমনের মানসে পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর দমন আইন ‘রাওলাট অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করল। ‘কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে বাঁশি সংগীতহারা অমাবস্যার কারালুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপ্নের তলে।’

    কবিগুরু হুতাশনে ডুকরে উঠলেন, ‘ওরে তুই উঠ আজি আগুন লেগেছে কোথা? কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি জাগাতে জগৎ-জনে? কোথা হতে ধ্বনিছে ক্রন্দনে শূন্যতল?’ ক্ষোভে গর্জে উঠলেন কাজী নজরুল, ‘মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হ’ব শান্ত। যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্্গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে নাÑ।’ বাংলা মায়ের ১৮ বছরের টগবগে দামাল ছেলে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে গাইল জীবনের জয়গান, ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি// একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি,// হাসি হাসি পরব ফাঁসি, দেখবে ভারতবাসী// আমি হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।’ ক্ষুদিরামের ফাঁসি ঠেকানোর জন্য ভারতবর্ষের সব দরদি মানুষ করজোড়ে অনুনয় করল ব্রিটিশ বড়লাটের কাছে। ‘দয়া করো, প্রাণে মেরো না ভারতমাতার প্রিয় সন্তানকে।’ সবাই তাকিয়ে ছিল মহাত্মা গান্ধীর দিকে। তিনি চেষ্টা করলে হয়তো প্রাণে বাঁচবে বাংলার বীর সন্তান। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সেই দরখাস্তে সই করলেন না। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, গুলি করে বোমা মেরে ভারত স্বাধীন করা যাবে না। ‘ওম শান্তি’। ১১ আগস্ট ১৯০৮, ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর হলো। ভারতবর্ষ চোখ মুছে ঘুরে দাঁড়াল। অশ্রুর বদলে নিরন্তর আগুন ঝরে পড়ল। তিল তিল করে বিপ্লব দানা বাঁধতে লাগল আসমুদ্রহিমাচল ভারতভুবনে।

    ব্রিটিশ পরিকল্পনায় ভারতের কংগ্রেস

    উপনিবেশবাদী শোষক ব্রিটিশরাজ আগেই বুঝতে পেরেছিল, ভারতবর্ষে তাদের শোষণলীলা বিপ্লবী আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। তাই তারা একটি অনুগত মধ্যবিত্ত ধনিক শ্রেণি, তাঁবেদার ভদ্রসমাজ ও অভিজাত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিল। সেই পরিকল্পনায় ২৮ ডিসেম্বর ১৮৮৫ রাজকীয় সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রযত্নে সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস জন্ম নিল। বম্বে নগরীর তেজপাই সংস্কৃত কলেজে ৭২ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে গঠিত কংগ্রেসের সভাপতি হলেন কলকাতার উমেষ চন্দ্র ব্যানার্জী। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেলেন সাবেক স্কটিশ সিভিল সার্ভিস অফিসার অ্যালান অক্টিভিয়ান হিউম। একই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিলেন আরও দুজন স্কটিশ আমলাÑউইলিয়াম উইডিয়ার বার্ন এবং বিচারপতি স্যার জন জারডিন। মাদ্রাজ ও বম্বের বিত্তবান হিন্দু সম্প্রদায় থেকে বাছা বাছা অভিজাত, যেমন দাদাভাই নওরোজ, বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল, লালা লাজপথ রায়, অরবিন্দ ঘোষ, ভি-ও ছিদাম্বারাম পিল্লাই প্রমুখ যুক্ত হলেন নবগঠিত রাজনৈতিক দলে। মুম্বাইয়ের মহাজন সভার বিশিষ্ট অভিজাত দিকপাল গোপাল গনেশ আগরকার, বিচারপতি কে টি টেলাং প্রমুখ সম্ভ্রান্ত ভদ্রজনেরাও সওয়ার হলেন সেই রাজকীয় রথে। গরিবের রক্ত চুষে হৃষ্টপুষ্ট কেতাদুরস্ত মানুষগুলো দরিদ্র সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কথা ভাবলেন না। তাদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের কথা ভাবলেন না। নানা পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে, গণস্বার্থের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশরাজের পায়ে নিজেদের সমর্পণ করলেন। তাতে ব্রিটিশের উদ্দেশ্য সফল হলো না। তত দিনে ভারতবর্ষে সমাজবাদের দমকা হওয়া বইতে শুরু করেছে। সেই সময় গুজরাটের তুখোড় ব্যারিস্টার মোহনলাল করমচাঁদ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের পক্ষে বর্ণবাদবিরোধী লড়াইতে সুনাম কামিয়েছিলেন।

