এভরি লাইফ ম্যাটার আন্দোলন সময়ের দাবি

    মুহম্মদ শামসুল হক :

    ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে আমেরিকার দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনগণকে অকারণে ২৮০ বিলিয়ন ডলারের দায়ভার বহন করতে হয়েছে। মোটা অঙ্কের এই আর্থিক খেসারতি ছাড়াও উপরিউক্ত সময়ে প্রতিবছর গড়ে ৩৯ হাজার হারে সর্বমোট ১ লাখ ৯৪ হাজার তরতাজা প্রাণ গান ভায়োলেন্সের মরণছোবলে ঝরে গেছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-পেশা নির্বিশেষে এই অনভিপ্রেত মৃত্যুতে স্বজনদের দুঃখ-দুর্দশা-অসহায়ত্বের বিশদ বিবরণের ওপর আলোকপাত না করেই রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং প্রাণহানির এ রোমহর্ষক ভাষাচিত্র সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, গান ভায়োলেন্সের ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অহেতুক ব্যয় ছাড়াও আনুষঙ্গিক নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সরকার ও দেশবাসীকে।
    বৈশ্বিক মহামারি করোনা ও টর্নেডো, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পেছনে রাশি রাশি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি গান ভায়োলেন্সের পেছনে অকারণে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় আইনপ্রণেতাদের পরিচ্ছন্ন চিন্তা-চেতনার অভাবে কিংবা কোনো অদৃশ্য শক্তির হস্তক্ষেপে গান ভায়োলেন্সে (ছোট-বড় যেকোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার) এ ধরনের প্রাণহানি এবং সহায়-সম্পদের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতি কোনোক্রমেই মেনে নেওয়া যায় না। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমেরিকার সিংহভাগ জনগণ শান্তিপ্রিয়, কঠোর পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল এবং দেশের প্রচলিত আইন-কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা শান্তিতে বসবাস করতে এবং অন্যদের শান্তিপূর্ণ বসবাসে সাহায্য করতে সর্বদা উদগ্রীব। অথচ আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং স্বল্পসংখ্যক বখাটে আমেরিকানের কারণে গোটা দেশ ও জাতিকে গান ভায়োলেন্সের কলঙ্ক এবং মোটা অঙ্কের ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে সেই মান্ধাতার আমল থেকে।
    সিডিসি সামগ্রিক পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণপূর্বক উল্লেখ করেছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ১ লাখ ৯৪ হাজার তরতাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ায় প্রকৃত প্রস্তাবে ৪৫ লাখ বছরের প্রত্যাশিত আয়ু আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। গান ভায়োলেন্স অর্গানাইজেশন নামক গান ভায়োলেন্স সংশ্লিষ্ট ফেডারেল এজেন্সি জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, গড়ে প্রত্যেক নিহত ব্যক্তি আরও ২০ বছর হারে বেঁচে থাকলে জাতীয় জীবন থেকে ৪৫ লাখেরও বেশি বছর হারিয়ে গেছে। ইউএস গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস হেলথ কেয়ার টিমের পরিচালক কেরিলিন এল ইয়োকম এবিসি নিউজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে গান ভায়োলেন্স ব্যয়ের অদ্যাবধি কোনো চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়নি। তিনি বলেন, গান ভায়োলেন্স সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে গঠিত নীতিনির্ধারকেরা বস্তুত অদ্যাবধি গান ভায়োলেন্স ব্যয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণের ওপর অগ্রাধিকার প্রদান করেননি। ইয়োকম আরও বলেন, গান ভায়োলেন্সের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্য অতীতে কোনো পাবলিক কিংবা প্রাইভেট সেক্টর বার্ষিক ব্যয় বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তাও অনুধাবন করেনি।