    ১৯১৫ সালে তিনি স্যুট-প্যান্ট-টাই ফেলে দিয়ে একবস্ত্রে শান্তি মিশনে নামলেন ভারতের বিপ্লবীদের বুলেট-বোমার দামাল কাণ্ডের বিরুদ্ধে অসহযোগ মন্ত্রের কমুন্ডুল হাতে নিয়ে। উঠতি মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান অভিজাত শ্রেণি তার পাশে এসে দাঁড়াল। তার নেতৃত্বে কংগ্রেসের পালে বাতাস লাগল। অন্যদিকে ব্রিটিশরাজ দমন-পীড়নের নানা পন্থা ও হাতিয়ার নিয়ে ভারতের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার টুঁটি চেপে ধরল। বিপ্লবী চেতনা ও বাসনা দমনের প্রয়াস পেল। কিন্তু বিপ্লবী উত্থান অবদমিত হলো না। বিপ্লব জারি রইল।

    ব্রিটিশরাজ বুঝতে পারল উপমহাদেশে তাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু ভারতবর্ষ যাতে বিপ্লবের চারণভূমিতে পরিণত না হয়, রুশ বিপ্লবের বাতাস লেগে ভারতবর্ষে না অনলধারা বয়ে যায়, তার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করল। ব্রিটিশ মনস্থির করল, ভারত ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু তার পরও যাতে কাঁচামালের সরবরাহ অব্যাহত থাকে, সামরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে, তার ব্যবস্থা নিতে শুরু করল।

    প্রথম স্বাধীন ভারত সরকার

    সেই ১৯১৫ সালেই কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা পাঞ্জাবের স্বাধীনতাকামী বীর সন্তানদের বিপ্লবী সংগঠন গাদার (স্বাধীনতা) পার্টি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ঘোষণা করে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো শহরে অস্থায়ী ভারত সরকারের সদর দফতর স্থাপন করল। তারা একটি পতাকা উদ্ভাবন করেছিল এবং গাদার নামেই একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিল। সেই প্রবাসী সরকারের প্রেসিডেন্ট রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ সিং, প্রধানমন্ত্রী বরকতুল্লাহ ভুপালি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উবায়দুল্লাহ সিন্ধি এবং মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা কিছুদিন পর গোপনে দেশে ফিরে গেলেন। শুরু করলেন প্রবাসে ঘোষিত স্বাধীনতা কার্যকর করার বিপ্লবী প্রয়াস। কিন্তু তাদের সুসংগঠিত কোনো বিপ্লবী বাহিনী না থাকায় এবং বহির্বিশ্বে কোনো মিত্র রাষ্ট্র না থাকায় ব্রিটিশ সরকার খুব সহজেই তাঁবেদার গোষ্ঠীর সহযোগিতা নিয়ে উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা বিপ্লব পদদলিত করতে সক্ষম হলো। মার্ক্সবাদী বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের পিতাসহ সহস্রাধিক স্বাধীনতাসংগ্রামীর ফাঁসি হলো কেন্দ্রীয় কারাগার দিল্লির লাল কেল্লায়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের স্থাপিত স্বাধীন ভারত প্রবাসী সরকারের পরিত্যক্ত স্থাপনা ও স্মৃতিসমূহ আজও সংরক্ষিত রয়েছে এবং তা নিয়মিত পর্যটক আকর্ষণ করছে।

    উদ্গত সমাজবাদকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা না গেলে পুঁজিবাদী শিল্পবিপ্লব এগোনোর পথ খুঁজে পাবে নাÑএ কথা বুঝতে পেরে পুঁজিবাদ নেমে পড়ল সর্বনাশা যুদ্ধে। তারই পরিণাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯১৪Ñ১১ নভেম্বর ১৯১৮)।
    তুরস্কের খেলাফতের পতন ঘটল সেই দাবানলে। গোঁড়া মুসলমানদের ধারণায় তুরস্কের খেলাফত চলে মহানবীর নির্দেশিত পথে। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় খলিফা নিযুক্ত হন সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায়। তারা রাজ্য শাসন করেন আল্লাহর নির্দেশে। খেলাফতের এই ধারণা লোকতন্ত্রের ধারণার পরিপন্থী। পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সাথেও সেটা সংগতিপূর্ণ নয়। ব্রিটিশ ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে অটোমান সাম্রাজ্যের খলিফা হেরে গেলেন। ভারতবর্ষের গোঁড়া মুসলমানরা খেপল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে।

    ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বোমা, গুলি প্রাধান্য পেয়েছে উত্তাল গণসংগ্রামে। নেতাজি চাচ্ছেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই। উত্তর আমেরিকা যেভাবে লড়েছিল দখলদার ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, সে রকম লড়াই। ব্রিটিশ ফরাসিকে মিত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিল। নেতাজি জার্মানি ও জাপানের সহায়তা পেতে তৎপর হলেন। গান্ধীজি শান্তিপূর্ণ অসহযোগের পথে পদযাত্রা অব্যাহত রাখলেন নির্বিকারভাবে। এ পর্যায়ে খেলাফত আন্দোলনকে তার সঙ্গী করে গান্ধী নিশ্চিত হলেন যে ক্রুদ্ধ ভারতীয় মুসলমানরা ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ধারাকে মদদ জোগাবে না। জিন্নাহ সাহেব ক্ষুণ্ন হলেন। তিনি বললেন, গান্ধীজি রাজনীতিতে ধর্মকে জড়িয়ে নিজের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বিসর্জন দিয়েছেন। জিন্নাহ সাহেব গোস্যা করে কংগ্রেস ছাড়লেন।

    মুসলিম লীগ জন্ম নিল

    ব্রিটিশ আবার গান্ধীজির মুসলিম প্রেমের মধ্যে অন্য রকম বিপদ দেখতে পেল। হিন্দু-মুসলমান একসাথে গঙ্গাস্নান করলে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে ভেবে চতুর ব্রিটিশ তড়িঘড়ি পৃথক নির্বাচনপদ্ধতি প্রবর্তন করল। সীমিত আকারে সাংবিধানিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করল এবং উভয় সম্প্রদায়ের হোমরাচোমরাদের নামকাওয়াস্তে শাসনব্যবস্থার অংশীদার করে নিল। সেই কপট প্রক্রিয়ার আড়ালে ব্রিটিশ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ক্রূর পরিকল্পনা কার্যকর করল, যেটা তারা ১৮৫৭ সালে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে গড়া সিপাহি বিপ্লবের সময় থেকে মগজের ভেতর চেপে রেখেছিল। সুকৌশলে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিসম্বাদের জন্ম দিল। সেই লক্ষ্যে ১৯০৬ সালে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে অভিজাত ধনিক শ্রেণি, বিত্তবান ভূস্বামী ও উদীয়মান মধ্যবিত্তকে নিয়ে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠিত হলো।

    রাওলাট অ্যাক্ট ও চাউরি চাউরার গণবিস্ফোরণ

    ১৯১৮ সালে বিচারপতি এসএটি রাওলাটের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করে ভারতবর্ষের গণমানুষের আন্দোলন-সংগ্রাম দমনের জন্য ব্রিটিশ যে জঘন্য বর্বর কালাকানুন প্রণয়ন করল, তারই নাম রাওলাট অ্যাক্ট। সেই আইন ভারতবাসীর সমস্ত অধিকার কেড়ে নিল। কথা বলার অধিকার থাকল না। মতপ্রকাশের অধিকার থাকল না। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হলো। ভারতবাসীকে ক্রীতদাসের স্তরে নামিয়ে দিল। প্রতিবাদে উত্তাল হলো সারা ভারতবর্ষ। সেই আইন প্রয়োগেই ১৯১৯ সালে ঘটল জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম গণহত্যা। প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ শুরু, যা ভণ্ডুল হলো ১৯২২ সালে উত্তর প্রদেশের গোরাকপুর জেলার থানা চাউরি চাউরার রক্তাক্ত ঘটনায়।