    ইয়োকম বলেন, ২০২০ সালে গান ভায়োলেন্স ২০ হাজার ৭৫৯টি তরতাজা প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে এবং ৪০ হাজার ৮৯২ জন গুরুতর আহত হয়েছে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পুরো আমেরিকায় গান ভায়োলেন্স ৯৭ হাজার ৮৬০টি প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে এবং ৭০ হাজার ৯৭৩ জন চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এমনতর ভয়াবহ পরিস্থিতি সত্ত্বেও নীতিমালা প্রণয়নকারী, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশেষজ্ঞরা গান ভায়োলেন্সের ধ্বংসযজ্ঞের গুরুত্ব প্রকৃত প্রস্তাবে হৃদয়ঙ্গমে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল শান্তিপ্রিয় আমেরিকানদের জীবনে গান ভায়োলেন্স কতটুকু ধ্বংসাত্মক, তা ভাবতে গেলে গা শিউরে ওঠার কথা। অথচ বছরের পর বছর ধরে নিরীহ আমেরিকানরা গান ভায়োলেন্সের অপব্যবহার করছে। ইয়োকম বলেন, এই সমস্যার সমাধানে সর্বাগ্রে প্রয়োজন গান ভায়োলেন্সে প্রাণহানির পাশাপাশি সকল ধরনের ব্যয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সার্বিক মূল্যায়ন।
    গান ভায়োলেন্স অফিসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, গান ভায়োলেন্সের দরুন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় হয় ইমার্জেন্সি রুম ভিজিট, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং হাসপাতালের অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ। যুক্তরাষ্ট্রের সকল হাসপাতাল থেকে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। গান ভায়োলেন্স অফিসের ধারণা অনুযায়ী ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মেডিকেল বা অন্যান্য পাবলিক হেলথ কভারেজ রোগীদের জন্য বছরে ব্যয় হয়েছে মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশেরও বেশি। মোদ্দাকথা, নুন আনতে পান্তা ফুরোয় শ্রেণির আমেরিকানরাই বছরের পর বছর গান ভায়োলেন্সের এই বোঝা ট্যাক্স হিসেবে পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ইয়োকম বলেন, দশকের পর দশক ধরে এই অনাকাক্সিক্ষত ব্যয় কী পরিমাণ বেড়েছে, তা সঠিকভাবে নির্ধারণে আরও অনেক সময় লাগবে। আর নিকট ভবিষ্যতে গান ভায়োলেন্স ব্যয় কোথায় গিয়ে ঠেকবে, এ মুহূর্তে তাও বলা মুশকিল। অথচ প্রাথমিক মেডিকেল বিল এখনো সামগ্রিক ব্যয়ের নেহাত ক্ষুদ্রতর অংশই বলা চলে।
    ইয়োকম আরো বলেন, গান ভায়োলেন্সে বেঁচে যাওয়া এবং চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণকারীদের সারা জীবন পরাশ্রয়ী এবং অন্যদের অনুকম্পানির্ভর জীবনযাপন করতে হয়। অথচ প্রাইভেট বা পাবলিক ইন্স্যুরেন্স কভারেন্স পঙ্গুত্ববরণকারীদের পুনর্বাসন, মেডিকেশন এবং আনুষঙ্গিক মেডিকেল পরীক্ষার মতো পরিষেবা-ব্যয় বহন করে না। প্রয়োজনীয় পরিষেবা পাওয়া গেলে প্রাথমিক ব্যয় কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উপসংহারে ইয়োকম বলেন, নিতান্ত মানবিক কারণে কিংবা সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাহেতু রাষ্ট্র এবং দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণকে আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতে পঙ্গুত্ব বরণকারীদের পেছনে মোটা অঙ্কের অনাকাক্সিক্ষত ব্যয়ের বোঝা শিরোধার্য করে নিতে হচ্ছে।