    পুলিশ জুলুমের ভিন্ন একটি ঘটনায় ক্ষুব্ধ দুই সহস্রাধিক মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে বিক্ষুব্ধ জনতা থানা আক্রমণ করে অগ্নিসংযোগ করে। ২২ পুলিশ সদস্য ও ৩ জন সিভিলিয়ান নিহত হয়। পুলিশ বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রেফতার করে। আটক হওয়া ১৯ জনের ফাঁসি হয়। ১৪ জনের যাবজ্জীবন। মহাত্মা গান্ধীর ছয় বছর জেল হলো। জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার ধারাবাহিকতায় চাউরি চাউরার রক্তাক্ত বিদ্রোহ মহাত্মা গান্ধীর শান্তির ললিত বাণীকে প্রহসনে পর্যবসিত করে এবং সত্যাগ্রহ বুমেরাং হয়ে যায়। গান্ধীজিকে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ থাকতে হয়। অহিংসা মন্ত্রের ঋষি মহাত্মা গান্ধী অবশেষে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হলেন যে ক্ষুদিরামের বিদ্রোহী ভারত মাথা নত করতে জানে না। আপস করতে জানে না।

    জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা

    ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ পাঞ্জাবের অন্তর্গত অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে বৈশাখী মেলার আবরণে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আর-ই- এইচ ডায়ারের হুকুমে সেনাবাহিনী অতর্কিতে হামলা চালিয়ে (সরকারি হিসাবে) ৩৭৯-১০০০ মানুষকে হত্যা করল। নির্বিচার গুলিবর্ষণে আহত হলো আরও সহস্রাধিক নিরীহ নর-নারী ও শিশু। সাংসদ ড. সাইফুদ্দিন কিচলু ও সত্য পাল গণহত্যার প্রতিবাদে গর্জে উঠলেন। তাদের গ্রেফতার করা হলো। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জালিনওয়ালাবাগের নরহত্যার প্রতিবাদে ব্রিটিশের দেওয়া নাইট উপাধি বিসর্জন দিলেন। ব্রিটিশের সেই চণ্ডাল নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তিনি গান্ধীজিকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু গান্ধী তখনো শান্তির মন্ত্র পাঠ করে চলেছেন। নেতাজিকেও পাত্তা দিচ্ছেন না। অগত্যা তিনি অহিংস অসহযোগ বা সত্যাগ্রহের ডাক দিলেন। স্বরাজের আওয়াজ তুললেন। কিন্তু তাতেও উত্তাল ভারত শান্ত হলো না।

    ভগৎ সিং সুকদেব রাজগুরুর ফাঁসি

    রাওলাট আইন প্রথমে পাস হয়েছিল রাজকীয় বিধান সভায়। তাতে বিনা বিচারে আটক রাখা ও জুরি ব্যতিরেকে বিচারের নামে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের বিধান ছিল। ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভায় সেই আইনের কিছু বিধান পাস করার জন্য বিল উত্থাপন করা হলো। আইন পরিষদের অধিবেশন চলাকালে প্রতিবাদী বোমা ফাটিয়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী ভগৎ সিং, সুকদেব ও রাজগুরু গ্রেফতার হন। ভিন্ন একটি পুলিশ হত্যা মামলায় তাদের ফাঁসির রায় হলে সারা ভারত বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিপ্লবীদের প্রাণভিক্ষা চেয়ে হাজার হাজার ভারতবাসী আবেদন করল বড়লাটের কাছে। শত অনুরোধ সত্ত্বেও মহাত্মা গান্ধী সহিংসতার বিরোধিতা করে বিপ্লবীদের প্রাণরক্ষার দরখাস্তে স্বাক্ষর করলেন না। ভগৎ সিং, সুকদেব, রাজগুরুর ফাঁসি হওয়ায় সারা ভারত বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। গান্ধীজি তোপের মুখে পড়লেন।