    ‘এভরিটাউন ফর গান সেফটি’ শীর্ষক নন-প্রফিট গ্রুপ হেলথ কেয়ার কস্ট অ্যান্ড ইউটিলাইজেশন প্রজেক্ট, সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়েছে যে গান ভায়োলেন্সের পেছনে আমেরিকাকে প্রতিবছর ২৮০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়। তাদের বর্ণনা অনুসারে পুনর্বাসন, ফলোআপ অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাসহ স্বল্পকালীন-মধ্যম মেয়াদি মেডিকেল ব্যয় বছরে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। কোয়ালিটি অব লাইফ কস্ট (জীবনমান ব্যয়)Ñজুরির পেছনে ব্যয় এবং ভিকটিমদের সাথে আপসরফা ইত্যাদি বাবদ বছরে ব্যয় হয় ২১৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত আয় বাবদ খোয়া যায় বছরে কমপক্ষে প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলার।
    উল্লেখ্য, কোনো প্রতিষ্ঠানের দক্ষ-অদক্ষ কর্মচারী গান ভায়োলেন্সে প্রাণ হারালে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। নিহতদের শূন্যস্থান পূরণের জন্য নতুন ও শিক্ষানবিশ কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। আর নতুন কর্মচারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন, কর্মচারী বাছাই ও নিয়োগ এবং নতুনদের প্রশিক্ষণ বাবদ নিয়োগকর্তাদের বছরে ১৪ লক্ষাধিক ডলার ব্যয় করতে হয় বলে জরিপে প্রমাণিত হয়েছে।
    বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী-সম্প্রদায়-ধর্মাবলম্বী-পেশাজীবী-অপেশাজীবী গান ভায়োলেন্সের টার্গেটেড ভিকটিম নন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-পেশা নির্বিশেষে সকল আমেরিকানই এই ভয়ানক মরণ খেলার শিকার হয়ে থাকেন। আবার পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি গান ভায়োলেন্সে প্রাণ হারালে কিংবা পঙ্গু হয়ে পড়লে তার ওপর নির্ভরশীলরা দারিদ্র্যক্লিষ্ট এবং নিয়তিলাঞ্ছিত জীবনযাপনে বাধ্য হন। আর এসব পরিবারের অনাদরপুষ্ট ও দৈন্যক্লিষ্ট সদস্যরা পরবর্তী সময়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং নিজেরা গান ভায়োলেন্সে জড়িয়ে পড়ে কিংবা অনাসৃষ্টির হোতাদের ভাড়াটে এজেন্টে পরিণত হয়। স্মর্তব্য, অর্থ দিয়ে জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। তাই ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যে ১ লাখ ৯৪ হাজার আমেরিকান গান ভায়োলেন্সের কবলে পড়ে অকালে ঝরে গেছেন, তাদের হারানো জীবনের মূল্য অর্থের মানদণ্ডে নিরূপণের ধৃষ্টতা আমাদের নেই। তা সত্ত্বেও নিঃশঙ্কচিত্তে বলতে হচ্ছে গান ভায়োলেন্সে প্রাণহানি যেন আমেরিকার সমাজ ও সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং দুরদৃষ্টের লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিক বিশ্লেষণের অভাবে প্রাণহানি ছাড়াও গান ভায়োলেন্সের সঠিক ক্ষয়ক্ষতি অদ্যাবধি নিরূপিত হচ্ছে না এবং এর সমূল উৎপাটনের নিমিত্তে বাস্তবসম্মত নীতিমালাও প্রণীত হচ্ছে না। শ্রুতিকটু শোনালেও বলতে বাধ্য হচ্ছি আমেরিকায় প্রত্যেক নবাগতের ধরাধামে আবির্ভাব ঘটে মোটা অঙ্কের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে। সেখানে প্রতিবছর গান ভায়োলেন্সের পেছনে ট্যাক্সদাতাদের কষ্টার্জিত রাজস্বের ২৮০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়কে গরিবের ঘোড়া রোগ বললে বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হবে না।
    তাই পরিশেষে বলতে চাই, শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জেমস ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। পরে হোয়াইট লাইভস ম্যাটার আন্দোলনও হিংস্র আকার ধারণ করেছিল। অথচ গান ভায়োলেন্সে ফি বছর প্রায় ৪০ হাজার তরতাজা প্রাণ ঝরে গেলেও অদ্যাবধি এভরি লাইফ ম্যাটার আন্দোলনের

    -সহযোগী সম্পাদক, ঠিকানা, নিউইয়র্ক
    ৯ নভেম্বর ২০২১