    চাউরি চাউরার বিস্ফোরণ

    তারই পরিপ্রেক্ষিতে গণচাপে গান্ধীজি অহিংস অসহযোগ তথা সত্যাগ্রহ শুরু করেন, যার পরিসমাপ্তি ঘটে চাউরি চাউরার সহিংস বিস্ফোরণে। একপর্যায়ে অহিংস অসহযোগে অংশ নেওয়া পদযাত্রীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে বহু শান্তিবাদী সত্যাগ্রহী হতাহত হয়। দুই সহস্রাধিক ক্রুদ্ধ জনতা ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২, উত্তর প্রদেশের গোরাকপুরে চাউরি চাউরা থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। থানার সব মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ২২ পুলিশ সদস্য ও ৩ সিভিলিয়ান নিহত হয়। ব্রিটিশ সরকার উপদ্রুত এলাকায় সামরিক আইন বলবৎ করে। অগণিত মানুষকে বন্দী করা হয়। তাদের মধ্যে ১৯ জনের ফাঁসি। ১৪ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯২২, কংগ্রেস কেন্দ্রীয় কমিটি সত্যাগ্রহ কর্মসূচি প্রত্যাহার। গান্ধীজি আবারও কারারুদ্ধ হন। অহিংস মন্ত্রের ঋষি মহাত্মা গান্ধী এদিনে বুঝি হদয়ঙ্গম করলেন, ভারতবাসী মাথা নত করতে জানে না। আপস করতে জানে না। ‘বল বীরÑবল উন্নত মম শির। শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির…’ এত দিনে গান্ধীজি বুঝলেন, ভারতবাসী জীবন দিয়ে স্বাধীনতা আনতে চায়। ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়।’

    বাঘা যতীন, সূর্যসেন ও প্রীতিলতা বিপ্লবী পূর্বসূরিদের পথ মাড়িয়ে জীবন উৎসর্গ করে ভারতমননের নির্ঝর প্রকাশ ঘটালেন।
    প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হলে ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট বলবৎ করে ভারতের বিপ্লবী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। কিন্তু বিপ্লবকে হত্যা করা গেল না।
    সাংবিধানিক প্রক্রিয়া

    ১৯১৯-২৪ সালের টালমাটাল পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ প্রভু নতুন একটি ‘ভারত শাসন আইন-১৯১৯’ জারি করে হালকা-পাতলা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া চালু করল। সীমিত ভোটাধিকারে নির্বাচন হলো। দুই সম্প্রদায়ের অনুগত ধনিক শ্রেণি সেই প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে রায় বাহাদুর, খান বাহাদুর, রায় সাহেব, খান সাহেব প্রভৃতি দালালি তকমা নিয়ে সমাজের কেউকেটা সেজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অনুঘটক হয়ে বসল।

    প্রথম মহাযুদ্ধের দাবানলে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল। পাঁচ কোটি মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতে প্রাণ হারাল। ১৯৩৫ সালে আরও খানিকটা উদার ভারত শাসন আইন জারি হলো। তার ভিত্তিতে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে হিন্দু-‍মুসলমান পৃথক ভোটে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করল। সাতটি রাজ্যে কংগ্রেস সরকার গঠন করল। পাঞ্জাবে ইউনিয়ন পার্টির নেতা সেকেন্দার হায়াত খান প্রধানমন্ত্রী হলেন। মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলো।

    জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব

    ১৯৩৯ সালে বড়লাট স্যার লিনলিথগাও কারও মতামত না নিয়ে ভারতবর্ষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে যুক্ত করলেন। লাখ লাখ ভারতবাসী নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে পল্টনে যোগ দিল। ২৫ লাখ মানুষ স্বেচ্ছাসেবক হলো। স্বাধীনতা না পেলে ভারতবাসী যুদ্ধে যাবে না, এই দৃঢ়পণ নিয়ে কংগ্রেস সব সাংসদকে পদত্যাগ করাল। মুসলিম লীগ এই সুযোগে কলঙ্কিত দ্বিজাতিতত্ত্ব হাজির করল। জিন্নাহ সাহেব ঘোষণা করলেন, ‘মুসলমানরা একটা স্বতন্ত্র জাতি। আমাদের কথা আমরা বলব। অন্য কারও অধিকার নেই মুসলমানের পক্ষে রায় দেওয়ার। আমরা যুদ্ধ করবÑএটাই আমাদের কথা।’ আর কংগ্রেসের পদত্যাগের ফলে সৃষ্ট সাংসদীয় নেতৃত্বের শূন্যতায় ১৯৩৯-৪৬ সালে তিন পর্বে একে ফজলুল হক, স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেন। প্রথম পর্বে হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন ফজলুল হকের কোয়ালিশন পার্টনার। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সান্নিধ্যে থেকে শেখ মুজিবুর রহমান সবল পদক্ষেপে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব কংগ্রেসের কিরণ শঙ্কর রায় ও নেতাজির সহোদর স্বদেশ বোসকে সাথে নিয়ে অখণ্ড বাংলার স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু করলেন। কিন্তু জিন্নাহ নাজিমুদ্দিনের ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে গেলেন। নাজিমুদ্দিনের ষড়যন্ত্রে ডাইরেক্ট অ্যাকশনের নামে ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ মর্মন্তুদ গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং সংঘটিত হলো। হাজার হাজার মানুষের রক্তে ভেসে গেল বাংলা বিহার উড়িষ্যা। মহাত্মা গান্ধীকে সাথে নিয়ে শত চেষ্টা করেও প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী দাঙ্গা থামাতে পারলেন না। সব দায় চেপে গেল তার ঘাড়ে। সোহরাওয়ার্দী নির্বাসিত হলেন। পূর্ব বাংলায় প্রবেশাধিকার পেলেন না।

    কিন্তু তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাংসদ বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক মার্কসবাদী চিন্তক আবুল হাশেম (বদরুদ্দিন ওমরের পিতা) পূর্ব বাংলা বিধান সভায় মুসলিম লীগের জমিদারবান্ধব ভূমি সংস্কার নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সক্রিয় বিরোধী দলের জন্ম দিলেন। তার নেতৃত্বে মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দীপন্থী সংসদীয় উপদল ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখল। সোহরাওয়ার্দীপন্থী আবুল হাশেম মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী মুসলিম লীগের ব্যানারে শক্তিশালী প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির উন্মেষ ঘটালেন। মওলানা ভাসানীর স্নেহ ও প্রযত্নে সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক শিষ্য শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের গতিধারায় বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির জনক হলেন। বিদ্রোহী বাঙালি ক্ষুদিরাম বসু, মাস্টারদা সূর্যসেন, বাঘা যতীন ও নেতাজির ঐতিহ্য ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম সফল হলো ৩০ লাখ প্রাণের পুষ্পাঞ্জলিতে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমাজবদলের অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ৬০ বছর ধরে গণমানসে লালিত বিপ্লবী চেতনা বাস্তবে মূর্ত হলো ভারতবর্ষের সবচেয়ে দূরদর্শী, প্রাজ্ঞ ও সফল বিপ্লবী জননায়ক শেখ মুজিবের সম্মোহনী নেতৃত্বে।

    জনগণের ঐকমত্য না থাকলে এবং বিপ্লবী পরিস্থিতি নিরঙ্কুশ না হলে বিপ্লব সফল হতে পারে না। কিন্তু বিপ্লব কখনো মরে না। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে তার নিরন্তর প্রয়াস ও অনন্তযাত্রা চলমান থাকে অদৃশ্য ধারায়। অবিশ্রান্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা, শত প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তির মাঝে রূপান্তরিত হয়ে বেঁচে থাকে। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু গণবিপ্লবের সেই অনাদি অনন্ত ধারার রণধ্বনি, রণভেরী ও রণহুংকার। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। ইনক্লাব জিন্দাবাদ।